অধ্যায় তেইশ – বিষয়ী জীবন
১. বংশগত দুর্বলতা
যাকে বলা হয় বাস্তব বিষয় বুদ্ধি’, কাণ্ডজ্ঞান’ কমনসেন্স’, সেটার কিছু-কিছু অভাব বোধ হয় পাইয়াছিলাম বাপ-দাদার কাছ হইতেই। ছেলেবেলা শুনিতাম, আমার বাপ-দাদাকে প্রায় সকলেই সরল-সিধা-মানুষ’ বলিত। আহম্মক বলিত না বোধ হয় সম্মান করিয়া। মাঠ হইতে কামলারা একদিন উত্তেজিত হইয়া আসিয়া দাদাজীর কাছে নালিশ করিল, ফলানারা অমুক ক্ষেতের বাতর কাটিয়া আমাদের প্রায় এক হাত জমি তাদের ক্ষেতভুক্ত করিয়াছে। দাদাজী ক্ষেত দেখিতে গেলেন। ভিড় করিয়া বহু হিতৈষী প্রতিবেশী সঙ্গে গেল। সকলেই দাদাজীকে উস্কানি দিতে লাগিল : এমন বাড়াবাড়ি কিছুতেই সহ্য করা যায় না। আজ বেটাদেরে আক্কেল দিতেই হইবে। কিন্তু দাদাজী উল্টা আক্কেল দিলেন নিজের কামলাদেরে। কোথায় একহাত জমি কাটিয়া লইয়াছে? আমাদের ক্ষেত উঁচা অপর পক্ষেরটা নিচা। আমাদের আইলটাই কালক্রমে ধসিয়া-ধসিয়া ওদের ক্ষেতে পড়িয়াছে। কোদালে ক্ষেতের কানি সাফ করিবার সময় ঐটুকুই মাত্র কাটিয়াছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা একটা বড় রকমের দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখিবার আশা করিতেছিল, তারা নিরাশ হইয়া বাড়ি ফিরিল। ফরাযীরা আসলে ভীরু কাপুরুষ।
আরেকটা ঘটনা বাপজীর আমলের। বাড়ি হইতে দূরে এক ক্ষেতের মধ্যে বড় একটা আমগাছ ছিল। খুব আম ধরিত। একবার চাকর আসিয়া নালিশ করিল পাড়ার পুলা-পানে সব কাঁচা আম পাড়িয়া ফেলিতেছে। উপস্থিত সকলেই আশা করিল ব্যাপার একটা কিছু ঘটিবেই। ঘটিলও। বাপজী চাকরকে ধমক দিলেন : কাঁচা আম পুলা-পানে খাইব না ত বুড়ারা খাইব? যা তুই দেখ গিয়া পুলাপান যাতে আম পাড়িতে গিয়া নালিয়া ক্ষেত পাড়াইয়া ভাঙ্গে।
পরে সকলেই মন্তব্য করিয়াছিল, এমন দিনে-দুপুরে অত্যাচার অবিচারেরও যদি প্রতিকার না করে, তবে ফরাযীরা গ্রামে থাকিতেই পারিবে না। বাপ-দাদার এই দুর্বলতাকে আমি নিজেও ছেলে-বেলা পছন্দ করিতাম না। পরে পছন্দ করিয়াছিলাম। বয়স হইলে বুঝিয়াছিলাম আমার বাপ-দাদার কথাই ঠিক। কী হইত ঐ তুচ্ছ ব্যাপার লইয়া মানুষের সাথে ঝগড়া করিয়া? বরঞ্চ উল্টা ক্ষতিই হইতে পারিত। সত্যই তাই। এক-আধ-ইঞ্চি জমির দখল লইয়া দু-চারটা আম-কাঁঠাল লইয়া কত মামলা মোকদ্দমা দেখিয়াছি। উকিল হইয়া আরো বেশি দেখিয়াছি। হাজার-হাজার টাকা খরচ হইতে দেখিয়াছি। দশ-বিশজন খুন-জখম হইতে দেখিয়াছি। দু-দশজনের জেল-জরিমানা হইতে দেখিয়াছি। গোড়াতে একপক্ষ সবুর করিলে এ সব হইত না।
.
