এই অধ্যায়ের শেষ কথা হিসাবে আমার তরুণ বন্ধুদের একটিমাত্র উপদেশই দিতে পারি : ‘স্ত্রীকে বিশ্বাস কর এবং সেটা শুরু কর প্রথম দিন হইতেই।
অধ্যায় বাইশ – উকালতি জীবন
১. শুরুতে নৈরাশ্য
১৯২৯ সালের নভেম্বর মাসে উকালতির সনদ লই ময়মনসিংহ জজকোর্টে প্র্যাকটিস করিবার জন্য। কিন্তু কলিকাতার সাংবাদিক জীবন গুটাইয়া আসিতে-আসিতে ১৯৩০ সালের জানুয়ারি হইয়া যায়। পঁচাশি টাকা মাহিয়ানার সাংবাদিকতা ছাড়িয়া উকালতি ধরিতে সাধ্যমত সাবধানতা অবলম্বন করিয়াছিলাম। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন যারা উকালতি করিতেছিলেন, চিঠি-পত্র লিখিয়া আগে হইতেই তাদের মতামত লইয়াছিলাম। প্রায় সকলেই জানাইয়াছিলেন যে আমার পক্ষে গোড়া হইতেই মোটামুটি দুই হইতে তিনশ টাকা মাসে রোযগার করা মোটেই কঠিন হইবে না।
তিনশ টাকা? তবে আর চিন্তাটা কী? স্নেহময় মৌলবী মুজিবর রহমান সাহেবকে যামিন দিয়া বাটারওয়ার্থ কোং হইতে দুই হাজার টাকার আইন বই লইয়া ময়মনসিংহে পৌঁছিলাম। আটাশ টাকা মাসের এক নূতন দালান ভাড়া করিলাম। উকিলের বাসার উপযোগী নয়া ফার্নিচার কিনিলাম। সাইনবোর্ড লটকাইলাম। নয়া বই-বোঝাই নয়া আলমারি-টেবিল চেয়ারে চেম্বার সাজাইয়া বসিলাম। আস দেখি এইবার কত মওক্কেল আসিতে পার।
কিন্তু মওক্কেল আসিল না। এক মাস-দুই মাস-তিন মাস গেল। শেষে চার মাসও যায়। নূতন উকিলকে কোর্ট গার্ডিয়ান করা হয়। এই গার্ডিয়ান গিরির ফিস বাবত প্রথম মাসে সাড়ে চার টাকা, দ্বিতীয় মাসে ন’টাকা, তৃতীয় মাসে ফের সাড়ে চার, চতুর্থ মাসে একদম শূন্য। বাড়ি ভাড়া বকেয়া পড়িয়াছে চার মাসে সোওয়াশ। বাটারওয়ার্থের কিস্তি খেলাফ চার মাসে দুইশ। চাচা উকিল, তার বাসায় খাই। তাই উপাস থাকি নাই।
ঘাবড়াইয়া গেলাম। স্ত্রী-পুত্র লইয়া নূতন দালানে ধুম-ধামে থাকিবার যে রঙ্গিন স্বপ্ন দেখিতেছিলাম, প্রবল ধাক্কায় সে স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেল; চোখে অন্ধকার দেখিতেছিলাম। কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করিলাম না। বাইরে ভড়ক ঠিক রাখিলাম।
এমন সময় দি মুসলমান-এর শেয়ার বিক্রয় সফলে মৌ. মুজিবর রহমান সাহেব ময়মনসিংহে আসিলেন। তিনি আমার দুরবস্থার কথা জানিতে পারিয়া আমাকে তার কাছে ফিরাইয়া নিতে চাইলেন। আমি রাজি না হওয়ায় তিনি নিজে খোঁজ-তালাশ করিয়া আট টাকা ভাড়ার ছোট বাসায় রাখিয়া গেলেন। আর নগদ চারশ টাকা দিয়া গেলেন। বাটারওয়ার্থের নিকট আরো সময় নিবেন, আশ্বাস দিয়া গেলেন। মৌলবী সাহেবকে বিদায় দিয়া স্টেশন হইতে সোজা বাসায় আসিলাম। কৃতজ্ঞতায় অঝোরে চোখের পানি ফেলিলাম।
এরপর আস্তে-আস্তে দু-একজন করিয়া মওক্কেল আসিতে লাগিল। তারা বড় গরীব। যা দিত চোখ বুঝিয়া তাই লইতাম। বন্ধু পরামর্শ দিলেন, অভিজ্ঞ মুহরি না রাখিলে কেস পাওয়া যাইবে না। তা ত বুঝি। কিন্তু মুহরি রাখি কেমনে? ছোট বাসা। অন্যলোক রাখিবার জায়গা নাই। স্টোভে নিজ হাতে পাক করিয়া খাই। মুহরিকে খাওয়াইব কেমনে?
