এই হিসাবে দশটা গরু, দুইটা খাসি, পঁচিশ মণ চাল, পাঁচ মণ ডাল, পাঁচ মণ মিঠুরি বা দশ মণ দই দিয়া পাঁচ হাজার লোক খাওয়ানো যাইত। এতে মোটমাটে পাঁচ শ টাকার বেশি খরচ পড়িত না। গরুর দাম দশ-পনের, খাসির দাম চার-পাঁচ, চালের মণ দেড় টাকা-পাঁচসিকা। দুই-তিন টাকা মণ দই পাওয়া গেলে বরঞ্চ পাঁচ শ টাকার কিছু কমই লাগিত। চার-পাঁচ হাজার লোক বসিবার জায়গা করা খুব কঠিন ছিল না। ধান, সরিষা, কলাই মাড়াই শেষ হইবার পর এবং পাট বুনা শুরু হইবার আগে সকলের বাড়ির সামনে-পাশে বহু বিস্তৃত জমি খালি পড়িয়া থাকিত। নিম্ন-মধ্যবিত্ত গৃহস্থ বাড়ি মাত্রেরই দুই একখানা বড় শামিয়ানা, ফরাশ ও শতরঞ্জি থাকিত। মাতব্বরদের বাড়িতেই দুই-তিনটা করিয়া বড় ডেগ থাকিত। প্রতি গ্রামে দুই-একজন করিয়া শখের বাবুর্চি ছিলেন; বড় বড় যিয়াফতে রান্না করা তাদের গৌরবের বিষয় ছিল। এই সব শখের বাবুর্চিরা বিনা পারিশ্রমিকে সহকারী লইয়া ভোর হইতে রান্না শুরু করিতেন, বাঁশের কোনোই অভাব ছিল না। ঘন ঘন খুঁটি গাড়িয়া গ্রামের পাঁচ দশটা শামিয়ানা টাঙানো হইত। জমি চাষ করা থাকিলে সামান্য মুগুরপেটা করিয়া তাতে ধারি-টাচাইর উপর ফরাশ-শতরঞ্জি ও চট বিছাইয়া সুন্দর বসার ব্যবস্থা হইত। এতে খরচ যা লাগিত, তা উল্লেখযোগ্য নয়। আমাদের বাড়ির মত নিম্ন-মধ্যবিত্ত গৃহস্থের পক্ষে বছরে একবার চার-পাঁচ শ টাকা খরচ করিয়া এমন যিয়াফতের আয়োজন করা দাদাজীর আমলে মোটেই কঠিন মনে করিতাম না। আমাদের ছেলেবেলা আমাদের অঞ্চলের অনেক মাতব্বর গৃহস্থের বাড়িতেই বছরে বছরে এমন যিয়াফত দেখিয়াছি এবং নিজেরা। খাইয়াছি। কখনও-কখনও এর চেয়েও বড় বিশাল যিয়াফতও খাইয়াছি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেবের দাদা রিয়াত উল্লা মণ্ডল সাহেবের লিল্লায় যিয়াফতটা হইয়াছিল দস্তুরমত একটা মেলা। সে যিয়াফতে এক শ একটা গরু যবেহ হইয়াছিল বলিয়া শুনিয়াছিলাম।
.
৯. সমসাময়িক অবস্থা
প্রায় এক শ বিঘার জোতদার হইলেও দাদাজীর আমলে আমাদের কোনো বর্গাদার ছিল না। সব জমিই নিজের চাষে থাকিত। দাদাজীর আমলে দেখিয়াছি এইসব জমি আবাদ করিতে তিন-চার জোড়া হাল, দশ-বার জন কামলা খাঁটিত। হালের বলদগুলি ছিল বিশাল আকারের। উচ্চতায় পাঁচ ফুটের নিচে হইবে না। বলদ যেমন বড়, লাঙলগুলিও তেমনি দীঘে-পাশে আলিশান। এইসব হাল বাইবার মত কামলারাও ছিল ইয়া বড় জওয়ান। দাদার আমলের সাধু, ইদু, খিদিরদ্দি, খলবদ্দি, আইনদ্দি প্রভৃতি পাঁচ-ছয়জন বছরিয়া কামলার বিশাল আকারের কথা আজও মনে পড়ে। এরা কেউ উঁচায় প্রায় ছয় ফুট ও ঐ পরিমাণে মোটাতাজা ছিল। কাজে-কামে চলিতও এরা দেও-এর মত। এরা শুধু কাজেই বড় ছিল না, শক্তিতেও ছিল তেমনি অসাধারণ। সে শক্তি তারা শুধু এমনি দেখাইত না, আমাদের গিরস্থির কাজেও লাগাইত। বিভিন্ন রকমের ভারী ভারী বোঝা টানিতে, বিশেষত, মাঠ থনে ধানের আঁটির বোঝা আনিতে, সেই বিপুল শক্তি খাটাইত। ধান কাটিবার সময় যে আঁটি বাঁধা হয়, তারে আমাদের অঞ্চলে বলা হয় মুড়ি। এক-একটা মুড়ির ওজন পাঁচ সেরের বেশি ছাড়া কম হবে না। সাধারণ কামলারা এই ধরনের মুড়ির আটটাতে এক বোঝা বাধিয়া মাঠ হইতে