২. উস্তাদের শিক্ষা
হক-নাহক জ্ঞানও পাইয়াছিলাম বাপ-দাদার নিকট হইতেই। আই-এ পড়ার সময় নিতান্ত অভাবের দিনেও রাস্তায় বাইশ টাকা পড়িয়া পাইয়া টাকাটা হজম করিতে পারিলাম না ত ঐ কারণেই। ও-টাকা যে আমার নয় পরের, এটা বুদ্ধি-বিবেচনা, চিন্তা-ভাবনা করিয়া বুঝি নাই। এমনি স্বভাবতই আপনা হইতেই উৎপ্রেরণা বশেই বুঝিয়াছিলাম।
বাপ-দাদার-দেওয়া এই মতিগতি আরো জোরদার হয় মৌলবী মুজিবর রহমানের সংশ্রবে আসিয়া। তিনি তখন দি মুসলমান দৈনিক করিবার আশায় টাকার জন্য বর্মা-বাংলা দৌড়াদৌড়ি করিতেছেন। তবু যথেষ্ট টাকা উঠিতেছে না। তেমনি একদিনে তৎকালীন মন্ত্রী নবাব মোশাররফ হোসেন মৌ, সাহেবের নিকট প্রস্তাব দেন, যদি দি মুসলমান নবাব সাহেবের মন্ত্রিত্ব সমর্থন করেন, তবে তিনি দি মুসলমান-এ পঞ্চাশ হাজার টাকার শেয়ার কিনিবেন। এই মুহূর্তে পঁচিশ হাজার। সমর্থনে একটা এডিটরিয়েল লেখার পরই বাকি পঁচিশ হাজার। প্রস্তাবটা তিনি সোজাসুজি মৌলবী সাহেবের কাছে করেন নাই। তিনি মৌলবী সাহেবকে ভাল করিয়াই জানিতেন। প্রস্তাব করেন দি মুসলমান-এর ম্যানেজার মৌলবী সাহেবের কনিষ্ঠ চাচাত ভাই মি. রফিকুর রহমান সাহেবের কাছে। রফিকুর রহমান সাহেব এমএ। দু চারটা ভাল-বেতনের চাকুরি ইচ্ছা করিলেই তিনি পাইতে পারিতেন। কিন্তু মৌ. সাহেবের অনুপ্রেরণায় তিনিও আমাদের সমান অল্প বেতনে দি মুসলমান-এর ম্যানেজারি করিতেছিলেন। সততা-সাধুতায় তিনিও প্রায় মৌলবী সাহেবের অনুসারী। তবু বিষয়-জ্ঞানে তিনি আমাদের মতই বাস্তব। জ্ঞানী ও হিসাবি লোক। কিন্তু মৌলবী সাহেবের কাছে নবাব সাহেবের প্রস্তাব লইয়া তিনি নিজে যাইতে সাহস পাইলেন না। নবাব সাহেব নিজের এই প্রস্তাবের সৎ ব্যাখ্যা দিয়া মৌ, সাহেবের সামনে উপস্থিত করিবার মত সুন্দর যুক্তি-তর্কও দিয়াছিলেন। নবাব সাহেব কস্মিনকালেও এটাকে ঘুষ রূপে দিতেছেন না। তিনি সত্যি-সত্যি মুসলমানদের একটা ইংরাজি দৈনিকের অভাব তীব্রভাবে অনুভব করিতেছেন। মৌলবী সাহেবই এ কাজের একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি। দি মুসলমান-এর তিনি একজন পুরা সমর্থক। সেই হিসাবেই তিনি দৈনিক মুসলমান তহবিলে যৎকিঞ্চিৎ সাহায্য করিতেছেন। তবে কিনা একটু…ইত্যাদি। রফিক সাহেব আমাকে সব কথা। বলিলেন এবং আমাকেই এ কাজের দায়িত্ব দিলেন। আমাকে মৌলবী সাহেব অতিশয় স্নেহ করিতেন বলিয়া যা-তা বলিবার সাহসও আমার ছিল। আমি যথাসম্ভব গোছাইয়া নবাব সাহেবের যুক্তিগুলি পুরাপুরি বরঞ্চ রং লাগাইয়া মৌলবী সাহেবের কাছে বলিলাম। একদিন দুইদিন নয়, বেশ কয়েক দিন তাকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম। তিনি অনড়-অটল। আমার সব যুক্তির জবাবে তিনি বলিলেন ও সব যুক্তিই তার জানা। সব জানিয়া শুনিয়াও নিরুপায়ের নীরব থাকা সম্পর্কে কলিকাতায় সর্বজন পরিচিত একটা প্রবাদ চালু আছে : “নিমতলার ঘাটও চিনি, কাশী মিত্তিরের ঘাটও চিনি। কিন্তু কথা বলতে পারি না। আমি যে মরে আছি।” মৌলবী সাহেব হাসিয়া এই প্রবাদটি আমাকে শুনাইলেন। এর পরেও আমি পরাজয় মানিলাম না। এই অভাবের দিনে এমন হাতে-পাওয়া পঞ্চাশ হাজার টাকা লোকসান হইয়া যাইতেছে এর উত্তরে তিনি বলিলেন : “দেখ আবুল মনসুর, এক-একজনের এক-একটা নেশা থাকে। মদ-মেয়ের নেশাতেই কত ধনী ও বিদ্বান লোক কত ধন-দৌলত নষ্ট করিতেছে। হাজার সদুপদেশ দিয়াও তাদেরে ফিরান যায় না। ধর এ অবাস্তব সাধুতা আমার একটা নেশা। এ নেশা ছাড়াইবার চেষ্টা করিয়া তোমরা সফল হইবে না। এরপর পরাজয় স্বীকার করিতেই হইল।
