.
৩. মুসলিম সাংবাদিকতার অসুবিধা
আমি যে যুগে সাংবাদিকতা করিয়াছি, তখন মুসলমানের পক্ষে সাংবাদিকতা করা খুব দুরূহ ব্যাপার ছিল। বিশেষত বাংলার মুসলমানের সামনে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতই সাংবাদিকতার ক্ষেত্রও অতি ক্ষুদ্র ছিল। সংবাদপত্র যতই ইন্ডাস্ট্রিতে রূপান্তরিত হইতে লাগিল, মুসলমানের পক্ষে উহা ততই কঠিন হইতে থাকিল। খুব স্বাভাবিক কারণেই মুসলমান যুবকদের হিন্দু সংবাদপত্রে কাজ পাওয়া একরূপ অসম্ভব ছিল। নিজস্ব দৈনিক কাগজ বাহির করার মত টাকাও মুসলমানের ছিল না। প্রধানত অর্থাভাবেই বহুকাল বহু মুসলিম নেতাদের এদিককার চেষ্টা ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। আমার আমলেই মওলানা মো. আকরম খাঁ সাহেবের দৈনিক সেবক ও দৈনিক মোহাম্মদী ও মওলানা ইসলামাবাদী সাহেবের দৈনিক ছোলতান, স্যার এ কে গযনবীর দৈনিক তরক্কী, মৌ. এ কে ফজলুল হক সাহেবের দুই পর্যায়ের নবযুগ, অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরের দৈনিক কৃষক প্রভৃতি বাংলা দৈনিক, স্যার আবদুর রহিমের মুসলিম স্ট্যান্ডার্ড মৌ. মুজিবর রহমান সাহেবের দৈনিক দি মুসলমান ও কমরেড প্রভৃতি ইংরাজি দৈনিক বাহির হইয়া বন্ধ হইয়াছে। এর ফলে একদিকে যেমন মুসলিম বাংলায় দৈনিক সংবাদপত্রের অভাব ছিল, ঠিক তেমনি সাংবাদিকেরও অভাব ছিল। আগেই বলিয়াছি, হিন্দু সংবাদপত্রে মুসলিম শিক্ষার্থীদের চান্স ছিল না। এটা আমি এত তীব্রভাবে অনুভব করিতাম যে যখনই সম্ভব ও সাধ্য হইয়াছে, তখনই ইহার প্রতিকার করিবার চেষ্টা করিয়াছি। বাছিয়া-বাছিয়া মুসলমান নিয়াছি। অধিকতর যোগ্য হিন্দু বাদ দিয়া অপেক্ষাকৃত অযোগ্য মুসলমানকে চাকুরি দিয়াছি। এতে হিন্দুর প্রতি আমার কোনও বিদ্বেষ ছিল না। শুধুমাত্র মুসলমান যুবকদের সাংবাদিকতায় উদ্বুদ্ধ করিবার জন্যই এ কাজ করিয়াছি। মুসলমানের প্রতি আমার এই পক্ষপাতিত্বের মধ্যে যে কোনও হিন্দু-বিদ্বেষ ছিল না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই যে ইত্তেহাদ-এর সম্পাদকতা লিখার পূর্ব পর্যন্ত আমি ঘোরতর জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসী ছিলাম। বাংলার হিন্দু ও মুসলিম মিলিয়া এক রাষ্ট্রীয় জাতি, এই মতে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলাম। তা ছাড়া আমার সম্পাদিত কৃষক ও নবযুগউভয়টাই ছিল বিঘোষিত নীতি ও মতবাদের দিক দিয়াও অসাম্প্ৰয়িক দৈনিক কাগজ। তবু ঐ দুটি কাগজের সম্পাদকীয় বিভাগে লোক নিয়োগ করিবার সময় আমি মুসলমান প্রার্থীকে প্রাধান্য দিয়াছি। ইহাতে আমার অনেক হিন্দু সাংবাদিক বন্ধু ও হিতৈষী আমার এই কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করিয়াছেন। আমি সরলভাবে তাঁদের কাছে আমার উদ্দেশ্য বর্ণনা করিয়াছি। অনেক দূরদর্শী হিন্দু বন্ধু আমার কথা বুঝিয়াছেন। এইভাবে আমি যখনই ক্ষমতা ও সুযোগ পাইয়াছি, তখনই মুসলিম যুবদিগকে সাংবাদিকতায় উদ্বুদ্ধ করিবার চেষ্টা করিয়াছি, পরকেও এই কাজের উপদেশ একরূপ গায় পড়িয়াই দিয়াছি। দৃষ্টান্তস্বরূপ দৈনিক আজাদ-এর কথাই বলিতেছি। আজাদ-এর পরিচালকগণ তার সৃষ্টি হইতে ঢাকায় আসার পূর্ব-পর্যন্ত বার বছরকাল আজাদ-এর কপালে ছাপাইতেন মুসলিমবঙ্গ ও আসামের একমাত্র দৈনিক। এটা সুরুচির পরিচায়ক ছিল না। সে জন্য আমার মত অনেক সাংবাদিকও এতে অসন্তোষ প্রকাশ করিতেন। কিন্তু তলাইয়া বিচার করিলে বুঝা যাইবে, আজাদ-এর এই দাবি অংশত সত্য। কারণ তকালের সমস্ত বাংলা দৈনিকের মধ্যে একমাত্র আজাই আর্থিক দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। মুসলমান। পরিচালিত