ফলে নবযুগ-এ ফিরিয়া যাওয়ার আশা ও চেষ্টা ত্যাগ করিলাম। তাঁর বদলে মাথায় একটা দুষ্ট-বুদ্ধি গজাইল। মাত্র কয়েকদিন আগে বোম্বাই হাইকোর্টের একটা রুলিং খবরের কাগজে বাহির হইয়াছিল। তাতে বলা হইয়াছে নিয়োগ-পত্রে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত লেখা না থাকিলে সাংবাদিককে বরখাস্ত করিতে তিন মাসের নোটিস লাগিবে। আমি হক সাহেবকে সে কথা বলিলাম। তিনি খুশি হইয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিলেন। বলিলেন যে মি. দত্তের সঙ্গে আমার বনিবে না, তা তিনি জানিতেন। অথচ আমাকে ছাড়িতেও তাঁর মনে কষ্ট হইতেছিল। এখন আমি স্বেচ্ছায় সরিয়া যাইতে রাজি হওয়ায় তাঁর বুকের উপর হইতে একটা পাথর নামিয়া গেল। তিনি নিশ্চয় মি. দত্তকে দিয়া তিন মাসের বেতন দেওয়াইয়া দিবেন। বোধ হয় পরদিনই তিনি আমাকে জানাইলেন, মি. দত্ত টাকা দিতে রাজি হইয়াছেন। কিন্তু আমার দাবি-মত নয়শ টাকা নয়। কারণ আমার বেতন আড়াইশ। ওরই তিন মাস হইবে। এলাউন্সের পঞ্চাশ টাকা নোটিসের সঙ্গে আসিবে না। বুঝিলাম এটা লইয়া দরকষাকষি করিয়া সময় নষ্ট করা উচিৎ নয়। সাড়ে সাতশ টাকা লইয়া সকল দাবি-দাওয়া ত্যাগের রশিদ লিখিয়া দিলাম। এই ভাবে আমার সাংবাদিক জীবনের তৃতীয় পর্যায় শেষ হইল।
অধ্যায় বিশ – চতুর্থ পর্যায়
১. ‘ইত্তেহাদ’
আমার সাংবাদিক জীবনের চতুর্থ এবং শেষ পর্যায় শুরু হয় ১৯৪৭ সালের জানুয়ারিতে। বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জনাব শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমাকে সম্পাদক করিয়া একটি বাংলা দৈনিক বাহির করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। লিমিটেড কোম্পানি করিয়া আমার বিশেষ বিশ্বস্ত বন্ধু নবাবদা হাসান আলী চৌধুরীকে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ও আমার অনুজ প্রতিম বন্ধু মি. ফারুকুল ইসলামকে সহকারী ম্যানেজিং ডাইরেক্টর করিতে শহীদ সাহেব রাজি হওয়ায় আমি সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে সম্মত হইলাম। আমি তখন কলিকাতা আলীপুরে উকালতি করি। ব্যবসাও ভাল জমিয়াছে। কাজেই সমস্ত অবস্থা বিবেচনা করিয়া শহীদ সাহেব বেতনে-ভাতায় আমাকে মোট এক হাজার টাকা মাহিয়ানা দিলেন। বিরাট ধুমধামে ইত্তেহাদ বাহির হইল। আমার গোটা সাংবাদিক জীবনের মধ্যে এইটাই আমার সবচেয়ে সুখ, আরাম ও মর্যাদার মুদ্দত ছিল। বরাবরের মত পূর্ণ সাংবাদিক স্বাধীনতা ত এখানে ছিলই, তার উপর ছিল অর্থ-চিন্তার অভাব এবং নবাবযাদা ও ফারুকুল ইসলামের সুষ্ঠু পরিচালনা।
.