জ্ঞানী-অভিজ্ঞ পুরান উকিলরা বলিলেন : যদি ঝর-ঝরা কাঁচা টাকা চাও ফৌজদারি প্র্যাকটিস কর। আর যদি মরিবার দিন পর্যন্ত রোযগার করিতে চাও, তবে দেওয়ানি প্র্যাকটিস কর। আমার যা অবস্থা, তাতে আমি আগে ঝর-ঝরা কাঁচা টাকার সন্ধানে ফৌজদারি কোর্টেই গেলাম। কিন্তু টাকা ধরা দিল না। বুঝিলাম, আয়ের বেশির ভাগ টাকা টাউটকে না দিলে সেখানে কেস পাওয়া যাইবে না। অনেক হিতৈষী বন্ধু যুক্তি দিলেন : একদম না পাওয়ার অপেক্ষা অর্ধেক পাওয়া ভাল। যুক্তি অকাট্য। কিন্তু মনকে প্রবোধ দিতে পারিলাম না।
দেওয়ানিতেই মনোযোগ দিলাম। দেওয়ানি প্র্যাকটিসে যারা হাত পাকাইয়াছেন, তাঁরা হুঁশিয়ার করিলেন : কমসেকম পাঁচ বৎসর পেটে-ভাতে থাকিতে হইবে।
তাই রাজি। পেটে-ভাতেই থাকিলাম।
বরাবরের মত স্টোভে আন্ডাভাজি ও চাউল সিদ্ধ করিতেছি, এমন সময় খান সাহেব সাহেব আলী ‘উকিল সাব’ ‘উকিল সাব’ চিৎকার করিতে করিতে আমার বৈঠকখানায় ঢুকিলেন। দুইটি মাত্র কামরা। সামনেরটি চেম্বার, পিছনেরটি শোবার ঘর। শোবার ঘরেই স্টোভ ধরাইয়াছি। চিল্লাইয়া ডাকিলাম : ভিতরে আসুন।
.
২. খান সাহেব সাহেব আলী
খান সাহেব ছিলেন পিতৃতুল্য ব্যক্তি। প্রবীণ মোখতার। আমার স্কুলজীবন হইতেই তাকে চিনি। স্কুল-কলেজের কোনও সভা-সমিতি হইতেই তিনি বাদ যাইতেন না। তিনি আমার লেখা ও বক্তৃতার খুব তারিফ করিতেন। আমাকে তিনি তখন হইতেই খুব স্নেহ করিতেন। পরবর্তীকালে আমি কংগ্রেসি হইয়া যাওয়ায় তিনি মর্মাহত হইয়াছিলেন। বলিতেন : মুসলমান সমাজের একটা জুয়েল হিন্দুদের পাল্লায় পড়িয়া নষ্ট হইল। তা সত্ত্বেও তিনি আমার হিত-চিন্তা করিতেন। আমাকে মুক্তি দিবার জন্য আল্লার কাছে দোওয়া করিতেন। পথে-ঘাটে, সময়ে-অসময়ে কংগ্রেস ছাড়িবার উপদেশ দিতেন।
এমন মুরুব্বি খান সাহেবের কাছে আমার কিছুই গোপনীয় নাই। কাজেই ভিতরে ডাকিলাম। তিনি আমাকে রান্না-রত দেখিয়া হাসিয়া বলিলেন : নিজ হাতে রান্না করিয়া খাওয়া খুবই সওয়াবের কাজ। কিন্তু সেটা ফকির-দরবেশ, সাধু-সন্ন্যাসীর কাজ; উকিল-মোখতারের কাজ নয়। রান্না-বান্নায় আমি যে সময় নষ্ট করিতেছি, ঐ সময় আইন বই পড়ায় নিয়োজিত করিলে খুবই উপকার হইবে।
