এটা ত গেল উকিলদের নিজের মিছা কথা কওয়ার আবশ্যকতার নজির। মওক্কেলদেরে দিয়াও যে মিছা কথা বলান কত দরকার, কিভাবে দরকার, তাও আমাদের বিচার করিয়া দেখা দরকার। সরলভাবে স্বীকার করা দরকার যে, মওক্কেলকে ও সাক্ষীগণকে দিয়া মিছা কথা না বলাইয়া মামলা জিতা যায় না। কিন্তু সেগুলি আসলে মিছা কথা নয়, সত্য কথাই একটু গোছাইয়া সাজাইয়া বলা। মাটি, কাঠ ও পাথর দিয়া শিল্পী যেমন সুন্দর মূর্তি গড়েন, একই ঘটনাকে তেমনি বিভিন্ন রূপে ও আকারে সাজাইয়া হাকিমের সামনে উপস্থিত করিতে হয়; তবেই হাকিমরা বিচার করিতে পারেন। শিল্পীর নৈপুণ্যে অনেক সময় নকল জিনিসও আসল বলিয়া ভুল হয়। হাকিমরাও তাই কোনও কোনও ক্ষেত্রে ভুল বিচার করেন। কিন্তু ঐরূপ না সাজাইয়া শুধু সত্যের ও তথ্যের ঢেলা হাকিমের নাক বরাবর ছুড়িয়া মারিলে হাকিমরা ভুল করিতেন আরো বেশি। এইজন্য আইনও সে ব্যবস্থা করিয়াছে। পুলিশের কাছে যবানবন্দিকে আইন সাক্ষ্য বলিয়া স্বীকার করে না। অপরাধের স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করিবার অধিকার আসামিকে দেওয়া হইয়াছে। এইজন্য দেওয়ানি মামলার বাদী-বিবাদীর আরজি-জবাব উকিলরা মুসাবিদা করিয়া কোর্টে দাখিল করেন; পক্ষগণকে সোজাসুজি আদালতের সামনে দাঁড়াইয়া নিজের কথা বলিবার জন্য পাঠাইয়া দেন না। অর্থাৎ হাকিমের কাছে মক্কেলদের কথা উকিল বলেন আগে, মওক্কেল নিজে বলেন তার পরে। কাজেই মওক্কেলের কথা উকিল মানিয়া চলেন না, মওক্কেলই উকিলের কথামত চলেন। এ বিষয়ে একটি মজার ঘটনা উল্লেখ না করিয়া পারিতেছি না।
.
৯. সত্যের জন্যে মিথ্যার ভূমিকা
একদিন এক বুড়ো হাজী সাহেব মামলা লাগাইতে আসেন। একজন তাঁর নিকট হইতে প্রায় দেড় হাজার টাকা দামের ধান-সরিষা নিয়াছে। তলব তাগাদায় দেনা শোধ করে নাই। আমি হাজী সাহেবের সঙ্গে খানিক আলাপ করিয়া মুহরির হাওলা করিয়া অন্য কাজে ব্যস্ত হইলাম। কোর্ট ফি, উকিলের ফিস, মুহরির তহুরি ইত্যাদি সব খরচাদি আদায় করিয়া মুহরি খানিক পরে হাজী সাহেবকে আমার সামনে উপস্থিত করেন। আমি এক খণ্ড সাদা কাগজ টানিয়া লইয়া আরজির পয়েন্টস লিখিয়া লইতে লাগিলাম। হাজী সাহেব বলিয়া যাইতে লাগিলেন। বাদী-বিবাদীর নাম, তাদের পিতার নাম, গ্রাম, থানা, ধান-সরিষার পরিমাণ ও দাম লিখিলাম। কিন্তু ঋণ নিবার সময়-তারিখ লিখিতে গিয়া কলম ছাড়িয়া সোজা হইয়া বসিলাম এবং হাজী সাহেবের নিকট চাহিলাম। বলিলাম : হাজী সাহেব, সন-তারিখ ঠিকমত বলিতেছেন ত? কোনও ভুল করেন নাই ত?
