জিজ্ঞাসা করিলামও না। অতঃপর আমার ফিস আদায়ের ভার মুহরি সাহেবের উপরই ছাড়িয়া দিলাম। আস্তে-আস্তে আমার ফিসসহ মামলা খরচের টাকা-পয়সা আদায় আমি একদম ছাড়িয়া দিলাম। মওক্কেলরা উপযাজক হইয়া আমার হাতে দিতে চাহিলেও আমি নিতাম না। বলিতাম : মুহরি সাবের হাতে দেন। অনেক বড়-বড় মওক্কেল এতে চটিতেন। এটাকে অপমান মনে করিতেন। কিন্তু আমি বুঝাইতাম : হিসাবের সুবিধার জন্য খাতায় তারিখ-মত টাকা-পয়সা জমা করিবার সুবিধার জন্যই এটা দরকার। কারণ পয়সা-কড়ির ব্যাপারে আমি একেবারে ছেলেমানুষ।তখন তারা নিরস্ত হইতেন। ফলে আমার উকালতি জীবনের শেষ পর্যন্ত মক্কেলদের সঙ্গে টাকা-পয়সার ব্যাপারে আমার সোজাসুজি সম্পর্ক ছিল না। মুহরিই আমার পক্ষ হইতে সকল টাকা-কড়ি আদায় করিতেন।
কিন্তু এই ব্যবস্থার একটা খারাপ দিকও ছিল। উকিল নিজ হাতে টাকা নিতে না পারেন, কিন্তু তাঁর ফিস কত, মুহরির পাওনা কত, কোর্ট ফি-আদি বাবত খরচ কত, এসব কথা মক্কেলের জানা উচিৎ। তা না করিয়া মওক্কেলকে অন্ধকারে রাখিয়া মুহরির উপর টাকা-পয়সা আদায়ের ভার দিলে টাকা-পয়সা আদায়ের যে সুবিধা হয়, সে কথা আগে বলিলাম। কিন্তু এর দোষের দিকটাও আমাদের দেখা উচিৎ। সাধারণ মওক্কেলরা উকিল-মুহরির ন্যায্য পাওনা দিতে চায় না বলিয়াই মুহরিরা পেশকার-শেরেস্তাদারের নামে টাকা আদায় করিতে বাধ্য হয়, এই হইল সাধারণ মত। কিন্তু কথাটা পুরাপুরি ঠিক নয়। শুধু মওক্কেলদেরে একতরফাভাবে দোষ দেওয়া চলে না। উকিল-মুহরিরাও এতে সমানভাবে দোষী। মওক্কেলরা উকিল-মুহরির নামে টাকা না দিয়া পেশকার-শেরেস্তাদারের নামে টাকা দেন, এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, মওক্কেলরা তাদের কেসের ব্যাপারে উকিলের চেয়ে পেশকার-শেরেস্তাদারকেই বেশি গুরুত্ব দিয়া থাকেন। ভাবটা এই : পেশকার-শেরেস্তাদার পক্ষে থাকিলে উকিল না হইলেও চলে। অজ্ঞ সাধারণ মওক্কেলের মনে এ ধারণা সৃষ্টি করিয়াছে কে? উকিল-মুহরিরাই। একদিনে এই ধারণার সৃষ্টি হয় নাই। আস্তে আস্তে অনেক দিনে এই ধারণার জন্ম হইয়াছে। উকিল-মুহরিরাই নিজেদের কাজে-কর্মে ও কথাবার্তায় এই ধারণার জন্ম দিয়াছেন। আয় ও মর্যাদা উভয় দিক হইতেই এতে আইন ব্যবসায়ীর লোকসান হইয়াছে।
.
