.
১৩. চুরুট-তামাকের কড়াকড়ি
তৎকালে পাড়াগাঁয়ে আমাদের সমবয়সীদের প্রায় সবাই তামাক খাইত। যারা চাষবাসের কাজ করিতেন, তাঁদের ছোট ছোট ছেলেরা বাপ-চাচার সামনেই তামাক খাইত। কাজে ব্যস্ত বাপ-চাচাঁদের তামাকটা ছেলেরাই সাজিয়া দিত। তামাক সাজিতে গিয়া নিজে দুই-এক টান খাইয়া লইত। ক্রমে এটা অনুমোদিত প্রথা হইয়া গিয়াছিল। একত্রে চাষবাস করিবার সময় এটা অপরিহার্য ছিল। একত্রে মাঠে কাজ করিবে, আর তামাক খাইবার সময় মুরুব্বিদের সম্মান দেখাইতে গিয়া গোপন করিবে, তার সময় ছিল না। সুবিধামত জায়গাও ছিল না। তবু অনেক ছেলে বাপ-চাচার সম্মানে একটু ঘুরিয়া বসিয়া হুঁক্কায় টান দিত। এই প্রথাই পরে নইচার আড়ালে তামাক খাওয়া’ বলিয়া সাহিত্যে স্থান পাইয়াছিল।
কিন্তু আমাদের বেলায় এটা হইবার ছিল না। কারণ আমাদের বাড়িতে তামাক খাওয়া একদম নিষিদ্ধ ছিল। দাদাজী তামাক খাওয়াকে একরূপ হারামই বলিতেন। কাজেকর্মে আচার-আচরণে তামাক খাওয়াকে তিনি হারামের থনে বেশি কড়া নজরে দেখিতেন। আমাদের দশ-পনের জন গৃহস্থির কামলার বেশির ভাগ ছিল তামাকখোর। তাদেরে তামাক না দিলে তারা কাজে জোর পাইত না। তাই বাপজী, চাচাজী ও গ্রামের মাতব্বরদের সুপারিশে কতকটা প্রয়োজনের তাগিদে দাদাজী কামলাদের বেলা তাঁর কড়াকড়ি শিথিল করিয়াছিলেন। কিন্তু আর সকলের বেলা খুব কড়া ছিলেন। ঘোরতর তামাকখোর বড় বড় আত্মীয়েরা আমাদের বাড়িতে আসিয়া তামাক ছাড়াই দিন কাটাইয়া যাইতেন। এ ব্যাপারে দাদাজীর কোনো পক্ষপাতিত্ব ছিল না। মুনশী-মৌলবী, আলেম-ফাযেল ও সরকার মাতব্বর সকলের প্রতি সমান নির্দয় ব্যবহার করিতেন। বিদেশাগত মৌলবী-মওলানাদের মধ্যে দু’একজন তামাকখোর, আর প্রায় সকলেই সাদা পাতাখোর থাকিতেন। পানের সাথে জর্দা-মশল্লার মত শুকনা তামাক পাতা খাওয়াকেই সাদা পাতা। খাওয়া বলা হইত। দাদাজী তাঁদেরে আমাদের বাড়িতে তামাক খাইতে ত দিতেনই না, তার জানামতে সাদা পাতা খাওয়াও সম্ভব ছিল না। তামাক চুরুট খাওয়াকে তিনি গু খাওয়া বলিতেন। হুক্কার তামাক খাওয়াকে তিনি কাঁচা গু ও সাদা পাতা চুরুট খাওয়াকে শুকনা গু খাওয়া বলিতেন। দাদাজীর কঠোরতায় তারা কেউ দাদাজীর সামনে সাদা পাতাও খাইতেন না। একটু আড়ালে সরিয়া গিয়া খাইতেন। তামাকের অভাব অসহ্য হইলে কেউ কেউ কামলাদের কাছে চাহিয়া তাদেরই সাজা হুক্কায় দুই-এক দম কষিতেন।
ছেলেবেলার একটি ঘটনার কথা মনে পড়িতেছে। একদিন নামাজের পরে এক মৌলবী সাহেব মসজিদে বসিয়াই ওয়ায করিতেছিলেন। ওয়ায করিতে করিতে তিনি মাঝে মাঝে পানের ডিবিয়া হইতে পানের খিলি বাহির করিয়া মুখে দিতেছিলেন। তিনি ছিলেন দিল্লি-ফেরতা বড় মওলানা। তিনি ছিলেন খুব ‘আম্বলী’ মানে তামাকের আদি। দাদাজীর মতামত তখনও তিনি জানিতেন না। দাদাজীর দিকে চাহিয়া তিনি বলিলেন, ‘ফরাযী সাহেব, আমার তামাক খাওয়ার আদত আছে। এক ছিলিম তামাকের হুকুম দিন। সমবেত মুসল্লিরা অবাক হইলেন। দাদাজীও বোধ হয় প্রথমে হকচকিয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু মুসল্লিদের মধ্যে উপস্থিত আমাদের এক কামলাকে তিনি ভাল করিয়া তামাক সাজিয়া হুঁক্কাটা ধুইয়া-মুছিয়া আনিবার হুকুম দিলেন। কামলাটিও নিশ্চয়ই বিস্মিত হইয়াছিল। কিন্তু কিছু না বলিয়া তামাক সাজিয়া আনিতে বাহির হইয়া গেল। মওলানা সাহেব আবার ওয়ায শুরু করিলেন।
