পশ্চিম বাংলার প্রধানমন্ত্রী ডা. প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ স্বাধীনতা লাভের চার পাঁচ মাসের মধ্যেই ১৯৪৮ সালের ১৫ জানুয়ারি পদত্যাগ করায় আমরা মুসলমানরা বিশেষত মুসলিম সাংবাদিকরা বেশ সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম। কিন্তু ডা. বিধান চন্দ্র রায় অতঃপর ২০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন। ডা. রায়, ডা. ঘোষের উদার নীতি অনুসরণ করিয়া চলিলেন। মুসলমানদের মধ্যে সাহস সৃষ্টির জন্য তিনি আমার এবং কলিকাতা ও হাওড়া শহরের অন্যান্য অনেক মুসলিম নেতার সক্রিয় সহযোগিতা চাহিলেন। আমি নিজে মুসলিম-প্রধান এলাকাসমূহে সভা করিলাম। মন্ত্রিসভার উদার নীতির অনুসরণ করিয়া হিন্দু রাষ্ট্র-নেতা, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরাও আমাদের সাথে বন্ধুত্বসূচক উদার ব্যবহার ও আমাদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে লাগিলেন। পাক-ভারতের সম্পর্ক সম্বন্ধে মূলনীতি নির্ধারণের আলোচনা সভাতেও সম্পাদক হিসাবে এবং সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হিসাবে সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদিগকে নিমন্ত্রণ করিতে থাকিলেন। এই সমস্ত ঘটনার দুইটির উল্লেখ করা দরকার মনে করি। পশ্চিম বাংলা সরকার নিয়োজিত পরিভাষা কমিটির রিপোর্ট আলোচনায় আমাকে নিমন্ত্রণ করা হইয়াছিল এবং আমার। মতামত রিপোর্টের বিরোধীও হইয়াছিল। সে কথা অন্যত্র উল্লেখ করিয়াছি। অপর ঘটনাটি এই : মহাত্মাজীর হত্যার পর পশ্চিম বাংলা সরকারের প্রচার দফতরের উদ্যোগে মন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের সম্পাদনায় মহাত্মাজী সম্পর্কে একটি পুস্তক প্রকাশিত হয়। এতে বাংলার বিখ্যাত চৌদ্দ-পনেরজন। সাহিত্যিক-সাংবাদিকের লেখা ছাপা হয়। আমারও একটি লেখা তাতে ছিল। আমার চিন্তায়ও মহাত্মাজীর প্রভাব ছিল অসাধারণ। কাজেই তার প্রতি আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা একটু বিশেষ ধরনের। এমন মহাত্মার হত্যায় আমি একরূপ ক্ষিপ্ত হইয়া গিয়াছিলাম। এমন সময় পশ্চিম বাংলার সরকার মহাত্মাজীর হত্যা সম্পর্কে লেখা চাওয়ায় আমি সাগ্রহে লেখা দিলাম। লেখাটা ইত্তেহাদ-এর সম্পাদকীয়ের চেয়ে অনেক কড়া হইল। এ প্রবন্ধে কঠোর ভাষায় আমি যা লিখিয়াছিলাম, তার সারমর্ম এই : রোগের গুরুত্ব দিয়া চিকিৎসকের কৃতিত্ব বুঝা যায়। চিকিৎসকের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াও তেমনি রোগের কঠিনতা বুঝা যায়। ছোট রোগে কেউ বড় ডাক্তার ডাকে না। ভারতীয় হিন্দুরা যে চরম দুশ্চিকিৎস্য ব্যাধিগ্রস্ত জাতি, তা প্রমাণিত হইল মহাত্মাজীর হত্যায়। যে গান্ধী আফ্রিকার গভীর অরণ্যে খালি পায়ে, খালি গায়ে ঘুরিলেও তাকে সাপে-বাঘে মারিত না, তেমন মহাপুরুষকে হত্যা করিবার মত আততায়ী পাওয়া গেল হিন্দু সমাজে। এতে প্রমাণিত হইল, এই জাতি বন্য পশুর চেয়েও হিংস্র ও নিকৃষ্ট। এই হিন্দু জাতিকে ব্যাধি-মুক্ত করিবার জন্য আল্লাহ যে চিকিৎসক পাঠাইয়াছেন তিনি যে সত্য-সত্যই মহাত্মা আজ তা নিঃসন্দেহ রূপে প্রমাণিত হইল। লেখাটা পাঠাইয়া চিন্তা করিতেছিলাম, ওটা ছাপা হইলেও হয়ত বইয়ের শেষ দিকে স্থান পাইবে। কিন্তু বই যখন আসিল, তখন দেখিলাম আমার লেখা প্রথম দিকেই সম্মানজনক স্থান পাইয়াছে। এই পুস্তক বাজারে প্রচারিত হওয়ার পর স্বয়ং প্রফুল্ল বাবুসহ অনেক পরিচিত-অপরিচিত হিন্দু ভদ্রলোক মুখে ও টেলিফোনে আমাকে কংগ্রেচুলেট করিয়া ছিলেন। পাকিস্তানে বসিয়া মুসলমানকে অমন গাল দিলে মহাত্মাজীর পিছনে-পিছনেই আমাকেও পরলোকগামী হইতে হইত। ভারতে তা হইল না দেখিয়া বুঝিলাম, হিন্দু সমাজ নীচ বটে কিন্তু সে নীচতা বুঝিবার মত উচ্চতাও তাদের আছে।
