এইভাবে ১৯৫০ সালের গোড়ার দিকে ইত্তেহাদ-এর অপমৃত্যু ঘটে। কিন্তু এটাও সত্য যে, দেশভাগ হওয়ার পরে ভারতের ভূখণ্ড হইতে পাকিস্তানি খবরের কাগজ বাহির হওয়ার কোনও যুক্তিও ছিল না।
.
১০. কলামিস্ট মাত্র
ইত্তেহাদএর মৃত্যুর পর আমারও সাংবাদিক জীবনের অবসান ঘটে। ১৯৫০ সাল হইতে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত চব্বিশ বছর ইংরাজি-বাংলা কাগজের কলামিস্ট হইয়া থাকাতেই আমার সাংবাদিকতা সীমাবদ্ধ ছিল। এটা ঘটে অবস্থাগতিকেই! পরিবার রক্ষার জন্য উকালতি ও পাকিস্তান রক্ষার জন্য রাজনীতি ধরিতে হইল। পেশায় ব্যস্ত উকিল ও রাজনীতিতে মেম্বর-মন্ত্রী হইলাম। জেল-যুলুমও খাঁটিতে হইল। এত ব্যস্ততায় সাহিত্য-সাধনা বিশেষ ব্যাহত হইল না সত্য, কিন্তু সাংবাদিকতায় কলামিস্টের বেশি কিছু হওয়া গেল না।
ঢাকার সম্পাদক-সাংবাদিকদের অধিকাংশই আমার কলিকাতার সাংবাদিক-জীবনের বয়ঃকনিষ্ঠ স্নেহাস্পদ সহকর্মী। হাজার ব্যস্ততার অজুহাতেও তাঁদের উপরোধ এড়ান গেল না। কলামিস্ট হইতে হইল। প্রথম বার বছরে ঢাকার প্রায় সব বাংলা দৈনিক-সাময়িকীর অন্তত বিশেষ সংখ্যায় গল্প-উপন্যাস-রম্যরচনা লিখিলাম অনেক। পরবর্তী বার বছরে ইংরাজি-বাংলা উভয় ভাষার কাগজেই লিখিলাম। এই মুদ্দতে একাধিক কারণে আমি সক্রিয় রাজনীতি থনে অবসর নিলাম। ফলে দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে উদারতা ও নিরপেক্ষতা লইয়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক তর্কিত সমস্যা-ভিত্তিক নিবন্ধ লিখিতে-পারিলাম প্রচুর।
এইসব গল্প-উপন্যাস-রস রচনার প্রায় সবগুলিই প্রকাশকদের আগ্রহে জনপ্রিয় বই আকারে বাহির ত হইলই এমনকি ইংরাজি-বাংলা প্রবন্ধ নিবন্ধগুলির অনেকগুলিও পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইল।
কলামিস্ট হওয়াতেই বোধ হয় এতগুলি পুস্তকের মেটিরিয়াল স্বতই তৈয়ার হইয়া গিয়াছে। সম্পাদক-সাংবাদিক থাকিলে এটা নাও হইতে পারে।
সপ্তম খণ্ড
আমার সংসার-জীবন
অধ্যায় একুশ – দাম্পত্য জীবন।
১. বিবাহ
আমার বিবাহ হয় ইংরাজি ১৯২৬ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি, মোতাবেক বাংলা ১৩৩২ সালের ১৩ই ফাল্গুন। তখন আমার বয়স আটাইশ বছর সাত মাস। আমার স্ত্রীর জন্ম ১৯১৬ সালের ১লা জানুয়ারি, মোতাবেক বাংলা ১৩২২ সালের ১৮ই পৌষ। অতএব তাঁর বয়স দশ বৎসর দুই মাস। এত ছোট নাবালিকাকে বিবাহ করিতে আমি রাজি হইয়াছিলাম কয়েকটি কারণে। আমার অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় আমার বাপ-মা মুখে না বলিলেও মনে-মনে কষ্ট পাইয়াছিলেন, এটা আমি বুঝিয়াছিলাম দেরিতে। বাপ-মার এই অসন্তোষ দূর করিবার মতলবে শেষ পর্যন্ত বিবাহ করিতে রাজি হইয়াছিলাম। আমাদের তৎকালীন তরুণ কংগ্রেসী নেতা বিপ্লবী মধুদা’র (শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্র মোহন। ঘোষের) অনুপ্রেরণায় দেশের স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য চিরকুমার থাকিবার সংকল্প করিয়াছিলাম। বাপ-মাকে খুশি করিবার উদ্দেশ্যে এই সংকল্প ভাঙ্গিলাম। সুতরাং বাপ-মার খেদমত করিবার জন্যই যে বিয়া, সে বিয়ার পাত্রী ছোট হোক, বড় হোক, তাতে কী আসে যায়? দ্বিতীয়ত, আমার এক বন্ধু (মৌ, আবদুল মান্নান খা আমার চাচাত ভায়রা) যখন এই বিয়ার প্রস্তাব নিয়া আসেন তখন দেখিয়া আহ্লাদিত হইলাম যে, পাত্রী আমার এক শ্রদ্ধেয় আলেম নেতার মেয়ে। মওলানা খোন্দকার আহমদ আলী আকালুবী সাহেবকে আমি ছাত্রজীবন হইতেই