এমন বলবান জোয়ান-জোয়ান কামলারা যখন উঁচা উঁচা বলদ দিয়া হালচাষ করিত, তখন আমার বড় ভাই ও আমি স্কুল ছুটির দিনে হাল ধরিতে চাহিতাম। কামলাদের কেউ কেউ আমাদেরে লাঙল ধরিতে দিত, কিন্তু সাবধানতা হিসাবে আমাদের সাথে সাথে চলিত এবং লাঙলের কুটিতে আমাদের মুঠির কাছে হাত রাখিত। কিন্তু সর্দার কামলারা এতে আপত্তি করিত এবং আমাদেরে সরাইয়া দিত। বলিত, লেখাপড়া জানা লোকের লাঙল ধরিতে নাই। লেখাপড়া জানা লোক লাঙল ধরিলে লাঙলের রেখের নিচের জমি সত্তর হাত পর্যন্ত পুড়িয়া যায়। সে ক্ষেতে কোনো ফসল হয় না। আমাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অনেক মুনশী-মৌলবী নিজের হাতে হালচাষ করেন। তাতে মাটি পুড়িয়া যায় না। সে নজিরের কথা বলিলে কামলারা জবাব দিত, তাঁরা আরবি-ফারসি পড়িয়াছেন, লেখাপড়া করেন নাই। লেখাপড়া মানে এখানে বাংলা লেখাপড়া। তৎকালে এ কথার গূঢ় মর্ম বুঝিতে পারি নাই। পরে বুঝিয়াছিলাম। লেখাপড়া জানা বাবু ভদ্রলোকেরা নিজ হাতে চাষ না করিবার কী চমৎকার যুক্তি জনপ্রিয় করিয়াছিলেন।
.
১০. প্রাচুর্য ও সরলতা
এরা ছাড়া আমাদের আরো তিন-চারজন বছরিয়া কামলা ছিল। ফসল। লাগানো-মাড়ানো এই দুই সময় এদেরে ছাড়াও মাসুরা (মাসোহারা) কামলাও রাখা হইত। এই সব গৃহস্থির কামলা ছাড়া তিন-চারজন রাখালও থাকিত। বলদা গরু বা হালের বলদের জন্য একজন ও পালের গরু বা ছেটুয়া গরুর জন্য দুইজন রাখাল থাকিত। হালের বলদ দশ-বারটা, আর ছেটুয়া গরু ছিল। প্রায় পঞ্চাশটা। হালের বলদের জন্য পৃথক একটা ও ছেটুয়া গরুর জন্য দুই তিনটা গোয়াল ছিল। পঞ্চাশটা ছেটুয়া গরুর মধ্যে আধাআধি বাছুর ও বাকি সব গাই থাকিত। গাইগুলির মধ্যে আট-দশটা দুধাল, বাকিগুলির কিছু গাভীন ও কিছু ছাড়ানিয়া (দুধ দেওয়া শেষ হইয়াছে কিন্তু আজও গাভীন হয় নাই এমন) গাই ছিল। দুধের বাছুরগুলিকে গোয়ালের এক কোণে খোয়াড়ের মধ্যে সারা রাত বাধিয়া রাখা হইত। ফযরের ওয়াকতে এক-একটা করিয়া বাছুর ছাড়িয়া তার মায়ের দুধ পানান হইত। দুধ পানান (দুয়ান) শেষ হইলেই গোয়ালের সব গরু ছাড়িয়া দেওয়া হইত। গুরুগুলিও বরাবরের অভ্যাসমত হালটে চলিতে শুরু করিত। আমাদের বাড়ির হালট গিয়া পড়িয়াছে সারা গাঁয়ের এজমালি হালটে। এই হালটের এক শাখা গিয়া পড়িয়াছে নদীর পাড়ে, অপর শাখা গ্রামের মাঠে। ক্ষেতে ফসল থাকার সময় হালটের এই শাখায় গরু যাইত না। সব যাইত নদীর ধারে। সেখানে গাঁয়ের সব গরুর সাথে মিলিয়া জঙ্গলের পাতা-পুতুড়ি ও ঘাস খাইত। বেশি গরুওয়ালাদের নিজস্ব চরাক্ষেত (গরু চরাইবার জন্য পতিত জমি) থাকিত। আমাদেরও কয়েকটা চরাক্ষেত ছিল। বরাবর একই ক্ষেতকে চরাক্ষেত রাখা হইত না। দুই-তিন বছর পরপর বদলানো হইত। এতে একদিক যেমন যথেষ্ট ঘাসে। গরু চরানোও চলিত, আবার কয়েক বছর পতিত পড়িয়া থাকায় এবং গরু বাছুর চরিবার সময় যে পরিমাণ লেদাইত, তাতে ক্ষেতের উর্বরতাও বাড়িত।
