উভয় প্রবীণ মুরুব্বির কথার কঠোর সত্যতা পরে বুঝিয়াছিলাম। কিন্তু তাদের উপদেশ মানিয়া চলিতে মনকে কিছুতেই রাজি করিতে পারি নাই।
.
৭. ‘নোবল প্রফেশন’
উকালতি ব্যবসাকে আমি উঁচু দরের মহান বৃত্তি ‘নোবল প্রফেশন’ মনে করিতাম। এখনও করি। আমাদের দেশের বড়-বড় উকিল-ব্যারিস্টারের মতামত এবং বই-পুস্তক পড়িয়াই আমার এই বিশ্বাস হইয়াছে। অবশ্য এর বিরুদ্ধ কথাও শুনিয়াছি পরম শ্রদ্ধেয় আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় একদা প্রকাশ্য সভায় বলিয়াছিলেন : ‘উকিল ও বেশ্যা একই শ্রেণীর ব্যবসায়ী; একদল সতীত্ব বিক্রয় করিয়া খায়, অপর দল সততা বিক্রয় করিয়া খায়।’ আচার্য রায় ছাড়াও আরো অনেক বিজ্ঞানী ও শিক্ষক উকিলদেরে লইয়ার’ না বলিয়া ‘লায়ার’ বলিয়াছেন।
তলাইয়া বিচার করিলে শেষ পর্যন্ত দেখা যাইবে যে, উভয় মতের মধ্যেই সত্য আছে। এডমিনিস্ট্রেশন-অব-জাসটিস’কে যদি মহৎ কাজ বলিতে হয়, কোর্ট-আদালত, হাকিম-হুঁকামাকে যদি সভ্যতার অলংকার বলিতে হয়, মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার রক্ষাকে যদি মহান দায়িত্ব ও কর্তব্য বলিতে হয়, তবে উকিল সম্প্রদায়কে অমন উচ্চ মর্যাদার আসন না দিয়া উপায় নাই। উকিলরা যে এই এডমিনিস্ট্রেশন-অব-জাসটিসের অপরিহার্য অঙ্গ, সেটা যুক্তি ও দৃষ্টান্ত দিয়া বুঝাইবার দরকার নাই।
বলা যাইতে পারে উকালতি মানুষের মন ও চরিত্রকে ‘এনোবল’ করে। মানুষের হৃদয়কে উদার, চিন্তাকে উন্নত ও দৃষ্টিকে প্রসারিত করে না। কারণ আসলে উকিলরা নিজেদের মক্কেলকে জিতাইতেই চান, সুবিচার চান না। মামলা জিতিবার জন্য তারা মওক্কেল ও সাক্ষীকে মিথ্যা কথা শিখান। ধর্মের নামে হলফ করিয়া মানুষ যে আদালতের কাঠগড়ায় ডাহা মিথ্যা কথা বলিয়া আসে, তা কেবল এই বিদ্বান-বুদ্ধিমান উকিলদের পরামর্শেই।
অভিযোগ মিথ্যা নয়। একটু পরেই নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নজির দিতেছি। কিন্তু তার আগে একটু ভূমিকা করিয়া লইতে চাই।
আমাদের মনে রাখিতে হইবে কোনও ব্যবসা বা রোযগারের পথই মানুষকে পুরাপুরি এনোবল করে না। সব রোযগারের পথেই কিছু না কিছু দোষ-ত্রুটি আছেই। সব ব্যবসাতেই মানুষ নিজের স্বার্থের দিকটা সকলের আগে দেখিয়া থাকে। দৃশ্যত সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবসা যে মসজিদের এমামতি, মন্দিরের পৌরাহিত্য, গির্জার ক্লার্জিম্যানগিরি, তবলিগ বা মিশনারিগিরি, এমনকি মাস্টার-প্রফেসারগিরি, এ সব ব্যবসাও স্বতই মানুষের আত্মাকে উন্নত করে না। অন্যান্য ব্যবসার কথা ত উঠেই না। সব ব্যবসা ও রোযগারের ব্যাপারেই ভাল-মন্দ দুই দিক আছে। একজন চরিত্রহীন পাষণ্ড লোককে সৎপথে আনিয়া একজন মুবাল্লেগ বা মিশনারি, একটা বখাটে বাউণ্ডেল ছেলেকে পরীক্ষা পাশ করাইয়া একজন শিক্ষক যে আনন্দ পাইবেন, একজন কঠিন-পীড়াগ্রস্ত মৃতপ্রায় রোগীকে আরোগ্য করিয়া একজন ডাক্তার যে আনন্দ পাইবেন, একজন নিরপরাধ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড হইতে খালাস করিয়া একজন উকিলও ঠিক তেমনি আনন্দ পাইবেন। কাজেই মিশনারি শিক্ষক, ডাক্তার ও উকিলরা সমান মর্যাদার অধিকারী। পক্ষান্তরে বেহেশতের টিকিট বিক্রয় করিয়া মুবাল্লেগ-মিশনারি, পরীক্ষার প্রশ্ন অগ্রিম বিক্রয় করিয়া শিক্ষক, কায়দায় পাইয়া রোগীর নিকট হইতে গলা-কাটা ভিজিট আদায় করিয়া ডাক্তার যে পাপ করিয়া থাকেন, উকিলদের এই শ্রেণীর পাপও ওঁদের পাপের সমান, কিছুমাত্র বেশি নয়।
.
