এঁদেরেও হয়ত ক্ষমা করা যায়। কিন্তু মাঝে-মাঝে নয় প্রতিদিন যারা মুসলিম সমাজকে আত্মস্থ ও আত্মনির্ভরশীল হইতে উপদেশ দিতেছেন; অন্য সমাজের প্রভাব ও শোষণ-মুক্ত হইবার জন্য কর্মপন্থাও নির্দেশ করিতেছেন, তাঁরাও সস্তার যুক্তিতে মুসলমানের বদলে হিন্দু সাংবাদিকদিগকে চাকুরি দিবেন, এটা আমার বিবেচনায় ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ছিল।
.
৫. ‘ইত্তেহাদ’-এর প্রয়াস
কাজেই যখন ইত্তেহাদএর স্টাফ নিয়োগের ক্ষমতা আমার হাতে আসিল, তখন ইহাকে আমি মুসলিম সাংবাদিক গোষ্ঠী গড়িয়া তুলিবার অপূর্ব সুযোগ মনে করিলাম। সে সুযোগের সাধ্যমত সদ্ব্যবহার করিলাম। সাংবাদিকতা-শিক্ষার্থী উচ্চ-শিক্ষিত যুবকরা দলে-দলে আসিয়া ভিড় করিল। কতকালের বুভুক্ষা লইয়া যেন তারা অপেক্ষা করিতেছিল। মুসলিম শিক্ষিত যুবকরা সাংবাদিকতা লাইনে আসিতে চায় না বলিয়া কোনও-কোনও কাগজের কর্তারা যে অভিযোগ করিতেছিলেন, মুসলিম যুবকদের বিরুদ্ধে ঐ অভিযোগ যে মিথ্যা এলাম এটা স্পষ্ট প্রমাণিত হইয়া গেল। আমি শুধু সম্পাদকীয় বিভাগে যে পঁচিশ ছাব্বিশজন লোক নিয়োগ করিলাম তার মধ্যে কুড়িজনই ছিলেন গ্র্যাজুয়েট, তাঁদের দশ-বারজন ছিলেন এমএ। সরকারি চাকুরির প্রতি মুসলমান যুবকদের টান বেশি, এই অভিযোগের উত্তরে বলিতে চাই যে, উপযুক্ত পঁচিশ-ছাব্বিশজনের মধ্যে চৌদ্দ-পনেরজনই ছিলেন সরকারি কর্মচারী। তারা সাংবাদিকতায় হাত পাকান সাপেক্ষে সরকারি চাকুরি করিয়া যাইতেছিলেন মাত্র। আমি ইত্তেহাদ-এ তাদের চাকুরি কনফার্ম করামাত্র অধিকাংশই সরকারি চাকুরিতে ইস্তাফা দিতে প্রস্তুত হইয়াই আসিয়াছিলেন। এই ব্যাপারে তাঁরা এতই দৃঢ় ছিলেন যে, মুসলমান সরকারি কর্মচারীরা ইত্তেহাদ-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করিতেছেন বলিয়া কলিকাতার বিভিন্ন সংবাদপত্রে যখন আন্দোলন শুরু হয় এবং দৈনিক বসুমতী যখন তাদের নাম-ঠিকানা পর্যন্ত প্রকাশ করিয়া দেন, তখনও উহাদের অধিকাংশেই অবিচলিত থাকেন।
শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ অন্যান্য শিল্প-মালিকদের মত সংবাদপত্রের কর্তারাও ষোল আনা গ্রহণ করিতেন। কাজেই সংবাদপত্রের স্টাফের বেতন ছিল অত্যন্ত কম। বেতনের অল্পতার জন্যই শিক্ষিত যুবকরা সহজে সাংবাদিকতার দিকে আকৃষ্ট হইত না। হিন্দু যুবকরা যে মুসলমান যুবকদের চেয়ে বেশি সংখ্যায় ঐ অল্প বেতনে চাকুরি করিতেছে, তা তারা ঐ অল্প বেতনে সন্তুষ্ট বলিয়া নয়, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা হিন্দু সমাজে বেশি বলিয়া। কাজেই আমি ইত্তেহাদ এর স্টাফের এমন বেতনের সুপারিশ করিলাম, যা তাদের প্রয়োজনের মিনিমাম। এটা করিতে গিয়াও আমি প্রুফরিডারদের জন্য সর্বনিম্ন একশ এবং সাব-এডিটরদের জন্য সর্বনিম্ন সোওয়াশ বেতন ধার্য করিলাম। ম্যানেজারিয়াল ও কেরানির সর্বনিম্ন বেতন হইল প্রুফরিডারদের সমান। এই সমতা অনেক পুরাতন দৈনিক কাগজেই ছিল। অনেকেই পঞ্চাশ-ষাট টাকার প্রুফরিডারি ও সাব-এডিটারি করিতেছিলেন। অথবা যুদ্ধের পরিণামে মাংগা-বাজারের ফলে আফিস আদালতের পিয়ন-চাপরাশিরা পর্যন্ত এই সময় আশি টাকার বেশি পাইতেছিল।
.
