আমি যখন বলিলাম যে আমি সওয়াবের আশায় নিজ হাতে পাকাই না। চাকর রাখিতে পারি না বলিয়াই এটা করি, তখন তিনি অতি সহজ গলায় বলিলেন : চাকরের দরকার নাই, বউ-মাকে নিয়া আসেন।
আমিও সরলভাবে বলিলাম : ওদেরে আনিয়া খাওয়াইব কী? প্র্যাকটিসের কথা ত আপনি জানেনই।
খান সাহেব গম্ভীরভাবেই বলিলেন : জানিয়াই এ কথা বলিতেছি। রেযেকের মালিক আপনি নন, আল্লাহ। বউ-মা ও ছেলেদেরে ধানীখোলা রাখিয়াছেন বলিয়া আল্লাহ তাদের রেযেক সেখানে পাঠাইতেছেন। শুধু আপনার একার রেযেক এখানে পাঠাইতেছেন। আপনি ওদেরে নিয়া আসেন। দেখিবেন, ওদের খোরাকি আল্লাহ এখানে পাঠাইতেছেন। আমার কথা বিশ্বাস করুন।
আশি-বৎসরের এই বৃদ্ধের এই কথার আন্তরিকতা তাঁর চোখে-মুখে ফুটিয়া উঠিল। আমি বলিলাম: আপনার কথা আমি বিশ্বাস করি; কিন্তু এই বাড়িতে ওদেরে আনি কেমন করিয়া?
উত্তরে খান সাহেব যা বলিলেন তাতে বুঝিলাম তাঁর আজিকার এ আগমন আকস্মিক নয়। তিনি আমার সপরিবারে থাকিবার বাড়ি ঠিক করিয়াই আসিয়াছেন। সামনের বাড়িটা দুই-একদিনের মধ্যে খালি হইতেছে। ও-বাড়ি তিনি আমার জন্য ঠিক করিয়া বাড়িওয়ালার সঙ্গে চূড়ান্ত কথা ঠিক করিয়া আসিয়াছেন। পরের রবিবারে যেন বউমাকে লইয়া আসি। ঐ বাড়ি যেদিন খালি হইবে, সেইদিনই যেন আমি উক্ত বাড়িতে প্রবেশ করিয়া বিছানা-পত্র, আসবাব-পাতি ঠিক-ঠাক করিয়া রাখি। বাড়িওয়ালার সাথে আমার কথা বলিবার দরকার নাই। আমার মঙ্গল চিন্তায় এই অনাত্মীয় বৃদ্ধের নিঃস্বার্থ আগ্রহ ও তৎপরতা দেখিয়া কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরিয়া উঠিল। আমি এই নূতন ব্যবস্থার আর্থিক দিকটার কথা ভাবিয়া শুধু বলিলাম : কিন্তু ও-বাড়ির ভাড়া যে অনেক বেশি।
তিনি হাসিয়া জবাব দিলেন : বউমা ও ছেলেদের খোরাকিটা যিনি পাঠাইতে পারিবেন, তিনি তাদের থাকার বাড়িটার ভাড়াও পাঠাইতে পারিবেন।
.