৮. মিথ্যাই সত্য
উকিলরা নিজেরা মিছা কথা কন, মওক্কেল ও সাক্ষীদেরও মিছা কথা কওয়ান। আগে তাঁদের নিজেদের মিথ্যা ভাষণেরই বিচার করা যাউক। উকিল যদি মওক্কেলের ক্ষতি না করেন; মওক্কেলের ভালর জন্য যদি দু চারটা মিছা কথা বলান এবং বলেন, তবে সেটা দোষের হইবে কেন? এমনকি খোদ মওক্কেলকেও যদি ফাঁকি দেন, তবে সব-সময় তা দোষের হইবে না। ধরুন একটি লোক বাড়িতে শরিকদের সঙ্গে ঝগড়া করিয়া হলফ করিয়া আসিয়াছেন, পরদিনই তিনি বাটোয়ারা মামলা দায়ের করিবেন। সমস্ত টাকা-পয়সা ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্র আপনাকে বুঝাইয়া দিয়া তিনি পরদিনই মামলা দায়ের করিতে বলিলেন। আপনি তার সহিত তর্ক করিলেন না। তাঁর কথামত কাজ করিতে রাজি হইয়াই মামলা গ্রহণ করিলেন। আপনি যদি বলিতেন অত তাড়াতাড়ি করিবার মত সময় আপনার নাই, কিম্বা যদি বলিতেন অত তাড়াতাড়ি করিলে আরজিতে ভুল-ভ্রান্তি থাকিয়া। যাইতে পারে, যদি তাকে বুঝাইবার চেষ্টা করিতেন যে, মামলাতে তামাদির কোনও প্রশ্ন নাই, তাড়াহুড়ার কোনও দরকারও নাই, ধীরে-সুস্থে মামলা দায়ের করিলেই চলিবে, তবে তিনি আর আপনার মক্কেল থাকিতেন না। কারণ তিনি ক্রুদ্ধ মানুষ। তিনি পরদিনই মামলা দায়ের করিতেই আসিয়াছেন। পরেও মামলা দায়ের করা যাইতে পারে–এই যুক্তি শুনিতে তিনি আসেন নাই। সেই যুক্তি তাঁর আগে হইতেই জানা আছে। কাজেই আপনি অভিজ্ঞ বুদ্ধিমান লোকের মতই বিনা-তর্কে মামলা গ্রহণ করিলেন। তাঁর কথামতই মামলা দায়ের হইবে বলিয়া তাকে বিদায় দিলেন। কিন্তু বাড়ি ফিরিয়াও ভদ্রলোকের শান্তি নাই। একদিন পরেই তিনি আপনার কাছে আসিয়া খোঁজ করিলেন, মামলা দায়ের হইয়াছে কিনা? আপনি তার কাগজ পত্র পড়িয়াছেন। আরজিও মুসাবিদা করিয়াছেন। ফারায়েযটা আবার রিভাইয করিতে হইবে। আর একদিনে মুসাবিদাটা ঠিক হইয়া যাইবে। আপনি সাধ্যমত তাড়াতাড়ি করিয়াছেন। গত দুই রাত্র একটু বেশি রাত্র পর্যন্ত জাগিয়াছেন। কাজেই আপনার মুহরি এবং আপনি নিজেও মওক্কেলকে বলিয়া দিলেন তার মামলা দায়ের হইয়া গিয়াছে। মিথ্যা কথা। কিন্তু এ মিথ্যা কথা আপনি মওক্কেলের অনিষ্ট করিবার জন্য বলেন নাই; এ মিথ্যার ফলে মওক্কেলের কোনও ক্ষতিও হইবে না। বরঞ্চ মওক্কেলের মনটা প্রফুল্ল এবং তার এলাকায় তাঁর মস্তক উন্নত রাখিবার উদ্দেশ্যেই এই মিথ্যা কথা বলিয়াছেন। এই মিথ্যার ফলে মওক্কেলের ভালই হইবে, কারণ আপনি তাড়াহুড়া না করিয়া ধীরে-সুস্থে আরজি মুসাবিদা করায় তাতে ভুল-ভ্রান্তি থাকিবে না।