৬. ‘ইত্তেহাদ’-এর জনপ্রিয়তার কারণ
অবস্থা-মাফিক সংগত পরিমাণ বেতন ধার্য হওয়ায় ইত্তেহাদ আফিসে গোড়া হইতেই প্রতিভাবান মুসলিম তরুণদের সমাবেশ হইল। এঁদের অতি অল্প সংখ্যকই অভিজ্ঞ ছিলেন, বাকি সকলে স্বভাবতই নূতন ছিলেন। ইঁহাদের ট্রেনিং দেওয়ার উদ্দেশ্যে জার্নালিযম সম্পর্কে আমি এক আলমারি বই কিনাইয়া ফেলিলাম। তার মধ্যে পিটম্যানের প্রকাশিত ম্যানস ফিল্ডের কমপ্লিট জার্নালিযম এন্ড সাব এডিটিং; চার্লস রিগবির দি স্টাফ জার্নালিস্ট; মি. এস. কারের মডার্ন জার্নালিয়ম; টি. এ. বিডের রিপোর্টার্স গাইড উই লিকাম স্টিডের দি প্রেস ইত্যাদি পুস্তক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমি স্টাফের সহকর্মীদের ঐ সব বই-পুস্তক পড়িতে উৎসাহ দিতাম। ঠিকমত পড়িলেন কি না, তা পরখ করিতাম। ফলে দুই-তিন মাসের মধ্যে ইত্তেহাদ এর স্টাফের অধিকাংশ কর্মী শুধু হাতে-কলমে নয়, পুঁথিগত বিদ্যাতেও মোটামুটি ভাল সাংবাদিক হইয়া উঠিলেন। ফলে হেডলাইন, ডিসপ্লে, মেক আপ, গেট-আপ, টাইপ বিতরণ, প্রফ রিডিংয়ে অল্পদিনেই ইত্তেহাদ কলিকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর বাংলা দৈনিকে পরিণত হইল। মি. ওয়ালীউল্লাহ, মি. মোহাম্মদ মোদাব্বের, মি. জনাব আলী, মি. খোন্দকার ইলিয়াস, মি. কে. জি. মুস্তফা, মি. সিরাজুদ্দীন হোসেন, মি. রশীদ করীম প্রভৃতি বিখ্যাত সাংবাদিকরা সকলেই ইত্তেহাদ-এর বার্তা বিভাগের বিভিন্ন শাখার দায়িত্ব বহন করিয়াছেন। প্রথমে মিস হাযেরা খাতুন (পরবর্তীকালে মিসেস হাযেরা মাহমুদ) ও পরে মিস মরিয়ম খানম (পরে মিসেস হাশিমুদ্দীন) নামী দুইজন প্রতিভাবতী মহিলা গ্র্যাজুয়েট মহিলা শাখা সম্পাদন করায় মুসলিম মহিলাদের মধ্যে নবজীবনের সঞ্চার হইল। কবি আহসান হাবীব সাহিত্য শাখা, রুকনুযযামান খান ও মি. মোহাম্মদ নাসির আলী শিশু শাখা পরিচালনা করায় ঐ সব বিভাগ দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করিল। মি. কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস, মি. তালেবুর রহমান, মি. খোন্দকার আবদুল হামিদ, মি. যহুরুল হক, মি. কবি গোলাম কুদুস, মি. এ এম শাহাবুদ্দীন প্রভৃতি প্রতিভাবান লেখকগণের প্রথম তিনজন আগাগোড়া এবং শেষ তিনজন সাময়িকভাবে এ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর বা লিডার রাইটার ছিলেন। এতগুলি প্রতিভাশালী লেখকের লেখা হইলেও ইত্তেহাদ-এর সম্পাদকীয় প্রবন্ধগুলির মধ্যে সুরে-মতবাদে এমনকি ভাষায় একটা ঐক্য ছিল। তার কারণ এই যে আমি সকল এ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটরদেরে লইয়া সকালে আমার বাসায় কম-সে কম দুই ঘণ্টা বৈঠক করিতাম। চিফ এডিটরের বাড়িতে প্রতিদিন যাতায়াত করাটা যাতে এ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটরদের পক্ষে আর্থিক ক্ষতিকর না হয় সেই উদ্দেশ্যে আমি সকলের সম্মতিক্রমে আমার বাসায় উহাদের