৩. নূতন অভিজ্ঞতা
আমি তাঁর পরামর্শ-মত কাজ করিলাম। দিনে-দিনে বুঝিলাম, খান সাহেবের কথা একেবারে মিথ্যা নয়। রোযগার বাড়িতে লাগিল। কায়ক্লেশে নয় বেশ স্বচ্ছন্দে ও সুখেই দিন যাইতে লাগিল। মওক্কেল বেশ বাড়িল। অবশ্য মওক্কেল যত বাড়িল, মেহমান বাড়িল তার চেয়ে অনেক বেশি। মওক্কেল যা আসিলেন, তাঁদের অধিকাংশেই আত্মীয় অথবা চিনাজানা ‘দেশের লোক’। লজ্জায় তাদের কাছে ফিস চাইতে পারিতাম না। নিতান্ত বাধ্য হইয়া চোখ-কান বুজিয়া যখন চাহিতাম তখন অসামান্য সরলতার সাথে তারা জবাব দিতেন : ‘বাবাজি, টাকাই যদি দিতে পারি, তবে আর আপনার কাছে আসিব কেন?’ কথাটার তাৎপর্য না বুঝিয়াই হয়ত এমন কথা তাঁরা বলিতেন। কিন্তু অর্থ যাই হোক, আমি ফিস পাইতাম না। আর ফিস তারা আমাকে দেন বা না দেন আত্মীয়তা হইতে তাঁরা আমাকে বঞ্চিত করিতেন না। অন্য উকিলকে ফিস দিয়া তারা রাত্রে আমার মেহমান হইতে বিন্দুমাত্র লজ্জা পাইতেন না। শহরে থাকিবেন অথচ আমার মত নিকট আত্মীয়ের বাসায় না উঠিয়া অন্যত্র উঠিলে আমিই বা কী মনে করিব, আর লোকেই বা কী বলিবে? এইভাবে মক্কেলের চেয়ে মেহমান বেশি হওয়ায়ও খোদার ফযলে একরকমে চলিয়া যাইত। এইখানেই খান সাহেবের কথার সত্যতা আরো বেশি করিয়া ঠিক প্রমাণিত হইল। খান সাহেব মাঝে-মাঝেই আমার খোঁজখবর করিতে আসিতেন। আমার বৈঠকখানা ভর্তি লোক দেখিয়া পরিতৃপ্তির হাসি-হাসিয়া বিদায় হইতেন। বৈঠকখানার লোকের শতকরা নব্বই জন যে মওক্কেল নয়, বাকি দশের অর্ধেক যে বিনা-পয়সার মওক্কেল তা-ও তিনি জানিতেন। কারণ কোর্টে সে কথা বলিতেন এবং সাহস দিতেন। বলিতেন, আগে ভিড় হউক। এই ভিড় হইতেই মওক্কেল বাহির হইবে।
আমার বিদ্যা-বুদ্ধি ও বাগ্মিতার প্রতি বাপজীর আস্থা ছিল অসীম। কাজেই উকিল হওয়ামাত্র আমার চারপাশে মওক্কেল মৌমাছির মত ভেনভেন করিয়া ঘুরিতে শুরু করিবে, এই ছিল তাঁর বিশ্বাস। কিন্তু বউমার নিকট ও লোক মুখে আমার অবস্থার কথা শুনিয়া তিনিও ঘাবড়াইয়া উঠিলেন। তাঁর মত নিরীহ সরল মানুষও বাড়ি বসিয়া থাকিতে পারিলেন না। আমাকে কেস দিবার জন্য তিনি আত্মীয়-বন্ধুর বাড়ি-বাড়ি ক্যানভাস করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। এই আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে একজনের কথা আমি ভুলিতে পারি নাই। তখন তার উপর রাগ করিয়াছিলাম। এখন ব্যাপার বুঝিতে পারিয়াছি বলিয়া সে রাগ আর নাই।
এই আত্মীয়টি একজন মৌলবী সাহেব। তিনি অনেক জমি-জমা-ওয়ালা অবস্থাশালী বলিয়া তাঁর নিজেরও অনেক মামলা-মোকদ্দমা ছিল। তার চেয়ে বেশি তিনি আশ-পাশের মামলাবাজ লোকদের মামলারও তদবিরাদি করিতেন। ফলে সপ্তাহে ছয় দিনই তিনি কোর্টে হাজির থাকিতেন। বাপজী এঁকেই আমার মুরুব্বি ধরিলেন। আমাকে কেস দিবার জন্য তাকে জোর করিয়া পাকড়াইলেন। মৌলবী সাহেব কেস ত দিলেনই না, কোরআন হাদিস আওড়াইয়া বাপজীকে বুঝাইয়া দিলেন যে, উকালতি পেশা মুসলমানের নয়; ওটা পেশাকারের ব্যবসার মতই হারাম। আমার মত একটা ভাল ছেলেকে ঐ হারাম ব্যবসায়ে দিয়া আমার বাপ গোনাহ্ করিয়াছেন। মৌলবী সাহেব নিজে ঐ পাপ কাজের সহায়তা করেন কেন, বাপজীর এই কৌতূহলের উপরে তিনি বাপজানকে এই জ্ঞানের নূর দান করেন : মুসলমানের জন্য নাপাক দুনিয়ায় দুনিয়াবি কাজের জন্য মামলা-মোকদ্দমার মত গোনার কাজ করিতেই যখন হয়, তখন সেটা মালাউন-কাফের-হিন্দুদের দিয়া করাই ভাল। বাপজীর মত ধার্মিক আত্মীয়ের প্রিয় পুত্রকে দিয়া তিনি এই পাপ করাইতে পারেন না।