৬. টাউট প্রথা এই ভ্রান্ত ধারণা হইতে যে আরেকটা কুপ্রথা আইন ব্যবসায়ে ঢুকিয়াছে তার নাম টাউট প্রথা। অবস্থা এমন দাঁড়িইয়াছে, টাউট না ধরিয়া আইন ব্যবসা, বিশেষত ফৌজদারি আইন ব্যবসা করা একরূপ অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে। গোড়াতে এই প্রথার পক্ষেও একটা নৈতিক ও আইন-সম্মত যুক্তি দেওয়া হইত, তাঁদেরে টাউট না বলিয়া এক শ্রেণীর ‘প্রাইমারি-লিগ্যাল এডভাইয়ার’ বলা যাইতে পারে। সুদূর পাড়াগাঁয়ের অজ্ঞ মামলা-ওয়ালাদের পথ-ঘাট চিনাইয়া ঠক-রাহাজান-পকেট-মারের হাত হইতে বাঁচাইয়া নির্ভরযোগ্য উকিল-মোখতারের শেরেস্তায় পৌঁছাইয়া দেওয়াও এডমিনিস্ট্রেশন-অব জাসটিসের একটা অঙ্গ। সুতরাং উকিল-মোখতারের মত তাদেরও একটা ফিস পাওয়া উচিৎ। এ ফিসটা ন্যায়ত মওক্কেলরই দেওয়া উচিৎ। কিন্তু নানা কারণে ওঁরা মক্কেলের কাছে তা সোজাসুজি চাইতে পারেন না। কাজেই উকিল-মোখতাররাই ঐ পাওনাটা আদায় করিয়া দেন। তাহা আদায় করিতে গিয়া কেউ নিজের ফিসটাই প্রয়োজন-মাফিক বাড়াইয়া আদায় করেন, কেউ পেশকার-শেরেস্তাদার এবং কোর্ট-এর নামে আদায় করিয়া থাকেন। কোর্ট শব্দ দ্বারা তারা অবশ্য মিন করেন কোর্ট ইন্সপেক্টর বা কোর্ট সাব-ইন্সপেক্টর। কিন্তু ঐ সংক্ষিপ্ত শব্দ ব্যবহারের মধ্যে উচ্চারণ-সুবিধা ছাড়াও আরেকটা উদ্দেশ্য লুক্কাইত থাকে। কোর্ট অর্থে যে কেউ-কেউ হাকিম-ম্যাজিস্ট্রেট বুঝেন তাতে টাকা আদায় সহজও হয়। অথচ হাকিমের নামে ঘুষ আদায়ের রিস্কও থাকে না। এইভাবে গোড়াতে টাউট প্রথার সৃষ্টি হইয়াছিল। কিন্তু কালক্রমে আজ এ প্রথা আফিস-আদালতের করাপশন প্রথার মতই অকটোপাসের শক্তি অর্জন করিয়াছে।
আমি যখন উকালতিতে ঢুকি, তখন অনেক হিতৈষী মুরুব্বি প্রবীণ উকিল আমাকে এই প্রথার উপকারিতা বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছেন। এঁদের বিরুদ্ধতার বিপদ সম্বন্ধেও আমাকে সজাগ করিয়াছেন। এক মুরুব্বি প্রবীণ উকিল নিজের সময়ের অভাবহেতু একটি দায়রা মামলা আমার কাছে পাঠাইয়াছিলেন। মামলায় জিতিয়াছিলাম। কাজেই মুরুব্বির প্রশংসা। পাইয়াছিলাম। কিন্তু এক কারণে তিরস্কৃতও হইয়াছিলাম। তদবিরকারককে আদায়ী ফিসের অংশ না দেওয়ায় তিনি উক্ত প্রবীণ উকিলের কাছে নালিশ করেন। মুরুব্বি আমার ঐ কাজকে ‘প্রফেশন্যাল মিসকন্ডাক্ট’ বলিয়াছেন। আরেকজন সিনিয়র ফৌজদারি উকিলের এই সুনাম ছিল যে তিনি আদায়ী ফিসের শতকরা পঁচাত্তর টাকা টাউটকে দিয়া থাকেন। আমি এ সম্বন্ধে তাঁকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি টাউট প্রথার উপকারিতা সম্বন্ধে ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা করিলেন। তাঁর মধ্যে মুদ্দা কথা ছিল দুইটা : (১) তুমি এক দিনে একটা কেস করিয়া পাইবে দশ টাকা; আর আমি একদিন দশটা কেস করিয়া পাইব দশদশং একশ। টাউটদের পঁচাত্তর বাদ দিয়াও আমার থাকিবে নেট পঁচিশ। (২) টাউট ছাড়া কেস করিয়া হারিলে মওক্কেলের গাল খাইতে হয়। উকিলের; আর টাউটদের মাধ্যমে কেস করিয়া হারিলে উকিলের গাল খাইতে হয় না, সে গাল খায় হাকিম। টাউট একশ একটা যুক্তি প্রমাণ দিয়া মওক্কেলকে চোখে আঙুল দিয়া বুঝাইয়া দিবেন এই উকিলের মত সুন্দর করিয়া কেস কেউ করিতে পারিত না। কিন্তু অপর পক্ষ হাকিমকে মোটা ঘুষ দিয়া মামলা জিতিয়াছে।
