আমার বক্তৃতায় ক্রিয়া শুরু হইল। আমার চেম্বারে লুঙ্গি-পরা, খালি গা, গামছা-কাঁধে মওক্কেলদেরে চেয়ারে বসিয়া থাকিতে রাস্তার লোকেরা দেখিতে পাইল। নিতান্ত অল্প-বয়স্ক ছেলেদেরে ছাড়া আর সকল শ্রেণীর মক্কেলদেরে আমি আপনি সম্বোধন করিতে লাগিলাম। এমনকি, দেশের বাড়িতে, রাস্তা ঘাটে ও হাটে-বাজারে, যাদেরে আমি ‘তুমি’ বলিয়া নাম ধরিয়া ডাকিতাম, কোর্টে-কাছারিতে-এজলাসে-কাঠগড়াতে, বার লাইব্রেরিতে তাঁদেরই ‘আপনি’ ‘অমুক সাহেব’ বলিয়া ডাকিতে লাগিলাম। মাতবর শ্রেণীর মওক্কেলরা আমার বৈঠকখানায় বসিয়া আমার ফরসি হুঁক্কা আর গড়গড়ায় তামাক খাইতে লাগিলেন। আমি নিজে হুক্কা টানিবার পর নিজ হাতে টেবিলের উপর দিয়া গড়গড়ার নল মওক্কেলের দিকে বাড়াইয়া বলিতাম : হুক্কা মরজী করেন।
কথাটা বনের আগুনের মতই শহর-সুদ্ধা ছড়াইয়া পড়িল। আমার নিকট প্রতিবেশী উকিল বন্ধু ছিলেন একজন জমিদার। তার সাথে আমার খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি সাহিত্যামোদী ছিলেন। তা ছাড়া তিনি আমার সাথে ক্রসওয়ার্ড ও দাবা খেলিতেন। আমার বৈঠকখানায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠান তিনিই প্রতিবাদ করিলেন সকলের আগে। আমার মক্কেলদের মধ্যে তারা নিজের প্রজার সংখ্যাও কম ছিল না। যদিও তিনি বরাবর শহরে থাকিতেন বলিয়া প্রজাদের অনেকেই তাকে চিনিত না, এবং তিনি নিজেও কোনও প্রজাকেই চিনিতেন না, তবু প্রজা ত? তাদের সাথে তিনি একত্রে চেয়ারে বসেন কী করিয়া? কাজেই তিনি আমার বাসায় আসা বন্ধ করিলেন। ঐ সব কাজের জন্য এবং দাবা খেলিতে অতঃপর তিনি তাঁর বৈঠকখানায় আমাকে ডাকিয়া নিতেন।
যা হোক আমার বাসায় এই সুবিধার কথা শুনিয়া মওক্কেল সাধারণের অধিকার বোধ ও আত্মমর্যাদা জ্ঞান বাড়িল। তারা প্রায় সব উকিলের বাসায় অমন ব্যবহার পাইবার আশা করিতে লাগিলেন। অনেকেই কাজে-কর্মে তাঁদের দাবি প্রতিষ্ঠা করিতে লাগিলেন। উকিলদের অনেকেই আমার নিন্দা করিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে না হইলেও কথাটাও বার লাইব্রেরিতে উঠিল। এই সময় বার লাইব্রেরিতে কনসালটেশানের জন্য অর্থাৎ মওক্কেলদেরে লইয়া কথাবার্তা বলিবার জন্য কোনও নির্দিষ্ট কামরা ছিল না। আমার প্রবর্তিত নয়া অধিকার খাটাইতে গিয়া অনেক মওকেল বার লাইব্রেরিতে উকিলদের জন্য নির্দিষ্ট চেয়ার খালি পাইলেই বসিয়া পড়িতে লাগিলেন। আমার প্রবর্তিত নয়া ব্যবস্থারই এটা কুফল বলিয়া সকলে আমার ভুল চোখে আঙুল দিয়া দেখাইতে লাগিলেন। কিন্তু আমি তাতেও পরাজয় স্বীকার না করায় অবশেষে মওক্কেলদের আক্রমণ হইতে উকিলদের চেয়ার রক্ষার উদ্দেশ্যে কনসালটেশনের জন্য অর্থাৎ মওক্কেলদের জন্য একটি কামরা আলাদা বলিয়া নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইল।