হাজী সাহেব মাথা নাড়িয়া জোরের সঙ্গেই বলিলেন : আমার ভুল হইবার উপায় নাই। সব আমার মুখস্থ। কত তাগাদা করিয়াছি। শালার বেটা কি আমারে কম ঘুরাইয়াছে।
আমি বিষণ্ণ মুখে বলিলাম: বড়ই আফসোসের কথা হাজী সাহেব; আপনার মামলা চলিবে না; দাবি আপনার তামাদি হইয়া গিয়াছে।
হাজী সাহেব আসমান হইতে পড়িলেন। বলিলেন : তামাদি হইয়াছে? কেন হইয়াছে? কেন মামলা চলিবে না? হক টাকার আবার তামাদি? আমি হাজী সাহেবকে বুঝাইলাম, আইনের বিধান। তিন বছরের একদিন বেশি হইলেই দাবি পচিয়া গেল। পাওনা যতই হক হোক, আর মামলা চলে না। হাজী সাহেব চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। এখন তবে উপায় কী? আমি বলিলাম, উপায় একটা আছে। আপনার দাবি মাত্র তিন মাসের জন্য তামাদি হইয়া গিয়াছে। আপনি যদি ধান-সরিষার নেওয়ার তারিখ তিন মাস পিছাইয়া বলেন অর্থাৎ যদি পৌষের বদলে ফাল্গুন মাস বলেন, তবেই আপনার তামাদি রক্ষা হয়।
হাজী সাহেব কানে হাত দিয়া তাওবা-আসতাগফারুল্লাহ পড়িলেন। কী! মিথ্যা কথা বলিব? দেড় হাজার টাকার জন্য? মাফ করিবেন উকিল সাহেব। আমি আল্লার ঘর যিয়ারত করিয়া আসিয়াছি। দেড় হাজার ত দূরের কথা, দেড় লাখের জন্যও মিছা কথা বলিতে পারিব না।
হাজী সাহেবের ইমানদারিতে যেমন খুশি হইলাম, তার হক টাকাটা মারা যাইতেছে দেখিয়া তেমনি দুঃখিতও হইলাম। বোধহয় আমার মনের অগোচরে কেসটা হারাইবার আশঙ্কাও কাজ করিতেছিল। তাই হাজী সাহেবকে বুঝাইবার চেষ্ট করিলাম : এটা আসলে মিথ্যা নয়, সত্যের খাতিরে কথা একটু ঘুরাইয়া বলা মাত্র। ঐ লোকটা যে হাজী সাহেবের ধান-সরিষা নিয়াছে, এটা সত্য কথা। সে যে টাকা দেয় নাই, এটাও সত্য কথা। হাজী সাহেব যে লোকটার কাছে দেড় হাজার টাকা পাইবেন, এটাও সত্য কথা। এই হক টাকা ঐ নিমকহারাম লোকটা শোধ করিতেছে না। কাজেই নিরীহ হাজী সাহেবকে কোর্ট করিতে হইতেছে। আল্লার আইনে হক টাকার তামাদি নাই। অথচ গবর্নমেন্ট একটা আইন করিয়াছেন যে পাওনা সত্যই হক হোক, তিন বছর পর হইয়া গেলেই সেটা নাহক হইয়া যায়। আইনটা যে আল্লার নয়, গবর্নমেন্টের, গবর্নমেন্ট যে খৃষ্টান, হাজী সাহেবকে তা-ও বলিলাম। সুতরাং ঐ আইনের সাথে মিল রাখিবার জন্য যদি হাজী সাহেব লেন-দেনের মাসটা সনও নয় তারিখও নয়–একটু নড়চড় করেন, তবে কোনও গোনাহ হইবে না। কারণ সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি এটা করিতেছেন। ফতোয়াটা আরো মযবুত করিবার জন্য বলিলাম : হক পাওনা শোধ করা আল্লার আইন, আর তিন বছরে তামাদিটা খৃষ্টানদের আইন। খৃষ্টানের আইন আল্লার আইনের উপরে যাইতে পারে না।
কিন্তু প্রায় ঘণ্টাখানেকের এই ওজস্বিনী বক্তৃতায়ও কোনো কাজ হইল না। হাজী সাহেব এর পরেও বলিলেন : ‘না উকিল সাহেব, বুড়ো বয়সে এই কয়টা টাকার জন্য মিছা কথা বলিয়া ঈমান নষ্ট করিব না। মামলা আর করিব না, যদি হক্কে থাকে টাকা পাইব, না থাকিলে পাইব না।’