কিছুক্ষণ পরে কামলা হুক্কা হাতে মসজিদের দরজায় দাঁড়াইয়া উচ্চ স্বরে বলিল, “চাচা মিয়া, তামাক আনছি। ঐ কামলাটি ছিল বেশ বয়স্ক। সে দাদাজীরে চাচা মিয়া ডাকিত। দাদাজী তার দিকে চাহিয়া বলিলেন, ‘এইখানে। লৈয়া আয়।’
মওলানা সাহেব ঝটিতে দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিলেন, না না, তুমি ভিতরে আইসো না। আমি বাইরে আইতেছি।’
দাদাজী পাশে বসা মওলানার চৌগার দামন ধরিয়া বলিলেন, না, না, মওলানা সাহেব, আপনি বাইরে যাইতে পারবেন না, এইভাবে বৈসাই তামাক খাইতে হৈব।’
এরপর দাদাজী ও মওলানা সাহেবের মধ্যে যে কথা-কাটাকাটি হইল তার শেষটায় মওলানা সাহেব তওবা করিয়া তামাক ছাড়িয়া দিয়াছিলেন।
দ্বিতীয় খণ্ড শিক্ষাজীবন
অধ্যায় তিন প্রাইমারি শিক্ষা-বাড়িতে
১. চাচাজীর নিকট
চাচাজী মুনশী ছমিরুদ্দিন ফরাযী সাহেব আমাদের বৈঠকখানায় একটি ফ্রি মাদ্রাসা চালাইতেন। এটাকে মাদ্রাসাও বলিতে পারেন, মক্তবও বলিতে পারেন। পাঁচ-সাত বৎসরের শিশুরা বগদাদি কায়দা, আম সেপারা ও কোরআন শরিফ পড়িত; অন্যদিকে দাড়ি-মোচওয়ালা যুবকেরা রাহে নাজাত, মেফতাহুল জান্নাত, ফেকায়ে মোহাম্মদী, শেখ সাদীর গুলিস্তাঁ, বুস্তাঁ এবং সাদীর ও ফরিদুদ্দিন আত্তারের পান্দেনামা, জামীর বাহার দানেশইত্যাদি উর্দু ফারসি কেতাবও পড়িত। মক্তবটি ফ্রি ছিল, মানে সকল দিকেই ফ্রি। বেতনও ছিল না, রেজিস্ট্রার হাজিরা বইও ছিল না। যার ইচ্ছা আসিয়া বসিয়া পড়িলেই হইত। যার যখন ইচ্ছা, উস্তাদজিকে বলিয়া চলিয়া যাইতে পারিত। বসিবার জন্য কোনো বেঞ্চির সারি ছিল না। আমাদের বাহির বাড়ির বিশাল আটচালা ঘরের মধ্যের কোঠায় চারটা হইতে ছয়টা চৌকি (তখতপোশ) লাগালাগি এক কাতারে পাতা ছিল। তার খানিকটায় পাটি ও খানিকটাতে চাটাই বিছানো থাকিত। এদের বেশির ভাগই অতি পুরান ও টুটাফাটা। এই ভাঙ্গা পাটি-চাটাইর উপর বসিয়াই তালেবিলিমরা মাথা ঝুকাইয়া-ঝুকাইয়া পড়া মুখস্থ করিত। চৌকির কাতারের সামনে একটা ডানা ভাঙ্গা কুরসিতে বসিয়া চাচাজী ছাত্রদেরে পড়াইতেন। আমার যতদূর মনে পড়ে, কোনো তালেবিলিমকেই নিজের আসন হইতে উঠিয়া আসিয়া পড়া দিতে হইত না। পড়ায় ভুল করিলে অথবা পুরান সবক শেষ করিয়া নূতন সবক নিতে হইলে চাচাজী নিজের আসনে বসিয়াই তা বলিয়া দিতেন। সব কেতাবই যেন তার মুখস্থ ছিল। চাচাজীর হাতে থাকিত একটা বাঁশের কঞ্চি অথবা ছিটকি লতার ডাল। ডালই হোক বা কঞ্চি হোক, ওটাকে ছিটকিই বলা হইত। ঐ ছিটকির উদ্দেশ্য ছিল, গাধা পিটাইয়া ঘোড়া করা অর্থাৎ অমনোযোগী ছাত্রকে পিটাইয়া মনোযাগী করা। সে উদ্দেশ্যে উদ্যত-ফণা সাপের মত সারা দিন ছিটকিটি অমনোযাগী ছাত্রের পিঠ বা হাতের তলা তালাশ করিয়া করিয়া উঁকিঝুঁকি পাড়িত। কিন্তু আমার জীবনে চাচাজীকে মাত্র তিনবার এ ছিটকিটি ব্যবহার করিতে দেখিয়াছি। আমাদের গ্রামের রেকাতুল্লাহ ও শহর আলী নামক দুইটি ছাত্রের পিঠে দুইবার এবং আমার নিজের পাছায় একবার; মোটমাট এই তিনবার মাত্র। আমার জন্য আর দরকারও ছিল না। ঐ একটি আঘাতের দাগই বহুদিন শুধু আমার শরীরে নয়, মনেও তাজা ছিল।