দ্বিতীয়টি এই : তৎকালে কোর্ট ফি আইন অনুসারে পঞ্চাশ টাকার বেশি মূল্যের মামলার দরখাস্তে লাগিত বার আনার কোর্ট ফি; এর কম মূল্যের মামলার দরখাস্তে লাগিত দুই আনার কোর্ট ফি। এই দরখাস্ত বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষেই লাগে। অধিকাংশ মামলার বিশেষত বকেয়া খাযনা মামলার দাবি প্রায়ই পঞ্চাশের কম থাকিত। আমি নয়া উকিল হিসাবে দেখিলাম যে পঞ্চাশ টাকার উপর-নিচ-নির্বিশেষে সমস্ত মামলার দরখাস্ত কোর্ট ফি খরচা বার আনা আদায় করা হইতেছে। আমি অনেক পুরাতন মামলাবাজ লোকের সঙ্গে আলাপ করিয়া দেখিলাম : দুই আনা কোর্ট ফির কমেও দরখাস্ত হইতে পারে, এ কথা তারা জানেন না। এমন অদ্ভুত কথা তারা কোনওদিন শুনেনও নাই। আমি দুই-একজন প্রবীণ উকিলকে এ কথা জিজ্ঞাসা করিলাম; তারা বলিলেন : ওটা উকিলদের ‘ট্রেড-সিক্রেট’। মক্কেলদেরে ও-কথা জানাইতে নাই। আমি আমার মুহরিকে এ কথা বলিলাম। তিনিও অপর উকিলদের কথা সমর্থন করিলেন। সকলেই বলিলেন : বেশির ভাগ মওক্কেলই বড় পাজি। তাঁরা উকিল-মুহরির ন্যায্য পাওনা দিতে চান না। তাঁদের নিকট হইতে কোর্ট ফি, পেশকার, শেরেস্তাদার, দাখিলি-রেজিস্ট্রারি ইত্যাদির বাজে দোহাই দিয়া টাকা আদায় করিতে হয়। আমি তাদের যুক্তি গ্রহণ করিলাম না। চিনা পরিচিত মওক্কেলদেরে এই ‘ট্রেড সিক্রেট’ বলিয়া দিলাম। তৎকালে কোর্ট ফি আইনের সংক্ষিপ্তসার বাংলায় দু-চার আনা দামের পুস্তিকাকারে কলিকাতায় পাওয়া যাইত। আমি অনেক মামলাবাজ লোককে দিয়া ঐ পুস্তিকার এক-এক কপি কিনাইলাম। ইহাতে উকিল-মুহরিদের অনেকেই আমার উপর ভয়ানক খাফা হইলেন। কিন্তু মক্কেলদের নিকট আমি খুব জনপ্রিয় হইয়া উঠিলাম। আমার পসার বাড়িয়া গেল।
.
৫. ফিস আদায়
কিন্তু ক্রমে বুঝিতে পারিলাম যে, আমাদের দেশের মফস্বলের মক্কেলরা বাস্তবিকই উকিলের ন্যায্য ফিস দিতে কৃপণতা করেন। এঁরাই আবার হাকিম, পেশকার, দারোগা, শেরেস্তাদার বাবত মুক্তহস্তে টাকা খরচ করেন। আমার নিজের বেলাতে এমন অনেক ঘটনা ঘটিয়াছে। মওক্কেল আমার ফিস বাবত দুটা টাকা দিলেন না। পকেট ঝাড়িয়া দেখাইলেন, বাড়ি ফিরিবার ট্রেন ভাড়া বাবত মাত্র চারি আনা পয়সা আছে। আজ দিতে পারিবেন না। দুই-এক দিনের মধ্যেই আমার ফিস লইয়া আসিতেছেন। আমার নিজের নিষ্ফলতা দেখিয়া আমার মুহরি আমাকে গোপনে বলিলেন : আপনি যদি ফিস আদায়ের ক্ষমতা আমাকে দেন এবং পরে কিছু না বলেন, তবে আমি চেষ্টা করিয়া দেখিতে পারি। আমি অনুমতি দিয়া বার লাইব্রেরিতে বসিয়া আড্ডা মারিতে লাগিলাম। আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরিয়া আসিয়া মুহরি সাহেব আমাকে পাঁচটা টাকা দিয়া বলিলেন : আজকার দুই টাকা, আগের পাওনা তিন টাকা। আমি বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতার সাথে বলিলাম : এটা কিরূপে সম্ভব হইল? মুহরি সাহেব বলিলেন : সে কথা জিজ্ঞাসা করিবেন না।
