ভদ্রলোক আমার বিস্ময় বুঝিতে পারিয়া সব বলিলেন। তাঁর আসল নাম সিদ্দিকুর রহমান প্রামাণিক। শৈশবে বাবা মারা যান। হিন্দু-প্রধান এলাকা। প্রতিবেশীরা তাঁকে সিদ্ধেশ্বর’ বলিয়া ডাকিত। হিন্দু বাড়িতে হাইস্কুল। সব শিক্ষক হিন্দু। কাজেই স্কুলের রেজিস্ট্রারিতেও তাঁর নাম উঠিল সিদ্ধেশ্বর প্রামাণিক। সেটেলমেন্ট-পর্চায়, সাবরেজিস্টারি আফিসে, জমিদারের শেরেস্তায় এবং ইউনিয়ন বোর্ডের খাতায় তিনি এখন সিদ্ধেশ্বর প্রামাণিক। নাম-সংশোধন করা কঠিন ও ব্যয়সাধ্য ব্যাপার।
নিজের গ্রামের কথা মনে পড়িল। সেখানে দুইজন প্রতাপশালী সম্মানী হিন্দু মাতব্বর ছিলেন। একজন ইনছান দাস (ঈশ্বান চন্দ্র দাস), অপরজন ওমর সরকার (উমাচরণ সরকার)। এঁরা নিজ মুখেই ইনছাস দাস’ ও ‘ওমর সরকার’ বলিতেন। কারণ আসল নাম বলিলে রাতের অন্ধকারে কেউ চিনিতও না; হয়ত তাদের প্রাপ্য সম্মানও দিত না। কিন্তু তাঁদেরও নাম খাতা পত্রে ঠিক ছিল সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের মত এমন ‘ঢাকী-শুদ্ধা বিসর্জন’ তাঁদের দিতে হয় নাই।
কলিকাতা হইতে ফিরিয়া আসিয়া ১৯৫০ হইতে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহেই উকালতি করিলাম। আমার আগেকার মুহরি আখতারুদ্দীন খা আমার সাহচর্যে পেটি-ফগিং ঘৃণা করিতে শিখিয়াছিলেন। কাজেই আমি ময়মনসিংহ ছাড়ার পরে তিনিও মুহরিগিরি ছাড়িয়া বাড়িতে অবসর জীবন যাপন করিতেছিলেন। কারণ তাঁর অবস্থা ভাল। আমি পুনরায় উকালতি শুরু করায় তিনি আসিয়া আমার মুহরিগিরি নিলেন।
কিন্তু বার বছর আগে ময়মনসিংহ ছাড়িবার সময় আমি যা ছিলাম তা আর নাই। এখন বয়স হইয়াছে, স্টাইল বাড়িয়াছে, আমিরি শিখিয়াছি; পরিবার বড় হইয়াছে, সুতরাং খরচও বাড়িয়াছে। তাই আয়ও অনুপাতে বাড়া দরকার। শুধু দেওয়ানিতে তাড়াতাড়ি অত টাকা আসিবে না। কাজেই ফৌজদারিতে যাওয়া দরকার। আখতার মিয়ার সঙ্গে গভীর পরামর্শ করিলাম। ফৌজদারির প্রতি তাঁরও ঘৃণা ছিল খুব বেশি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফৌজদারিতে যাওয়া ঠিক হইল। নিম্ন আদালতে বেল-টেলের ব্যাপারে দুই-একদিন গেলামও।
অমনি টাউট মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হইল। তাঁদের পক্ষে এক দল প্রতিনিধি বেশি রাতে আমার সঙ্গে দেখা করিলেন। তাঁরা নিতান্ত ভদ্রভাবে মিষ্টি ভাষায় যা বলিলেন, তার সারমর্ম এই : আমি ফৌজদারি লাইনে আসায় তারা আনন্দিত। কিন্তু তাদের সহানুভূতি ছাড়া আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। ইতিপূর্বে আমি উদ্যোগী হইয়া তাদের অনেককে জিলা জজ ও জিলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়া টাউটনোটিফাই করাইয়াছিলাম, সে কথা তারা মনে রাখিবেন না। পুরাপুরিই আমাকে সাহায্য করিবেন। তাদের সহায়তা নিলে আমি কেস করিয়া দম ফেলিতে পারিব না। টাকা রাখিবার স্থান পাইব না। তাঁরা এখন এসোসিয়েশন ফার্ম করিয়াছেন। ইচ্ছা করিলে তাঁরা একজনকে আসমানেও তুলিতে পারেন, পাতালেও নামাইতে