.
৭. ‘পাঠকের মজলিস’
সাধারণভাবে সংবাদপত্র ও তাদের পাঠকদের মধ্যে এবং বিশেষভাবে ইত্তেহাদ-এর লেখক-গোষ্ঠী ও পাঠকদের মধ্যে একটা চিন্তাগত আত্মীয়তা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে আমি ইত্তেহাদএ পাঠকের মজলিস’ নামে একটা ফিচার খুলি। এই ধরনের ফিচার সংবাদপত্র-জগতে এটাই প্রথম। এটা প্রচলিত সম্পাদকের নামে চিঠিপত্র কলাম নয়। লেখার বিষয়-বস্তু, মর্যাদা ও বলার ভঙ্গি সকল দিক দিয়াই চিঠিপত্রের ও মজলিসের মধ্যে পার্থক্য ছিল। এই পার্থক্য সম্বন্ধে পাঠকগণকে সচেতন করিবার জন্য ইত্তেহাদএর চিঠিপত্র কলামও যথারীতি যথাস্থানে বজায় রাখা হইয়াছিল। পাঠকের মজলিস’ ছিল পাঠকদের ডিবেটিং ক্লাব। এতে পাঠকরা সম্পাদকের দায়িত্ব ও অধিকার লইয়া কথা বলিতে পারিতেন। এতে বুদ্ধিমান পাঠকরা অল্পদিনেই এমন অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিলেন যে, বড়-বড় জটিল, গুরুতর, তর্কিত ও এখতেলাফী বিষয়েও সংক্ষেপে সুন্দর আলোচনা করিতেন। এইসব আলোচনার অনেকগুলি এত সুন্দর ও মূল্যবান হইত যে, আমাদের সম্পাদকীয়ের চেয়েও ভাল হইয়া যাইত। মরহুম মৌলবী মুজিবর রহমান সম্পাদকীয় কলম ছাড়া খবরের কাগজের বাকি সবটুকু অংশকে টাউন হল মনে করিবার যে উপদেশ দিতেন, সেই উপদেশ কার্যে পরিণত করিবার উদ্দেশ্যেই আমি ‘পাঠকের মজলিস’ খুলিয়াছিলাম। এই মজলিসে স্বাধীন মত প্রকাশ করিবার সম্পূর্ণ নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পাঠকদের ছিল। পাঠকরা ওতে স্বয়ং সম্পাদকের লেখার ও মতের সমালোচনা ও প্রতিবাদ করিতে পারিতেন। এতে একদিকে যেমন পাঠকদের মধ্যে লেখক ও সম্পাদক হওয়ার সুপ্ত প্রেরণা জাগ্রত হইত, অপর দিকে তেমনি সকল মত ও দলের নিকট ইত্তেহাদ-এর নিরপেক্ষতা সুস্পষ্ট হইয়া উঠিত। ফলে পাঠকরা ইত্তেহাদকে শুধু নিরপেক্ষ সুবিচারী কাগজই মনে করিতেন না, ইহাকে তাদের নিজের কাগজ মনে করিতেন। এইভাবে এক বছর পুরা হইবার বহু আগেই ইত্তেহাদ আফিস বাংলার মুসলিম তরুণ চিন্তানায়কদের পীঠস্থানে এবং ইত্তেহাদ মুসলিম-বাংলার প্রগতিবাদীদের মুখপত্রে পরিণত হইল।
.