বাড়ির খলায় আনিত। এই আটটা মুড়ি কেউ একটা আঁটি বাঁধিয়া মাথায় করিয়া আনিত। কেউ আবার চার-চারটা মুড়ির দুইটা আঁটি বাঁধিয়া বাহুক কাঁধে করিয়া আনিত। এই বাহুক সম্বন্ধেও সকলের এই ধারণা না-ও থাকিতে পারে। আমাদের অঞ্চলে ধান বাহিবার এই বাহুক গোয়ালা বা ফেরিওয়ালারা বাহুকের মত দুই পাশের দুইটা বোঝা ঝুলাইয়া আনা হয় না। তার বদলে বাহুকের দুই দিক ধানের দুই আঁটির ঠিক মাঝামাঝি ঢুকাইয়া দেওয়া হয়। সে উদ্দেশ্যে বাহুকের দুই দিকই ধারালো চোখা। এ চোখা মাথা দুইটি ধানের বোঝার ঠিক মাঝখানে এমনি কায়দায় ঢুকানো হইত যে, কোনো দিকে বেশি হইয়া তেছড়াভাবে হেলিয়া পড়িত না। পড়িলে আর বাহুক বওয়া সম্ভব হইত না। এই বাহুকের দুইটা আঁটি বাঁধার মধ্যেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জিলায়। অন্তত দুই রকম কায়দা আছে। এক ধরনে ধানের সব মুড়ির ধানের মুখ নিচ দিকে ঝুলাইয়া বাঁধা হয়। আরেক ধরনে মুড়িগুলি উল্টা-পাল্টা দুই মুখ করিয়া বাধা হয়। তাতে ধানের দিক একদিকে থাকে না। সমান সংখ্যায় দুই দিকে থাকে। এই ধানের বাধার ফলে দুই দিককার বোঝা দুইটার বাহকের কাঁধের উপরের লেভেলে থাকে। এই ধরনের বাধাতেই বাহুক চুকানোতে খুবই উস্তাদি লাগে। মনে হয়, এতে বোঝাটাও কিছুটা পাতলা হয়। কারণ বাহকের চলার তালে-তালে উভয় দিককার বোঝাই ছন্দে ছন্দে নাচিতে থাকে।
এই ধরনের বাহুকেই হউক, আর এক বোঝার মাথায় করিয়াই হউক, অপর কামলারা যেখানে আটটা মুড়ি বহন করিত, সেখানে আমাদের বাড়ির ইদু-সাধুরা দশ-বার-চৌদ্দটা মুড়ি একবারে বহন করিত। এই লইয়া তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হইত। এটা সহজ ছিল না। কারণ, এতে প্রত্যেক বারের বোঝার ভার দেড় হইতে দুই মণ ওজনের হইত।
এছাড়া ইদু-সাধুরা আরেক কাজে তাদের শক্তির প্রতিযোগিতা করিত। আমাদের বাড়িতে তৎকালে প্রায় হাজার মণ ধান বিক্রি হইতে। এই বিক্রিটা প্রায়শই দুই-তিন দফার বেশিতে হইত না। তাতে প্রতি দফায় তিন শ হইতে পাঁচ শ মণ বিক্রয় হইত। যেদিন বিক্রিটা হইত, সেদিন আমাদের বাড়ির উত্তরের উঠান (এটাই আমাদের খলা ছিল বলা যাইতে পারে) লোক সমাগমে গমগম করিত। আমাদের কামলারা মাপিয়া দিত। ব্যাপারীদের ঘোড়াওয়ালারা এসব ধান সুতোয়া নদীতে দক্ষিণা ব্যাপারীদের পাঁচ শ মণি নৌকায় নিয়া যাইত। পাঁচসেরি পাথরের দাঁড়িপাল্লায় এই ধান মাপা হইতে। অনেক ধান। কাজেই বড় বড় কান্দি। এক কান্দি হইতে ধান মাপিয়া আরেক কান্দি করিতে স্বভাবতই বেশ দূরে করা যাইত। নইলে অতি শীঘ্রই দুই কান্দি লাগালাগি হইয়া যাইবার আশঙ্কা ছিল। কাজেই দাঁড়িপাল্লাওয়ালারা প্রতিবারের মাপা ধান খুব দূরে অন্তত চার-পাঁচ হাত দূরে মেলিয়া মারিত। এই লইয়াই আমাদের ইদু-সাধুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করিতে দেখিয়াছি : কে কতদূর মেলিয়া মারিতে পারে। এটা সোজা কাজ নয়! কাজটা করিতে হয় বসা অবস্থা হইতে। পাঁচ সের ধান দুই একবার দশ হাত দূরে ফেলাও কঠিন নয়। কিন্তু চার-পাঁচ শ মণ ধান সারা দিন ধরিয়া মাপিতে হইবে। আগাগোড়া সমান দূরে ফেলিতে হইবে। কাজেই সমান জোরে মারিতে হইবে।