শ্রদ্ধা করিতাম। তার দুধে-আলতা রঙ্গের চেহারা, বিশাল কালো মিস মিসা চাপদাড়ি, বলিষ্ঠ গঠন, উন্নত নাসিকা শোভিত সুডৌল মুখমণ্ডল যে কোনও দর্শকের শ্রদ্ধা-ভক্তি ও প্রশংসা আকর্ষণ করিত। কাল আলপাকার শেরওয়ানি ও কালো ইরানি টুপিতে তাঁকে খুব মানাইত। এই পোশাকেই তাঁকে প্রথম দেখিয়াছিলাম। এই চেহারাটাই আজও আমার মনে দাগ কাটিয়া আছে। তার উপর ছিলেন তিনি কবি ও বক্তা। আসলে তিনি ছিলেন ইসলাম প্রচারক–মিশনারি। তৎকালে তার সহকর্মী সমাজ-সংস্কারকদের প্রায় সকলেই কবিতার বই লিখিতেন। যশোহরের মুনশী মেহের উল্লা, সিরাজগঞ্জের মুনশী মেহেরুল্লা ও মৌ. সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রভৃতি সকলেই কবি ছিলেন। অথচ নিছক কাব্য-সাধনা তাদের আদর্শ ছিল না। অধঃপতিত মুসলিম সমাজকে জাগরণে উদ্বুদ্ধ করিবার জন্যই এরা যেমন মুখে বক্তৃতা করিয়া। বেড়াইতেন, লিখিবার বেলা তেমনি কবিতায় উপদেশ দিতেন। আমি পাঠশালার জীবন হইতেই এই শ্রেণীর যে কয়জন কবি-বক্তার ভক্ত হইয়াছিলাম তাদের মধ্যে মওলানা আকালুবী ছিলেন অন্যতম। আমার স্কুল জীবনে মওলানা আকালুবী সাহেবের শুভ-জাগরণ, সিরাজী সাহেবের অনল প্রবাহ, মুনশী মেহেরুল্লার বিধবা-গঞ্জনা ইত্যাদি বই সরকার কর্তৃক বাযেয়াফত হয়। এতে এঁদের প্রতি আমার বিদ্রোহী মন অধিকতর আকৃষ্ট হইয়া পড়ে। তারপর মওলানা সাহেবের সাত শ্যালক ও আমি একই হোস্টেলে থাকিয়া পড়াশোনা করিতাম। তিনি প্রায় প্রতি মাসেই এক-আধবার হোস্টেলে আসিতেন। আমি শ্রদ্ধা-ভরে দূর হইতে তাঁকে দেখিয়া গর্ববোধ করিতাম। এই মুদ্দতেই আমার চাচা মুনশী ছমিরুদ্দিনের সাথে মওলানা সাহেবের ঘনিষ্ঠতা হয়। মওকাটা ছিল। এক শিক্ষা সম্মিলনী উপলক্ষে উভয়েই একই ট্রেনে ঢাকা যাওয়া। আমিও চাচাজীর সঙ্গী ছিলাম। গোটা পথটাই চাচাজী ও মওলানা সাহেব আলাপে কাটাইয়াছিলেন। বাড়ি ফিরার পর চাচাজী সময় পাইলেই মওলানা সাহেবের তারিফে পঞ্চমুখ হইতেন। তাতেই আমরা জানিতে পারি যে, মওলানা সাহেব আমাদের জমাতি লোক এবং ঐ অঞ্চলের মোহাম্মদীদের সর্দার। শুধু তা-ই নয় মওলানা সাহেবের দাদা (বাপের বাবা) মৌলবী খোন্দকার যহিরুদ্দীন সাহেব আমার দাদা গাজী আশেকুল্লা সাহেবের সঙ্গে একই সময়ে জেহাদে গিয়াছিলেন এবং এক সঙ্গে বালাকোট ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে জেহাদ করিয়াছিলেন। ঐ অঞ্চলে তিনিও গাজী সাহেব বলিয়াই পরিচিত ছিলেন। তবে ত মওলানা সাহেব আমাদের আপনজন। ঐ একটি মাত্র খবরেই মওলানা সাহেবের প্রতি আমাদের পরিবারের সকলের বিশেষত আমার একটা টান জন্মিয়া গেল। চাচাজীর নিকট হইতে আমরা আরো জানিয়াছিলাম যে, মওলানা সাহেবরা আসলে টাঙ্গাইলের লোক, জামালপুরের নহেন। টাঙ্গাইলের অন্তর্গত আকালুর খোন্দকার বংশের লোক তারা। আকালুর খোন্দকার মৌলবী মোহাম্মদ আবদুল্লার পাঁচ পুত্রের মধ্যে মওলানা আকালুবী সাহেব অন্যতম। মওলানা সাহেবের অন্যান্য ভাইয়েরাও আলেম ও সুবক্তা। তারপর তিনি খিলাফত ও কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মওলানা আবদুল্লাহিল বাকী, মওলানা ইসলামাবাদীদের সহকর্মীরূপে তিনি ইতিপূর্বেই এ জিলার আঞ্জুমানে-ওলামায়ে-বাংলার প্রচার ও সংগঠনে অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত এই সময়ে তিনি দুরারোগ্য ডায়েবিটিককার্বাঙ্কল রোগে আক্রান্ত হইয়া শয্যাশায়ী হন। তাঁর সাহিত্য সেবা, রাজনীতি, ধর্ম-প্রচার সমস্তই যুগপস্তাবে বন্ধ হইয়া যায়। আমি এর পর মওলানা সাহেবের আর কোনও খোঁজখবর পাই নাই।