সকলের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করিয়াছিলাম। এই ব্যবস্থা আমার উপরও দুর্বহ আর্থিক বোঝা ছিল না সম্পাদকের টেবিল খরচা’ বাবত আমাকে মাসে যে একশ টাকা এলাউন্স দেওয়া হইত, সে টাকা হইতে কিছু টাকা বাঁচাইয়া এই দিককার খরচা পোষাইয়া লইতে অথবা পাতলা করিতে পারিতাম। এই বৈঠকের উপকারিতা অল্পদিনেই সকলের কাছে সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল এবং কিছুদিনের মধ্যেই কলিকাতায় বড়-বড় দৈনিকের অনেকেই তাদের সম্পাদকীয় বিভাগে এই ব্যবস্থার প্রবর্তন করিলেন। এই বৈঠকে চা সিগারেট খাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ঐদিনকার সম্পাদকীয় লেখার বিষয়বস্তু লইয়া। আলোচনা চলিত। ইত্তেহাদ-এ নিয়মিতভাবে দুইটা সম্পাদকীয় ও চার পাঁচটা মন্তব্য থাকিত। সম্পাদকীয় মন্তব্যগুলির হেডিং ছিল ‘একনজর। এগুলি আমি নিজে লিখিতাম। সম্পাদকীয়গুলি সকলে ভাগ করিয়া নিতাম। সপ্তাহের সাত দিনে চৌদ্দটা সম্পাদকীয় যাইত। চৌদ্দটা সম্পাদকীয় পাঁচজনের মধ্যে ভাগ করিলে গড়ে প্রতি সপ্তাহে এক-একজনের তিনটা করিয়া প্রবন্ধ লিখিতে হইত। এটা ছিল সাধারণ নিয়ম। বিষয়-বস্তু-ভেদে এ ব্যবস্থার ব্যতিক্রম হইত। বিষয়-বস্তুর বৈশিষ্ট্য না থাকিলে ব্যক্তিগত সুবিধার খাতিরে একজনেরটা অপরজনও গছিয়া নিতে পারিতেন। কিন্তু সেটা ছিল নিতান্তই ব্যতিক্রম। সাধারণত প্রাতঃকালীন বৈঠকে বিষয়-বস্তু ও তাদের বিভিন্ন পয়েন্টসমূহ ঠিক হইয়া যাইত। যার উপর লেখার ভার পড়িত, তিনি সে সব পয়েন্টস নোট করিয়া নিতেন। তারপর তাদের সুবিধামত হয় বাসায় অথবা আফিসে বসিয়া সম্পাদকীয় লিখিয়া আমার টেবিলে রাখিয়া দিতেন। আমি নিজে বাসায় বসিয়া ‘একনজর’ ও আমার ভাগে সম্পাদকীয় লেখার ভার পড়িয়া থাকিলে তা লেখা শেষ করিয়া সন্ধ্যার দিকে অথবা সান্ধ্য-ভ্রমণ শেষ করিয়া আটটার দিকে আফিসে যাইতাম। যার উপর যেদিন লেখার দায়িত্ব পড়িত না, সেদিন তিনি আফিসে যাইতে বাধ্য ছিলেন না। আর যাদের উপর লেখার ভার পড়িত, তারাও তাদের লেখা আমার টেবিলে রাখিয়া আফিস ত্যাগ করিতে পারিতেন। কিন্তু সাধারণত তারা আফিস ত্যাগ করিতেন না। আমি তাদের লেখা ‘পাশ করিয়া না দেওয়া পর্যন্ত তাঁরা আফিসে থাকিতেন। আমি তাদের লেখা ‘পাশ করিয়া প্রেসে দিবার জন্য তাদেরই টেবিলে ফেরত পাঠাইতাম। এতে তারা তাদের ভুল-ত্রুটি বা আমার সাথে তাঁদের মতভেদ ধরিতে পারিতেন। আমার ঐসব সহকর্মী এতে অতি অল্পদিনেই এমন পাকা হইয়া গেলেন যে, অতঃপর সকাল বেলার আলোচনাই যথেষ্ট হইত। তাঁদের লেখায় আমার কলম ধরিবার কোনও প্রয়োজনই হইত না। এঁদের অনেকে আমার মতবাদ প্রকাশ-ভঙ্গির ভাষা ও যুক্তি-তর্কের ধারা এমন রফত করিয়া ফেলিলেন যে, উচ্চ-শিক্ষিত সাহিত্যিক ও বৃদ্ধা পাঠকদেরও অনেকে তাদের লেখাকে আমার লেখা বলিয়া ভুল করিতেন। আমার হাজার প্রতিবাদেও তারা মত বদলাইতেন না। মনে করিতেন ও বলিতেন, আমার সহকর্মীদের ইজজত বাড়াইবার জন্যই আমি ঐ ভদ্রতা করিতেছি।
