.
১০. আলীপুরে
উকিল হিসাবে আমি খুব বড় কেউকেটা ছিলাম না। সাংবাদিকতা ও রাজনীতি করার দরুনই হোক আর আমার অযোগ্যতার দরুনই হোক কথাটা সত্য। কাজেই উকিল হিসাবে আইন-ঘটিত ব্যাপারে কোনও চাঞ্চল্যকর ঘটনা আমার বলিবার নাই। তবু আলীপুর জজকোর্টের অভিজ্ঞতা কিছুটা না বলিলে আমার উকিল জীবনের কাহিনী অপূর্ণ থাকিয়া যাইবে।
আলীপুরের কথা বলিবার আগে বলিতে হয় যিনি আমাকে আলীপুরে নিলেন, তাঁর কথা। ইনি খান বাহাদুর মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। এর সঙ্গে আগের পরিচয় থাকিলেও ঘনিষ্ঠতা হয় তিনি যখন ময়মনসিংহের মুনসেফ। ঘটনার সময় তিনি বাংলা সরকারের এসিস্ট্যান্ট জুডিশিয়াল সেক্রেটারি। সেক্রেটারি না থাকায় তিনিই তখন অফিশিয়েটিং জুডিশিয়াল সেক্রেটারি। নিতান্ত অকস্মাৎ নবযুগএর চাকুরি যাওয়ায় আমি যখন কী করি, কী করি করিতেছিলাম, তখন সেই বন্ধু ফেরেশতার মত আমার জীবনে উদয় হইলেন। নিজের আইনের বই-পুস্তক দিলেন। বাপের পরিত্যক্ত গাউনটা আমার কাঁধে তুলিয়া দিয়া বলিলেন : উপযুক্ত উত্তরাধিকারীর কাঁধে উঠিল এটা। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত জিলা ও সেশন জজ মৌ, আবদুল খালেক। শুধু বই-পুস্তক ও গাউনই দিলেন না। তিনি আমাকে নিয়া আলীপুরের সমস্ত জজ-মুনসেফ ও কলিকাতা স্মল ক্যু কোর্টের জজদের সঙ্গে পরিচিত করিয়া দিলেন।
এর ফল হাতে-হাতে পাইলাম। উকালতির শুরুতে হাকিমদের সহায়তা, সুনজরের পৃষ্ঠপোষকতা যে কত মূল্যবান, সে কথা বুঝাইয়া বলা অনাবশ্যক। মামলা পরিচালনার সময় জেরা-বানবন্দির সময় যদি হাকিম বলেন, ‘চমঙ্কার’, ‘বেশ করিতেছেন’, ‘ওয়েল ডান ফর এ বিগিনার’, তবে নূতন। উকিলের শুধু আত্মবিশ্বাস ও সাহসই বাড়ে না, জনপ্রিয়তা ও পসারও সঙ্গে সঙ্গে বাড়িয়া যায়। পক্ষান্তরে ঐ সময় হাকিম যদি বলেন, ‘তৈয়ার হইয়া আসেন নাই’, ‘আইন-কানুন কিছু জানেন না’, ‘মওক্কেলের সর্বনাশ করিতেছেন’ তবে সে নূতন উকিলের প্র্যাকটিসের বারটা বাজিয়া যায়। সিনিয়রদের জন্য অবশ্য হাকিমের ভাব-গতিকে বেশি কিছু আসে যায় না; কিন্তু নবাগতের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধুবর সিরাজুল ইসলাম। এইভাবে আমাকে প্র্যাকটিসের পাকা সড়কে তুলিয়া দিয়াছিলেন। আমি সারাজীবনেও তাঁর এ দেনা শোধ করিতে পারিব না।
আলীপুরের মর্যাদার অভিজ্ঞতাও তেমনি আমার মনে থাকিবে। প্রথমত, উকিল-মুহরির সম্পর্ক। আলীপুরের মুহরিদিগকে আমি সলিসিটর উপাধি দিয়াছিলাম। কার্যত হাইকোর্টের সলিসিটর যা আলীপুরের মুহরিও তাই। অন্যান্য স্থানে মুহরিকে জিজ্ঞাসা করা হয় : ‘আপনি কোন উকিলের শেরেস্তায় কাজ করেন? আর আলীপুরের উকিলদেরে জিজ্ঞাসা করা হয় : ‘আপনি কোন মুহরির শেরেস্তায় কাজ করেন? বস্তুত ‘শেরেস্তা মুহরিদেরই। উকিলদের প্রায় কারুরই শেরেস্তা নাই। সেখানে মওক্কেল আসে মুহরিদের কাছে। তারাই কেস নেন; কাগজ-পত্র, দলিল-দস্তাবেজ বুঝিয়া লন। টাকা পয়সা লন। উকিলের ফি আদায় করেন তারাই। কেসের শ্রেণী