সরকার যতই উদার ও সহিষ্ণু হউন না কেন, হিন্দু জনসাধারণ অমন উত্তপ্ত পরিবেশে উদার ও সহিষ্ণু থাকিতে পারে না, আজাদ-এর উক্ত ঘটনার পর হইতে আমরা সকলেই সে বিষয়ে সচেতন হইলাম। বিশেষত আমরা মুসলিম সাংবাদিকরা এটা বুঝিলাম, আমরা আসলে পশ্চিম-বাংলা সরকারের অতিথিমাত্র। কাজেই সেই আতিথেয়তার অপব্যবহার করা আমাদের উচিৎ নয়। হিন্দুস্থানের বুকে বসিয়া আমরা পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলিয়া হিন্দু জনসাধারণকে ক্ষেপাইব, আর সেই ক্ষিপ্ত জনতার আক্রমণ হইতে আমাদিগকে রক্ষা করা হিন্দুস্থানি সরকারের ও পুলিশের পবিত্র দায়িত্ব বলিয়া দাবি করিব, এই মনোভাবকে কিছুতেই উৎসাহ দেওয়া যায় না। এমনিতেই নয়া স্বাধীন দেশের সকল সমস্যা তাদের মিটাইতে হইতেছে। দেশ ভাগ হওয়ার সাথে-সাথেই নেতাদের নিষেধ সত্ত্বেও লোকেরা লাখে-লাখে। দেশত্যাগ শুরু করিয়াছে। ফলে পাকিস্তানি সরকারের ন্যায় হিন্দুস্তানি সরকারও বাস্তুত্যাগী পুনর্বাসনের বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হইয়াছেন। এই সমস্ত সমস্যার ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি স্বরূপ নূতন কোনও সমস্যায় হিন্দুস্তানি সরকারকে ভারাক্রান্ত করা কিছুতেই উচিৎ হইবে না।
.
৯. ‘ইত্তেহাদ’-এর অপমৃত্যু
কাজেই আমরা মুসলিম সংবাদপত্রেরা সকলেই কাল-বিলম্ব না করিয়া ঢাকায় আসিবার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগিলাম। কিন্তু পূর্ব বাংলার মন্ত্রিসভার নিকট আমরা ইত্তেহাদ ওয়ালার কোনও অভ্যর্থনা বা সহানুভূতি পাইলাম না। সহানুভূতি বা অভ্যর্থনা আমরা আশাও করি নাই। কারণ ইত্তেহাদ সোহরাওয়ার্দী-সমর্থক কাগজ হিসাবে নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভায় বিরোধীদলের সংবাদপত্র ছিল। কাজেই আমরা তাদের কোন বিশেষ অনুগ্রহ চাই নাই। শুধু সরকারের মামুলি দায়িত্ব পালনই আশা করিয়াছিলাম। কিন্তু পূর্ব বাংলার মন্ত্রিসভা আমাদের জবাব দিলেন ইত্তেহাদএর পূর্ব বাংলা প্রবেশ নিষিদ্ধ। করিয়া। প্রথমবারের নিষেধাজ্ঞা অবশ্য মাত্র পনের দিন স্থায়ী হইয়াছিল। কিন্তু এটাই সবেমাত্ৰ-আত্মপ্রতিষ্ঠ ইত্তেহাদ-এর আর্থিক মেরুদণ্ডে বিশাল আঁকি লাগাইয়াছিল। কারণ ইত্তেহাদ-এর বিপুল সাকুলেশনের, সুতরাং এই বাবত আয়ের, চৌদ্দ আনাই ছিল পূর্ব বাংলার। এই আঘাত সামলাইয়া উঠিতে-না উঠিতেই আরো দুই-দুইবার ইত্তেহাদএর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হইল। এই দুইবারই দীর্ঘদিনের জন্য এবং শেষবারের অনির্দিষ্টকালের জন্য ইত্তেহাদ-এর পূর্ব বাংলা প্রবেশ নিষিদ্ধ হইয়াছিল। এই মুদ্দতে ইত্তেহাদ-এর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলী নিজে একাধিকবার ঢাকা আসিয়া ইত্তেহাদ-এর জন্য বাড়ি ভাড়া করিয়া ও তাতে প্রয়োজনীয় মেরামত করিয়া প্রচুর অর্থব্যয়ও করিয়াছিলেন। কিন্তু পূর্ব বাংলা সরকার তাঁর কাজে পদে-পদে বাধা সৃষ্টি করিয়া বিশেষত বিজলি সংস্থাপনের অসহযোগিতা করিয়া নবাবযাদার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দেন।
