.
১১. দাদাজীর এন্তেকালের পর
দাদাজী যত দিন বাঁচিয়া ছিলেন তত দিন উপরে কথিত মেহমানির ধুমধাম পুরা বজায় ছিল। কিন্তু রোযা রাখার নিয়মে শৈথিল্য আসিয়া পড়িয়াছিল। প্রথমে আমরা ভাইয়েরা রেহাই পাইলাম। কারণ অনেক দূরে হাঁটিয়া স্কুলে যাইতে হইত। মোহররমের ছুটি ছিল মাত্র এক দিন। আমাদের মত অপোগণ্ড শিশুর পক্ষে না খাইয়া স্কুলে যাওয়া কঠিন। কাজেই নফল রোযার জন্য অত কষ্ট করার দরকার নাই। আমরা যেই মাফ পাইলাম, অমনি আরো অনেকে নিজেদেরে মাফ করিয়া দিলেন। রোযা সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই যে, যত দিন বাড়িতে দিনের বেলা চুলায় আগুন না ধরে, তত দিন সে বাড়িতে রোযা রাখিতেও কারো কষ্ট হয় না। যেই মাত্র দুই-একজনের জন্য বিশেষ কারণে দিনের বেলা চুলায় রান্না চড়িল, অমনি প্রতিদিন এ বিশেষ কারণে হাজতির সংখ্যা বাড়িয়া চলিল। আমাদের বাড়িতে মোহররমের নফল রোযার বরাতে ঘটিল তা-ই। যত দিন দিনের বেলা পাকঘরের দরজা বন্ধ ছিল, তত দিন মোহররমের নফল রোযা প্রতাপ লইয়া আমাদের বাড়িতে রাজত্ব করিতেছিল। যেই ছাত্রত্বের হাজতে আমরা কয় ভাই হাজতি হইয়া রেহাই পাইলাম, অমনি গুরুতর অজুহাতের হাজতি দিন-দিন বাড়িয়া গেল। আমরা বড় হইয়া দেখিয়াছি, শেষ পর্যন্ত বাড়ির মুরুব্বি হিসাবে দাদাজী একাই রোযা রাখিতেন। আর মেয়েদের মধ্যে আমার মা এই নফল রোযা রাখিতেন।
দাদাজীর এন্তেকালের পর এই যিয়াফতের আচার ও ধুমধাম আস্তে আস্তে কমিয়া যায় এবং কয়েক বছর পরে একেবারে বন্ধ হইয়া যায়। কিন্তু এর কারণ আমার বাপ-চাচার কৃপণতা বা মত পরিবর্তন ছিল না। ছিল অর্থাভাব। দাদাজীর এন্তেকালের পর আট-দশ বছরের মধ্যে আমাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হইতে থাকে। একদিকে শরিকানা ভাগে চাষাবাদে ফসলের উৎপত্তি কমিয়া যায়, অপরদিকে আমাদের লেখাপড়ার খরচ বাড়িয়া যায়।
যা হোক, দাদাজীর আমলে মোহররম পর্বে আমাদের বাড়িতে এত ধুম ধড়ক্কি হইলেও দুই ঈদে কিন্তু অমন বিশেষ কিছু হইত না। বকরিদে প্রথম প্রথম দুই-তিনটা ও পরে মাত্র একটা গরু কোরবানি হইত। মোহররম লইয়া এত হৈচৈ করায় অনেক ছাত্র-বন্ধু ও শিক্ষক সন্দেহ প্রকাশ করিতেন আমরা আগে শিয়া ছিলাম। কিন্তু এটা ঠিক নয়। কারণ আমার বড় দাদা গাজী সাহেব এবং তারপর আমার চাচা মুনশী ছমিরুদ্দিন ফরাযী সাহেব ঘোরতর শিয়াবিরোধী ছিলেন। শিয়াদিগকে কাফের বলিতে চাচাজীকে আমি নিজ কানে শুনিয়াছি।
অথচ মোহররম লইয়া ধুম-ধড়কির কারণ দাদাজীও বলিতে পারিতেন না। তিনি বলিতেন, এটা বহুদিন হইতে এইভাবে পুরুষানুক্রমে চলিয়া আসিতেছিল।
.