৮. পশ্চিমবঙ্গ-সরকারের উদারতা
ইতিমধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত বাটোয়ারা হইয়া পাকিস্তানের জন্ম হইল। বাংলা ভাগ হইল। কলিকাতা পশ্চিম বাংলার ভাগে পড়িল। ঢাকা পূর্ব বাংলার রাজধানী হইল। ফলে স্বভাবতই মুসলিম-বাংলার সরকারি বেসরকারি শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মেজরিটি আস্তে-আস্তে কলিকাতা ছাড়িয়া ঢাকায় আসিতে লাগিলেন। এমতাবস্থায় কলিকাতাস্থ পাকিস্তান-সমর্থক সমস্ত সংবাদপত্রের কলিকাতা ছাড়িয়া ঢাকায় চলিয়া আসা খুবই স্বাভাবিক ও বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু বাস্তব অসুবিধাহেতু কোনো কাগজই আমরা কলিকাতা ত্যাগ করিলাম না। ভারতের বুকে বসিয়া পাকিস্তানের সংবাদপত্র চালাইয়া যাইতে লাগিলাম। পশ্চিম বাংলা ও ভারত সরকারের অসাধারণ কৃতিত্ব ও মহত্ত্ব এই যে, তারা সমস্ত মুসলিম সংবাদপত্রকে অবাধে বিনা-অসুবিধায় চলিতে দিলেন। পশ্চিম বাংলা সরকার ও ভারত সরকারের এই উদারতা, মহত্ত্ব ও সহনশীলতার কথা মুসলিম বাংলার সাংবাদিকরা চিরকাল কৃতজ্ঞতার সহিত স্মরণ রাখিবেন। এটা অতি স্পষ্ট কথা যে, দেশ ভাগ হওয়ার বহু আগে হইতেই মুসলিম সংবাদপত্রসমূহের লেখা হিন্দুদের বিরক্তি ক্রোধের উদ্রেক করিয়াছিল। দেশ ভাগ হওয়ার পর সম্পত্তি ও দায়-দেনার বাঁটোয়ারা লইয়া এই বিরক্তি ও ক্রোধে অধিকতর ইন্ধন ঢালা হইতেছিল। এক উত্তপ্ত পরিবেশে কলিকাতায় থাকিয়া সার্বিক কন্ট্রোলের ব্যবস্থার পশ্চিম বাংলার ভাগের নিউযপ্রিন্ট ব্যবহার করিয়া পশ্চিম বাংলা ও ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে ও পাকিস্তানের পক্ষে কঠোর ভাষায় গলাবাজি করিতে দেওয়া কম উদারতা ও সহনশীলতার পরিচায়ক নয়। এসব লিখিতে গবর্নমেন্ট আমাদের কোনও বাধা-নিষেধ ত দেনই নাই; বরঞ্চ বেসরকারি স্তরের কেউ আমাদের কাজে প্রতিবন্ধকতা করিবার চেষ্টা করিলে সরকার দৃঢ়হস্তে তা দমন করিয়াছেন। একটা দৃষ্টান্ত দিলেই বুঝা যাইবে। দেশ বাটোয়ারা ঘোষণা হওয়ার অব্যবহিত পরেই দেশের বিভিন্ন অংশে হিন্দু-মুসলমানে অমানুষিক হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। কলিকাতায়ই হয় বেশি। পুনঃপুন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উভয় পক্ষেই আক্রমণকারী হইলেও পাকিস্তানোত্তর কলিকাতার দাঙ্গায় স্বভাবতই হিন্দুরাই ছিল আক্রমণকারী। কাজেই মহাত্মা গান্ধী সাম্প্রদায়িক শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে স্বয়ং কলিকাতা আসেন এবং জনাব শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ দাঙ্গা পীড়িত এলাকায় অবস্থান অনশন করিতে থাকেন। এই সময় একদিন এক উন্মত্ত হিন্দু জনতা দৈনিক আজাদ আফিস আক্রমণ করে। ফলে একদিন আজাদ বাহির হইতে পারে নাই। আমরা প্রায় পঁচিশটি দৈনিক কাগজের সম্পাদকরা অমৃতবাজার-এর চিত্তরঞ্জন এভিনিউস্থ সিটি আফিসে সভা করিয়া এই গুণ্ডামির প্রতিবাদ করি; সরকারের নিকট প্রতিকার দাবি করি; জনসাধারণের সদিচ্ছার আবেদন জানাইয়া সংবাদপত্রে বিবৃতি দেই। এই সভায় পঁচিশজন সম্পাদকের মধ্যে আমরা মাত্র তিনজন ছিলাম মুসলমান। একমাত্র স্টেটসম্যান-এর সম্পাদক মি. আয়ান স্টিফেন ছাড়া আর সবাই। ছিলেন হিন্দু। এ সম্পর্কে জনসাধারণের নিকট আবেদন করিয়া যে বিবৃতি দেওয়া হইয়াছিল, তাতে মুসলমান ছিলাম আমি একা। শ্রীযুক্ত তুষার কান্তি ঘোষ, শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্র নাথ মজুমদার, শ্রীযুক্ত চপলাকান্ত ভট্টাচার্য, মি. সোমনাথ লাহিড়ী ও মি. স্টিফেন প্রভৃতি সবাই ছিলেন অমুসলমান। পশ্চিম বাংলা সরকার এমন ক্ষিপ্রতার ও দৃঢ়তার সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করিলেন যে, পরদিনই বিনা-বাধায় আজাদ প্রকাশিত হইল।