২. আমার চরম সাফল্য
ইত্তেহাদ অল্পদিনেই খুব জনপ্রিয় হইয়া উঠে। ইহার প্রচারসংখ্যা অনেক। পুরাতন দৈনিকের দুই-তিন গুণ হইয়া যায়। জনপ্রিয় রাজনৈতিক মতবাদের সমর্থন, সু-সম্পাদন, সুন্দর ছাপা, কাগজ, সাইয, নিয়মিত প্রকাশ ও বিতরণ ইত্যাদি যে সব কারণে দৈনিক কাগজ জনপ্রিয় হইয়া থাকে, সে সব গুণ ইত্তেহাদ-এর ছিল। তবু ঐ সব গুণেই ইত্তেহাদ-এর জনপ্রিয়তা শেষ কথা ছিল না। আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় ইত্তেহাদ-এর জনপ্রিয়তার গূঢ় তত্ত্ব অন্যত্র নিহিত ছিল। এক কথায়, সেটা সাংবাদিক চেতনা। প্রায় পঁচিশ বছর সাংবাদিকতার সহিত সংশ্লিষ্ট থাকিয়া এবং এ সম্পর্কে বিদেশি বই-পুস্তক ও সংবাদপত্র পড়িয়া সাংবাদিকের দায়িত্ব সম্পর্কে আমার সামান্য যা কিছু জ্ঞান। লাভ হইয়াছিল, তার সবটুকু ইত্তেহাদএ প্রয়োগ করিবার চেষ্টা আমি করিয়াছিলাম। পরিচালকগণ সে সুযোগও আমাকে দিয়াছিলেন। আমার ঐ অভিজ্ঞতার ফলে আমি বুঝিয়াছিলাম :
(১) সাংবাদিকতা নিছক সংবাদ সরবরাহ নয়, সংবাদের সুষ্ঠু ব্যাখ্যাও বটে।
(২) সাংবাদিকতার সাথে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজনীতিতে পার্টিগত শ্রেণীগত মতভেদ অপরিহার্য। কিন্তু এই মতভেদ সত্ত্বেও সাধু সাংবাদিকতা সম্ভব।
(৩) বিরুদ্ধ পক্ষকে অভদ্র কটুক্তি না করিয়াও তার তীব্র সমালোচনা করা যাইতে পারে ভদ্রভাষায়। বস্তুত সমালোচনার ভাষা যত বেশি ভদ্র হইবে, সমালোচনা তত তীক্ষ্ণ ও ফলবতী হইবে।
(৪) প্রত্যেক মতবাদের সুষ্ঠু, উদার, বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ আলোচনার দ্বারা নিজের মতের পক্ষে এবং বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে জনমত তৈয়ার করা অধিকতর সহজসাধ্য।
(৫) মরহুম মৌলবী মুজিবর রহমান বলিতেন : সংবাদপত্রের কেবলমাত্র সম্পাদকীয় কলমটাই সম্পাদকের; বাকি সবটুকুই পাবলিকের। চিঠিপত্র কলমটা টাউন হল, সম্পাদকের বৈঠকখানা নয়। অতএব সংবাদ প্রকাশে নিরপেক্ষতা চাই। স্বয়ং সম্পাদকের নিন্দা-পূর্ণ পত্রও চিঠিপত্র কলমে ছাপিতে হইবে।
(৬) সাংবাদিকতা সাহিত্য, আর্ট, সায়েন্স, ইন্ডাস্ট্রি ও কমার্সের সমবায়। এর একটার অভাব হইলে সাংবাদিকতা ত্রুটিপূর্ণ এবং পরিণামে নিষ্ফল হইবে।
(৭) বিখ্যাত সাহিত্যিক থেচারে বলিয়াছেন : ছাপার মেশিনের মত সংবাদপত্র নিজেও একটা ইঞ্জিন। সকল যন্ত্রপাতির ঐক্য ও সংহতি অন্যান্য ইঞ্জিনের মত প্রেস ইঞ্জিনেরও অত্যাবশ্যক বটে, কিন্তু তার উপরেও প্রেস ইঞ্জিনে দরকার ইনটেলেকচুয়াল ইউনিটি।
এই সাতটি দফা ছিল বলিতে গেলে আমার জন্য সাংবাদিকতার ক, খ। কিন্তু আমার এইটুকু জ্ঞান লাভ করিতে-করিতে সাংবাদিকতা ঘোড়-দৌড়ে অনেক আগাইয়া গিয়াছিল। আমি পঁচিশ বছর আগে যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন সাংবাদিকতা ছিল একটা মিশন। প্রাইভেট স্কুল, হাসপাতাল চালাইবার মত একটা ব্যাপার। আর ১৯৪৭ সালে সাংবাদিকতা হইয়া উঠিয়াছিল একটি পূর্ণমাত্রার ইন্ডাস্ট্রি। এই সম্প্রসারণের ফলে সংবাদপত্র আর সম্পাদকের মন্তব্যসহ খবরের কাগজ মাত্র ছিল না। সাহিত্য শাখা, মহিলা শাখা, শিশু শাখা, সিনেমা শাখা, নগর পরিক্রমা ও খেলাধুলা ইত্যাদি বিভিন্ন ফিচার দিয়া আজকাল দৈনিক খবরের কাগজকে রীতিমত আকর্ষণীয় পঠিতব্য সাহিত্য করিয়া তোলা হইয়াছে। এই সমস্ত বিভাগ মোটামুটি অটনোমাস। সকল বিভাগের পৃথক-পৃথক সম্পাদক আছেন। কাজেই দৈনিক সংবাদপত্রের আর এখন একজন মাত্র সম্পাদক নাই, বহু-সংখ্যক সম্পাদক হইয়াছেন। ফলে কাগজের সম্পাদককে এখন আর শুধু সম্পাদক বলা চলে না। প্রধান সম্পাদক, এডিটর-ইন-চিফ অথবা চিফ এডিটার বলা হইয়া থাকে। এর ফলে আধুনিক দৈনিক খবরের কাগজের সম্পাদক কম-বেশি কনস্টিটিউশন্যাল মনার্কের মতই ফিগার-হেড মাত্র। সকর্মক দায়িত্ব তার সম্পাদকীয় লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দৈনিক খবরের কাগজের বিষয়-বস্তুর এই পরিব্যাপ্তি আমাদের দেশে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হইতেই শুরু হয়। কাজেই আমি যখন ইত্তেহাদএর সম্পাদকতা গ্রহণ করি, তখন আমাকেও ইহাই করিতে হইয়াছিল। এই উদ্দেশ্যে আমাকে বেশ খুঁজিয়া-পাতিয়া অজ্ঞাত মুসলিম ট্যালেন্ট বাহির করিতে হইয়াছে। একটু পরেই সে কথা বলিতেছি।