ও গুরুত্ব হিসাবে উকিল নিযুক্ত করেন তাঁরাই। উকিলকে ফিসও দেন তাঁরাই। এ কাজের জন্য তাদের প্রত্যেকের নিকট বিস্তারিত ও বড় নোট বই আছে। সে নোট বইয়ে বর্ণানুক্রমিক সূচিপত্রও আছে। এসব কাজ করিতে গেলে যে আইন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিদ্যা-বুদ্ধির দরকার, আলীপুরের মুহরিদের অধিকাংশের মধ্যেই তা আছে অন্তত আমার আমলে ছিল। আমার মুহরির নাম ছিল মোহাম্মদ আমজাদ আলী মিয়া। অর্থাৎ আমি তাঁরই শেরেস্তার উকিল ছিলাম। লেখক সাহিত্যিক হিসাবে আমার নাম জানিতেন বলিয়াই। গোড়াতে তিনি দয়া করিয়া আমাকে তাঁর শেরেস্তার জুনিয়র উকিলের তালিকাযুক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু অল্পদিনেই তিনি আমাকে সিনিয়র লিটিতে নেন এবং আরো কিছুদিন পরে তিনি আমাকে তাঁর শেরেস্তার প্রধান করেন। তার কাছে আমি উকালতির অনেক প্যাঁচ-মোচড় ও মামলার প্রধান ইঞ্জিনিয়ারের কাজকর্ম অনেক কিছু শিখিয়াছি। ভদ্রলোক ত মুহরি নন, পাশ-না-করা সনদহীন একজন উকিল।
মোকদ্দমার তদারককারীদের সকলেই যে টাউট নয়, এ অভিজ্ঞতাও হয় আমার আলীপুরেই। সেখানেই আমি প্রথম জানিতে পারি শিক্ষিত অবস্থাশালী ও অবসর-প্রচুর দুই-একজন গ্রাম্য মাতব্বরের এটা শখ, এটা তাদের অবসর বিনোদনের একটা স্পোর্টস। আলীপুরে কয়েক মাস কাটিবার পর আমজাদ মিয়া এক ভদ্রলোককে আমার সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দেন। বলেন : ভদ্রলোক আমার বই-পুস্তক বিশেষত আয়নার একজন সমঝদার। আমার একজন ভক্ত। ভদ্রলোকের নাম সিদ্ধেশ্বর প্রামাণিক। পাড়াগাঁয়ের একজন হিন্দু ভদ্রলোক আমার লেখার ভক্ত শুনিয়া খুশি হইলাম। আমি যতদিন আলীপুরে ছিলাম, এই ভদ্রলোক ততদিনই মাসে গড়ে দুই-তিনটা বড়-বড় কেস আমাকে দিতেন। প্রথম দিন যখন কেস আমাকে দেন, সেদিন তাঁকে আমি বড় রকমের টাউট মনে করিয়াছিলাম। আমার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং মোকদ্দমার ইনস্ট্রাকশনে তার উৎসাহপূর্ণ অংশগ্রহণ হইতেই আমার এই ধারণা হইয়াছিল। ভদ্রলোক চলিয়া গেলে আমজাদ মিয়ার নিকট আমার মনোভাব ব্যক্ত করিলে তিনি জিভ কাটিয়া বলেন : উনি তেমন লোক নন। রোদ বৃষ্টি-ঝড়-তুফান তিনি অগ্রাহ্য করিয়া ভদ্রলোক অমন নিঃস্বার্থভাবে মাসে দুই-তিন বা তার চেয়েও বেশি বার আমার কাছে পরের কেস নিয়া আসেন দেখিয়া নিজের খাইয়া বনের মহিষ তাড়াইবার’ তার শখে আমি সত্যই আশ্চর্য হইয়াছিলাম। তার প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জন্মিয়াছিল। কিন্তু এর পরে আরো বিস্মিত হইয়াছিলাম, যখন জানিতে পারিলাম তিনি হিন্দু নন, মুসলমান। ঘটনাচক্রেই এটা জানিতে পারিলাম। আমার সামনে একটা কাগজে নিজের নাম দস্তখত করিতে গিয়া পিতার নাম লিখিলেন আইনুদ্দীন প্রামাণিক। সিদ্ধেশ্বর প্রামাণিকের পিতার নাম আইনুদ্দীন প্রামাণিক? বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলিলাম; ভদ্রলোক আর্য সমাজীর পাল্লায় পড়িয়া শুদ্ধি হইয়াছেন নাকি?