অন্যান্য দৈনিক টিকিয়া থাকিবে কিনা সে বিষয়ে তৎকালে স্বয়ং সাংবাদিকদেরই সন্দেহ ছিল। আজাদসম্বন্ধে সে সন্দেহ ছিল না। এই হিসাবে আজাদকে তকালের মুসলিম বাংলা ও আসামের একমাত্র ‘দৈনিক’ বলা যাইতে পারে। এই ধারণা হইতেই শুধুমাত্র চাকুরির সিকিউরিটির দিক বিবেচনা করিয়া মুসলিম সাংবাদিকরা সাধারণত অন্যান্য দৈনিকের চাকুরির চেয়ে আজাদ-এর চাকরি বেশি আকর্ষণীয় মনে করিতেন। ঠিক এই কারণেই মুসলমান সাংবাদিকদের উপর আজাদ পরিচালকের দায়িত্ব ছিল বেশি। আমি কৃষকও নবযুগ এবং পরে ইত্তেহাদ-এ শুধুমাত্র মুসলিম সাংবাদিক নিয়োগ করিবার সময় আজাদ কর্তৃপক্ষকেও এই অনুরোধ করিতাম। কিন্তু আজাদ এর পরিচালকরা আমার উপদেশে কর্ণপাত করিতেন না। তারা স্পষ্টই বলিতেন, তাঁদের নীতি অল্প বেতনে যোগ্য লোক নিয়োগ করা। হিন্দু শিক্ষিত বেকারের সুতরাং যোগ্য সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল মুসলমানের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। ফলে স্বভাবতই অল্প বেতনে অনেক বেশি যোগ্য হিন্দু সাংবাদিক পাওয়া যাইত। আজাদ কর্তৃপক্ষ তাই করিতেন। ফলে তৎকালে আজাদ-এর স্টাফের শতকরা আশিজন ছিলেন হিন্দু। এটা আমাকে খুব পীড়া দিত। সরকারি চাকুরিতে মুসলিম অংশ দাবির উত্তরে যোগ্যতার যে জবাব হিন্দুরা দিতেন, আজাদ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করিলে তাঁরা। খোলাখুলিই বলিতেন, সরকারের মত আর্থিক বুনিয়াদ যেদিন আজাদ এর হইবে, সেইদিনই তারা মুসলমানের কথা ভাবিবেন। বর্তমান অবস্থায় আজাদ টিকাইয়া রাখাই তাদের দায়িত্ব; মুসলমানদের সাংবাদিকতা শিখানোর পাঠশালা খোলা তাঁদের দায়িত্ব নয়।
.
৪. সমাজ-প্রাণতা বনাম বাস্তববাদিতা
কথাটা হয়ত ঠিক। এটাই ছিল বাস্তববাদী বুদ্ধিমান বিষয়ী লোকের কাজ। কিন্তু আমার মন তত্ত্বালে উহা গ্রহণ করে নাই। উহাদিগকে আমি তখন অপরিণামদর্শী সমাজ-প্রাণহীন স্বার্থপর লোক মনে করিতাম। এই স্বার্থপরতা জনসাধারণের মধ্যে দেখিলে তা সহ্য করা যায়। কিন্তু মুসলিম স্বার্থের কথায় যাদের মুখে খই ফুটে, তাদের মধ্যে এই বিষয়-বুদ্ধি’ এমন বেমানান যে আমি এতে শুধু অসন্তুষ্ট হইতাম না; দস্তুরমত চটিয়া যাইতাম। স্বদেশি আন্দোলনের সময় যখন বাংলার অনেক যুবক দেশের জন্য প্রাণ দিতেছিল; নেতারা বিলাতী কাপড়ের বদলে দেশি কাপড় পরিবার আবেদনে গলা ফাটাইতে ছিলেন, অসহযোগ আন্দোলনের সময় নেতারাই যখন বিলাতী লবণ বয়কট করিয়া দেশি লবণ, করকচ লবণ খাইবার আবেদন। করিতেছিলেন; তখনও দেশের জনসাধারণকে সস্তায় মিহিন পাড়ের পাকা। রং-এর যুক্তিতে বিলাতী কাপড়, এবং স্বাদ ও চেহারার যুক্তিতে বিলাতী লবণ কিনিতে দেখিয়াছি। অজ্ঞ জনসাধারণ বুঝে না বলিয়া তাদেরে ক্ষমাও করিয়াছি। কিন্তু কলিকাতার মুসলিম লীগের নেতাদিগকে যখন ওয়াছেন মোল্লা, এল মল্লিকের দোকানের বদলে ইস্টবেঙ্গল সোসাইটি হইতে এবং আমার নিজের জিলার লীগ নেতাদিগকে যখন ‘মৌলবীর দোকানে’র বদলে। ‘বঙ্গলক্ষ্মী বস্ত্রালয়’ হইতে সওদা কিনিতে দেখিতাম সস্তার যুক্তিতে, তখন আমার মেজাজ ঠিক থাকিত না। আমি যখন ঘোরতর কংগ্রেসী ছিলাম এবং খদ্দর ছাড়া কিছু পরিতাম না। তখনও খদ্দর কিনিতে বাজারে গিয়া প্রথমে পরিচিত মুসলিম দোকানে খদ্দর তালাশ করিতাম; না পাইলে খদ্দরের স্টক রাখিবার উপদেশ দিয়া আসিতাম এবং দু-চার দিন অপেক্ষা করিতাম। আমার বেশ মনে পড়ে তৎকালে কংগ্রেস-বিরোধী হিন্দু-বিদ্বেষী বহু মুসলিম বন্ধু আমাকে হিন্দুর গোলাম বলিয়া গাল দিতে-দিতে সস্তা ও ভেরাইটির অজুহাতে হিন্দু দোকানে ঢুকিয়া পড়িতেন।
