মৌলবী সাহেবের কথিত উদ্দেশ্যে না হইলেও অন্য কারণে তৎকালে অধিকাংশ অবস্থাশালী মুসলমান হিন্দু উকিলদেরই কেস দিতেন। তৎকালে এই ধারণা খুব প্রবল ছিল যে, হিন্দুরাই ভাল উকিল; মুসলমানরা ভাল উকিল নয়। ধারণাটা নিতান্ত মিথ্যা ছিল না। মুসলমান উকিলদের অধিকাংশই ফৌজদারি কেস নিতেন। কয়েক দিন হাত-মুখ পাকাইয়াই তারা এসিস্ট্যান্ট পাবলিক প্রসিকিউটর হইবার আশায় অফিসারদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ আরম্ভ করিতেন। এর ফলে আরেকটা ধারণা মক্কেলদের মধ্যে হইয়াছিল যে মুসলমান উকিলরা দেওয়ানি মোকদ্দমা বুঝেন না। এই ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করিয়াই আমাকে উকালতি, তা-ও দেওয়ানি উকালতি চালাইয়া যাইতে হইল। কোনও মতে বাসা খরচ যখন চলিয়া যাইতেছে তখন শনৈঃ শনৈঃ অগ্রসর হইতেও আমার কোনও আপত্তি ছিল না।
.
৪. ‘অনুকিলী’-সততা
এই সময়ে উকিল হিসাবে আমি দুইটি কাজ করিলাম, যার ফলে উকিলরা যেমন আমার উপর খাফা হইলেন, মওক্কেল সাধারণ বিশেষত মুসলমান মওক্কেলরা আমার উপর তেমনি সন্তুষ্ট হইলেন।
প্রথমটি উকিলের বৈঠকখানায় মওক্কেলদের বসিবার ব্যবস্থা। তৎকালে ময়মনসিংহ শহরে প্রায় দুই-আড়াইশ উকিল। তার মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা মাত্র জন ত্রিশেক। বাকি সকলেই হিন্দু। তাদের মধ্যে দুই-তিনজন ব্যারিস্টার ছিলেন। হিন্দু উকিলদের চেম্বারে সাধারণ মুসলমান মওক্কেলরা চেয়ারে বসিতে পারিতেন না। তাঁদের জন্য ছিল টুল। প্রত্যেক হিন্দু উকিলের বৈঠকখানায় এককোণে মুসলমান মক্কেলদের জন্য একটি পানি-ছাড়া ডাবা (নারিকেলী হুক্কা), কতকটা ভুষি তামাক এবং কিছু টিক্কা থাকিত। মওক্কেলরা নিজ হাতে তামাক সাজিয়া খাইতেন। নিতান্ত শিক্ষিত ভদ্রবেশী ছাড়া আর সব মুসলমান মক্কেলকেই উকিলরা ‘তুমি’ বলিতেন। ময়মনসিংহ হিন্দু জমিদার-প্রধান জিলা। এখানে জমিদার ও তাদের কর্মচারী-আমলা সবাই মুসলমান প্রজাদেরে ছোট-বড়-ধনী-নির্ধন-নির্বিশেষে ‘তুমি’ বলিয়া থাকেন। উকিলরা তাদেরই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব। কাজেই জমিদার কাছারির এই আদব-কায়দা খুব স্বাভাবিকভাবেই উকিলের শেরেস্তায় ঢুকিয়াছে। এই জন্য হিন্দু উকিলের শেরেস্তায় মুসলমানদের অমর্যাদার, এই অবমাননার, এই নীচুতার, এই অছুৎ-অছুৎ ভাবটা বিশেষ কারো চোখে দৃষ্টিকটু লাগিত না। আমার কাছেও না।
কিন্তু আমি উকালতি করিতে আসিয়া দেখিলাম যে, শুধু হিন্দু উকিলদের নয়, মুসলমান উকিলদের বাসাতেও এই ব্যবস্থা। মুসলমান উকিলদের অধিকাংশেই আমারই মত কৃষক-সম্প্রদায়ের লোক। তাদের আত্মীয়স্বজন যারা মামলা করিতে আসেন, তাঁরাও অধিকাংশ শিক্ষাদীক্ষায় পোশাকে পরিচ্ছদে নিতান্ত সাধারণ লোক। মুসলমান উকিলের বাসাতে আসিয়াও তাঁরা বরাবরের অভ্যাস-মত টুলেই বসিতেন, চেয়ারে বসিতেন না।
