বলিয়া হাজী সাহেব উঠিলেন। আমি মুহরি সাহেবকে বলিলাম : হাজী সাহেবের টাকা ফেরত দাও।
মুহরি সাহেব একতাড়া নোট আনিয়া এমন জোরে টেবিলের উপর রাখিলেন যাতে আমার মনে হইল ঐ নোটের তাড়া দিয়া তিনি আমার মাথায় বাড়ি মারিলেন।
হাজী সাহেব চলিয়া গেলে আমাকে নিরালা পাইয়া মুহরি সাহেব রাগ কম্পিত কণ্ঠে বলিলেন : এই রকমে উকালতি চলিবে না, সার। দেখলেনও ত একটা সামান্য কথায় কতগুলি টাকা হারাইলাম?
মুহরি সাহেব আমার একদিনের ফিস বত্রিশ টাকা ও নিজের তহুরি বাবত পাঁচ টাকা আদায় করিয়াছিলেন। এ ছাড়া দাখিলি, শেরেস্তা, পেশকার, আমলা, নম্বর ইত্যাদি বাবতও আরো দশ টাকা আদায় করিয়াছিলেন। তার উপর আরজির কোর্ট ফি দেড় হাজার টাকা দাবির উপর যা আদায় করিয়াছিলেন তাতেও লাভ থাকিত। পরের টাকা হাতাইয়াও আরাম আছে। কথায় বলে : পরের হলদি বাটিলেও হাতে রং লাগে। কাজেই মুহরি। সাহেবের রাগের কারণ বুঝিলাম। ঠাণ্ডা হাসি হাসিয়া বলিলাম : কি দোষ করিলাম?
মুহরি : তামাদির কথা বলিতে গেলেন কেন?
আমি বিরক্ত-মাখা চোখে চাহিয়া বলিলাম : বলো কী? দাবি তামাদি হইয়া গিয়াছে, মক্কেলকে তা বলিব না? মিথ্যা করিয়া বলা উচিৎ ছিল সব ঠিক আছে?
মুহরি গম্ভীর সুরে বলিলেন : মিথ্যা বলিবেন কেন? কিছু না বলিলেই হইত। আরজি লিখিবার সময় আমরা ঠিক ফালগুন মাসের লেন-দেন লিখিয়া দিতাম। হাজী সাহেবকে পরে বুঝাইলেই তিনি তা মানিয়া নিতেন।
আমি যখন দৃঢ়স্বরে জানাইলাম যে, মুহরি সাহেবের সহিত আমি একমত নই, তখন তিনি বলিলেন, অন্য যে কোনও উকিল তার মত-মতেই কাজ করিতেন। করিবেনও তাই। হাজী সাহেব অন্য উকিলের হাতে পড়িবেন। মামলা দায়েরও হইবে। মাঝখান হইতে আমার ফিসটা মারা গেল। মামলাটা খুবই কনটেটেড হইবে। আরো অনেক ফিস পাওয়া যাইত। আমাদের টাকাও গেল। বদনামও হইল। অন্য উকিল হাজী সাহেবকে বুঝাইবেন, তাঁর মামলা মোটেই তামাদি হয় নাই। যে উকিল তামাদির কথা বলিয়াছে, সে কিছু আইন জানে না। হাজী সাহেব সে কথা বিশ্বাস করিবেন। নাহক আমাদের ফিসটা মারা গেল।
আমি মুহরি সাহেবকে সান্ত্বনা দিলাম, ঐ টাকা আমাদের হক্কে ছিল না বলিয়াই পাইলাম না। যদি ওটা কিসমতে থাকে, তবে ঘুরিয়া-ফিরিয়া তা আসিবেই।
মুহরি সাহেব বিনয়ের নিচে রাগ গোপন করিয়া বলিলেন : ‘টাকা পকেটে পাইয়াও যদি আমরা ফেলিয়া দেই, তবে তা আবার আমাদের পকেটে ফিরিয়া আসিবে টাকার এমন হাত-পা নাই।
মুহরি সাহেব নামাজি মানুষ। খুব সকালে উঠিয়া তিনি কালামুল্লাহ তেলাওত করিতেন। আমি রাগ করিয়া বলিলাম : তুমি নামাজি মানুষ। তাই আল্লার উপর তাওয়াক্কুল না রাখিলেও বোধ হয় তোমার চলে। কিন্তু আমার যে তাওয়াক্কুল ছাড়া চলে না। তুমি দেখিয়া লইও কিসমতে থাকিলে এই মামলা আবার আসিবেই।