১২. খেলাধুলার স্বাধীনতা
গান-বাজনা সম্বন্ধে আমার মুরুব্বিরা ঐরূপ কড়াকড়ি করিলেও খেলাধুলার ব্যাপারে তারা উদার ছিলেন। ঘোড়ায় চড়ার কথা আগেই লিখিয়াছি। এ ছাড়া আমরা শুকনার দিনে (অগ্রহায়ণ মাস হইতে জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত) মাঠে ব্যাটবল, ফুটবল, ডাংগুলি, কপাটি ইত্যাদি অনেক রকম খেলা খেলিতাম। ব্যাটবল মানে ক্রিকেট। আজকালের ছেলেদের মত আমরা ব্যাটবল কিনিতে পারিতাম না। নিজেরাই ব্যাট ও বল বানাইয়া লইতাম। দেবদারুগাছের চেলি অথবা ডাল কাটিয়া আগা চওড়া ও গোড়ায় হাতল করিয়া সুন্দর ব্যাট বানাইতাম। সুন্দর মানে তকালের জন্য সুন্দর। এটা ছিল প্রথম শ্রেণীর ব্যাট। সাধারণত এটাও জুটিত না। এক ফালি তক্তার একদিকে কাটিয়া ধরিবার মত একটা হাতল বানাইতে পারিলেই ব্যাট হইয়া গেল। আর বল? একটা শক্ত ভারী কাঠের গুলি বানাইয়া গাঁয়ের মুচেকে দিয়া তার উপর চামড়া সিলাই করাইয়া লইতাম। এটাই হইল আমাদের বল। এছাড়া কতগুলি লোহার চাকতি একত্রে করিয়া তার উপর খুব করিয়া নেকড়া জড়াইয়া গোল পিণ্ড বানাইতাম। এই গোল পিণ্ডের উপর মিহিন দড়ি দিয়া টাইপ করিয়া জাল বুনিতাম। তাতেও একরকম করিয়া শক্ত মযবুত ও টিকসই বল হইত। ত্রিকাঠি বা স্ট্যাম্প বানানো আরো সহজ ছিল। ত্রিকাঠি উচ্চারণে তিরিকাট ছিল আমাদের ক্রিকেটের বাংলা পরিভাষা। বাঁশের কাবারি বা ইঞ্চি অথবা সুপারিগাছের ফালা একদিকে চোখা করিয়া দুই জোড়া ত্ৰিকাঠি (তিন কাঠি) বানাইতাম। আমাদের আমলে পাড়াগাঁয়ে একদিক হইতে ওভারে-ওভারে বল করিবার নিয়ম ছিল না। দুই দিক হইতেই বল হইত। দুই দিকেই বৌলার, দুই দিকেই কিপার। খেলার গতিকে যেদিককার বৌলারের হাতে বল গিয়া পড়িত, সেদিক হইতেই বল চালনা হইত। আমাদের খেলার আরেকটা নিয়ম ছিল, আমরা মাথার উপর হইতে বল চালাইতাম না। বরঞ্চ হাত উঁচা করিয়া মাথা বা ঘাড়ের উপর হইতে বল মারিলে সেটা হইত ঢিল-মারা ‘নো বল’। আমাদের বল মারার কায়দা ছিল যাকে বলা যাইতে পারে আন্ডার হ্যান্ডবল মারা। ঝুলানো অবস্থায় হাতটা যতদূর সম্ভব পিছনে নিয়া ঐ ঝুলানোভাবেই অপরদিককার ত্ৰিকাঠি সই করিয়া বল নিক্ষেপ করা হইত।
ফুটবল সম্পর্কে কিন্তু অতটা আত্মনির্ভরশীল হওয়া সম্ভবও ছিল না, তার দরকারও হইত না। চামড়ার ফুটবল নিজ হাতে তৈয়ার করা কঠিন। কোনোমতে হারি-চাঁদা তুলিয়া তিন টাকা এক আনা জোগাড় করিতে পারিলেই তিন টাকার একটা তিন নম্বরের ফুটবল ও এক আনা দিয়া হুইসেল কেনা হইয়া যাইত। অনেক সময় হুইসেল ছাড়াও আমাদের খেলা হইত। রেফারি বুড়া ও শাহাদত এই দুই আঙুল মুখে ঢুকাইয়া জিভের চাপে সুন্দর হুইসেল মারিতে পারিত।