পারেন। তাঁদের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখিলে মামলায় খুব বেশি খাঁটিবার দরকার নাই। সব মামলা জিতিবারও দরকার নাই। হারি আর জিতি মওক্কেল আমার হাতছাড়া হইবে না। কারণ জিতিলেও জিৎ হারিলেও জিৎ। যদি মামলায় জিতি, তবে আমার সেটা কৃতিত্ব। তখন আমার তারিফে তারা দেশের আকাশ-পাতাল মুখরিত করিবেন। আর যদি হারি, তবে দোষ হইবে হাকিমের জুরির। হাকিম ও জুরিরা অপর পক্ষের মোটা টাকা খাইয়া আমার জিতা মামলাটার বিরুদ্ধে রায় দিয়াছেন। আপিলে ও হাইকোর্টে সব ঠিক হইয়া যাইবে। স্থানীয় আপিল হইলে আবার ফিস পাইব। আর হাইকোর্ট হইলে নিজের লোককে কেস দিয়া সেখানেও অংশ পাইব। এত সুবিধা। আর যদি তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখি, তবে মামলা হারিলে হার, জিতিলেও হার। যদি জিতি তবে তারা প্রচার করিবেন, অমন সহজ মামলায় উকিলের দরকারই ছিল না। যে কোনও জুনিয়র অথবা একজন মোখতার দিয়া ওর দশভাগের একভাগ খরচে মামলা হইয়া যাইত। সরল মওক্কেল পাইয়া আমি অমন। গলাকাটা ফিস নিয়াছি। আর যদি হারি, তবে ওরা বলিয়া বেড়াইবে এটা হারিবার মামলাই নয়। আমি ভুল জেরা করিয়া বাদী পক্ষের কেস প্রমাণ করিয়া দিয়াছি। মানুষ বুঝিয়া কারো কাছে তাঁরা বলিবেন, কবি-সাহিত্যিক মানুষ রাতদিন বই লিখিয়া কাটান, আইনের বই পড়ার সময় কই? সব আইন ভুলিয়া গিয়াছেন। আর কারো কাছে বলিবেন, অপর পক্ষের কাছে টাকা খাইয়া মওক্কেলের এই সর্বনাশ করিয়াছেন। শুধু এই মওক্কেল না, আরো অনেকেরই এইরূপ সর্বনাশ করিয়াছেন। আমাকে কেস দেওয়া মানেই ফাঁসির দড়ি নিজ গলায় দেওয়া ও জেলের দরজা নিজ হাতে খুলিয়া দেওয়া।
বার বছর আগে হইলে এঁদেরে যুদ্ধে আহ্বান করিয়া গলাধাক্কা দিয়া বাহির করিয়া দিতাম। কিন্তু এবার দিলাম না। কারণ স্পষ্টই দেখিলাম, এঁদের কথায় অতিশয়োক্তি থাকিলেও মোটামুটি সত্য। কাজেই তাঁদেরে চা-পান খাওয়াইয়া এবং চিন্তা করিয়া দেখিবার ওয়াদা করিয়া বিদায় করিলাম।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এদের নিকট মাথা নত করিলাম না। অন্য উপায় অবলম্বন করিলাম। মোখতারদের সঙ্গেই অর্থনৈতিক সম্বন্ধ স্থাপন করিলাম। ফিসের অংশ যখন দিতেই হইবে, তখন মোখতারদেরেই দিব, টাউটকে দিব না। মোখতাররা আমাদের ‘সহব্যবসায়ী। তাঁরাও সনদধারী। তারাও উকিলদের মতই আদালতের অফিসার। কিন্তু ব্যাপারটাকে সুষ্ঠু ও বিবেক সংগত করিবার জন্য মোখতারের অংশটার নাম দিলাম ‘জুনিয়র ফিস’। আমার ফিস আদায়ের ক্ষমতাও ছাড়িয়া দিলাম তাদেরই হাতে। অতঃপর ফৌজদারি প্র্যাকটিসেও আমার অসুবিধা থাকিল না। বলা হয়, উকালতি রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কথাটা সত্য শুধু আইন সভার মেম্বর হওয়া পর্যন্ত। মন্ত্রী হইলেন ত উকালতি গেল। মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর এক্স-মিনিস্টার হিসাবেও সুবিধা হয়; কিন্তু সেটা শুধু ক্রিমিন্যাল প্র্যাকটিসে। দেওয়ানি প্র্যাকটিসে একবার কনটিনিউটি ভাঙ্গিলে আর সহজে জোড়া লাগে না। আমারও লাগে নাই।