সপ্তাহ না যাইতেই হাজী সাহেব আসিয়া হাজির। সেদিন তিনি তার বড় ছেলেকে সঙ্গে আনিয়াছেন। ছেলেও প্রৌঢ়। হাজী সাহেব যা বলিলেন তার মর্ম এই : তিনি সকলের সঙ্গে বুদ্ধি-পরামর্শ করিয়া দেখিয়াছেন। আমার কথাই ঠিক। হক পাওয়ার জন্য আইনের বিধান মানিতে গিয়া কথা একটু ঘুরাইয়া ফিরাইয়া বলা যাইতে পারে। অতএব তিনি মামলা করিবেন। ইতিমধ্যে দুই
একজন উকিল এবং অনেক মুহরি এই মোকদ্দমা হাত করিবার জন্য হাজী সাহেবের বাড়ি পর্যন্ত গিয়াছেন। আমার চেয়ে কম ফিসে ও কম খরচে মামলা জিতাইয়া দিবেন বলিয়াছেন। কিন্তু হাজী সাহেব তাঁদের কাছে মামলা দেন নাই। আমারই কাছে আসিয়াছেন। উপসংহারে তিনি বলিলেন : ‘আমার ছেলেরা ও বিবি সাব বলিলেন, মামলা যদি করিতেই হয়, তবে প্রথমে যে উকিলের কাছে গিয়াছেন, তার কাছে যান। আমার নিজেরও ইচ্ছাও তাই। কিন্তু বিবি সাহেব আমার কথায় বিশ্বাস না করিয়া বড় ছেলেকে সঙ্গে পাঠাইয়াছেন।
আমি হাজী সাহেবের কথা শুনিতে-শুনিতে মাঝে-মাঝে মুহরি সাহেবের দিকে তাকাইতেছিলাম। তিনি একবার আমার চোখে-চোখে চাহিয়াই মাথা হেঁট করিলেন।
হাজী সাহেব কোমর-প্যাঁচা থলি খুলিতে-খুলিতে বলিলেন : আইনের যখন বিধান, তখন হক টাকার জন্য লেনদেনের সময়টা বদলাইতে রাজি আছি তবে তিন-তিনটা মাসের অতবড় মিছা কথাটা না বলিয়া মাস খানেকের কথা বলিলে হয় না?
আমি হাসিয়া বলিলাম : তিন মাসেও যে মিছা হইবে, এক মাসেও সেই মিছাই হইবে।
অবিশ্বাসের মাথা নাড়াইয়া হাজী সাহেব বলিলেন : উকিল সাহেব, আমি উম্মী মানুষ, কিন্তু একেবারে নাদান নই। তিন মাসের মিছা আর এক মাসের মিছার গোনা সমান হইতেই পারে না। এক টাকার চুরি আর একশ টাকার চুরির গোনাও সমান হইতে পারে না।
আমি হাজী সাহেবের সঙ্গে তর্ক বাড়াইলাম না। বলিলাম : আপনার কথাই বোধ হয় ঠিক। কিন্তু তিন মাসের কমে আপনার মামলার তামাদি রক্ষা হয় না। এখন কী করিবেন?
হাজী সাহেব দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া অর্ধ সমর্থনের সুরে বলিলেন : দেন তবে আল্লার নামে মামলা দায়ের করিয়া। তিনি মাসই পিছাইয়া দেন। কী করি? হক টাকার জন্য মিছা কথা বলিতে হইবে। আয় খোদা তুমি সাক্ষী থাকিও।
যথাসময়ে মামলার শুনানির দিনে হাজী সাহেব নিজে সাক্ষী দিতে আসিলেন এবং সঙ্গে আরো দুইজন হাজী সাক্ষী ও একজন ইউনিয়ন মেম্বর সাক্ষী হইয়া আসিলেন। সকলে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া ধৰ্মত হলফ করিয়া ফাল্গুন মাসের লেন-দেনের কথা, জুম্মার মসজিদে তলব-তাগাদার কথা এবং বিবাদীর দাবি স্বীকার করার কথা বেদেরেগ বলিয়া গেলেন। বিবাদীর উকিলের জেরার মুখে অগ্রহায়ণ মাসে লেনদেনের কথা খুব জোরের সঙ্গে অস্বীকার করিয়া গেলেন। হাজী সাহেবের মামলা পুরাপুরি ডিক্রি হইল। এবং আপিল পর্যন্ত সে ডিক্রি বহাল রহিল।