এত-এত কামলা ও বলদ গরুর বয়ান শুনিয়া আজকালকার তরুণেরা মনে করিবে, এটা ত একমত হালুয়া রাজার ব্যাপার, আসলে তা কিছু নয়। ঐ যে ছয় ফুট লম্বা জোয়ান কামলাদের কথা বলা হইল, তাদের বার্ষিক বেতন ছিল সর্বোচ্চ পঞ্চাশ-ষাট টাকা। আর রাখালদের বেতন ছিল বছরে দশ টাকা। চাকরি শুরু করিবার প্রথম দিনেই কিংবা দু’এক দিন আগে সব টাকা অগ্রিম দেওয়া-নেওয়া হইত। বয়স্ক কামলারা নিজেরা, আর ছোকরা চাকরদের বাপ-চাচা মুরুব্বিরা এই টাকা নিতেন। অগ্রিম বেতনের টাকা পাওয়ার পর সারা বছর তারা কাজ করিয়া দিত। টাকা মারিয়া দিবার কথা তৎকালে কারো মনেও পড়িত না। বছরের বেতন অগ্রিম আদায় করিয়া পরবর্তী তিন শ পঁয়ষট্টি দিন সে টাকার বদলা খাঁটিয়া দিতে বোধ হয় আজকাল কোনোও লোকই রাজি হইবে না। কেউ যদি রাজি হয়, তবে দু’চার দিনের মধ্যেই নির্বোধ বেওকুফ বেআক্কেল গাধা বলিয়া সর্বত্র তার বদনাম ছড়াইয়া পড়িবে। কিন্তু আগের লোকেরা এমন ছিলেন না। গৃহস্থরাও না, তাঁদের কামলারাও না। সকলেই সকলকে বিশ্বাস করিতেন। বিশ্বাসের সুযোগ-সুবিধাও ছিল। ধরুন কামলাদের কথাটাই। যে বছরে ষাট টাকা অগ্রিম পাইল, সে ঐ টাকার মধ্যে ত্রিশ-চল্লিশ টাকায় ষাট-আশি মণ ধান কিনিয়া ফেলিল। তার স্ত্রী-কন্যারা মিলিয়া ধান সিদ্ধ করিয়া বাড়া বানিয়া চাউল করিল। ষাট মণ ধানে চাল হইবে পঁয়তাল্লিশ মণ। আশি মণে হইবে প্রায় ষাট মণ। চাউলের দাম তখন দেড় টাকা মণ। অর্থাৎ ষাট টাকা বেতন পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই কামলাটি শতাধিক টাকার মালিক হইয়া গেল। আর গৃহস্থের লাভ হইল যে, গাঁয়ের বাছা-বাছা সবল কর্মঠ কামলা তিনি বছরের নামে কিনিয়া ফেলিলেন। অন্যথায় বুনা-লাগানো ও দাওয়ামাড়ির সময় অমন কামলা পাওয়া যাইত না। পাওয়া গেলেও মাসিক বেতন দশ টাকার কম হইত না।
শুধু এই কারণেই যে লোকজন সৎ-সাধু থাকিত, তা নয়। শঠ-প্রবঞ্চক ও ঠক-ধড়িবায হইবার মত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও চুরি-ডাকাতি করিবার মত সাহসই তখন জনসাধারণের মধ্যে হয় নাই। আরেকটা দৃষ্টান্ত দেই। প্রতিবছর ফাল্গুন চৈত্র মাসে বিহার হইতে বহু গরুর ব্যাপারী হাজার হাজার গরু লইয়া বাংলাদেশে ঢুকিত। আমাদের এলাকায়ও অনেকে আসিত। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকে আগে বহুদূর বিস্তৃত ধানী জমি ছিল। একেবারে খোলা মাঠ। ধান কাটা হইয়া সবটাই একদম ময়দান। শুধু বাড়ির আশপাশে কিছু রবিশস্য সরিষা, কলাই করা হইত। এই ভোলা বিশাল মাঠে হাজার হাজার গরুসহ এই বিহারী ব্যাপারীরা আস্তানা ফেলিত। সুবিধা অনুসারে সাত দিন হইতে পনের দিন এক-এক আস্তানায় থাকিত। দৈনিক দশ-বিশটা গরু বিক্রি হইলে পাঁচ-সাত শ টাকা জমা হইত। সাত দিনে তিন-চার হাজার টাকা হইত। এই টাকা লইয়া ব্যাপারীরা মাঠের মধ্যে এত দিন রাত কাটাইত। কোনো একটা ডাকাতি-রাহাজানি হয় নাই।