হুঁক্কার অবস্থাও প্রায় তাই। এই ব্যবস্থা আমার মনে পীড়া দিল। দুই একজন ঘনিষ্ঠ মুসলিম বন্ধুর কাছে কথাটা তুলিলাম। তাদের এই ব্যবহারের প্রতিবাদ করিলাম। তারা আমার ভাবালুতার নিন্দা করিলেন। ব্যবসা করিতে গেলে ওসব সেন্টিমেন্টালগিরি চলিবে না। মামলায় মুসলমান মওক্কেলদেরে চেয়ারে বসিতে দিলে তারা মাথায় উঠিবে। হিন্দু উকিলরা আমাদের বৈঠকখানায় আসিবেন না। হিন্দু-মুসলিম উকিলদের মধ্যে পরস্পরের বৈঠকখানায় আড্ডা মারার যে একটা ভ্রাতৃত্ব গড়িয়া উঠিয়াছে, এটা নষ্ট হইবে। এতে মুসলমান উকিলদেরই ক্ষতি হইবে। বন্ধুরা নিজেদের অভিজ্ঞতা হইতেই এসব কথা বলিলেন। দুই-তিনজন গোড়ার দিকে নাকি আমার মতই চিন্তা করিতেন এবং কাজও এইরূপ শুরু করিয়াছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থেই ঐ ভাবালুতা ত্যাগ করিয়াছেন।
বন্ধুদের কথা আমার পছন্দ হইল না তাই তাদের অভিজ্ঞতার খুঁটি-নাটি জানিতে চাহিলাম। কে কবে কোন মুসলিম মওক্কেলকে চেয়ারে বসিতে দেখিয়াছিলেন, কোন হিন্দু বন্ধু তার প্রতিবাদ করিয়াছিলেন, ইত্যাদি জানিবার চেষ্টা করিলাম। বুঝিলাম, এঁরা কেউ কিছুই করেন নাই। কোনও হিন্দু বন্ধুও প্রতিবাদ করেন নাই। কাজেই অমন কোনও ঘটনাই ঘটে নাই। ঘটিয়া থাকিলেও এঁরা দেখেন নাই। অনুমানেই এঁরা এই চিত্র আঁকিয়া লইয়াছিলেন। যা হইতে পারে, হওয়া খুব সম্ভব, তাই হইয়াছে বলিয়া ইহারা চালাইয়া দিয়াছেন।
কাজেই এই ব্যবস্থা আমি মানিলাম না। আমার বৈঠকখানায় চেয়ারের সংখ্যা বাড়াইলাম। যে কোনও মওক্কেল আসিলেই আমি হাতের ইশারায় চেয়ারে বসিতে বলিতাম।
অনেক মওক্কেল আনন্দে আসন গ্রহণ করিতেন। কিন্তু অধিকাংশেই আমার কথা অগ্রাহ্য করিয়া টুলেই বসিতেন। আমি তাঁদেরে চেষ্টা করিয়া আনিয়া চেয়ারে বসাইতাম। তারা জড়-সড় হইয়া চেয়ারের কিনারায় বসিতেন। স্পষ্টই দেখিতাম তারা চেয়ারে বসিয়া অস্বস্তি বোধ করিতেছেন। তখন মামলার আলোচনা ফেলিয়া বসার ব্যবস্থা মান-সম্মান এবং মওক্কেলের অধিকার ইত্যাদি সম্বন্ধে বক্তৃতা শুরু করিতাম। উকিল-মোখতারদের সমস্ত বাড়ি-ঘর, দালান-কোঠা, টেবিল-চেয়ার ও খাট-পালং-এর প্রতিটি ইট-কাঠ মওক্কেলদের টাকায় হইয়াছে, এদিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতাম। মওক্কেলরা উকিলদের অন্নদাতা মনিব, উকিলরা মওক্কেলদের দিন চুক্তির কামলা, এই সব কথা বলিতাম। কে কোথায় কবে শুনিয়াছেন যে মনিবকে চাকর তুই-তুংকার করে? কে কোথায় দেখিয়াছেন যে চাকর চেয়ারে বসিয়া থাকে আর মনিব তার সামনে চেয়ারে না বসিয়া টুলে বসিয়া থাকে? দস্তুরমত কৃষক-প্রজার পাবলিক মিটিং-এর বক্তৃতা।
