ব্যাপারটা নিতান্তই আকস্মিক। আমার জন্য বড়ই লজ্জাকর। লোকে কী মনে করিবে? আমার মত ছয়ফুট লম্বা একটা জওয়ান মানুষের কামরায় চৌকাঠে দত্ত সাহেবের মত বৃদ্ধ ও শীর্ণ মানুষ বিনা কারণে হুমড়ি খাইয়া নিশ্চয়ই পড়েন নাই। দত্ত সাহেবকে নিয়া যাওয়ার পর-পরই আমাদের স্টাফের প্রায় সকলে আমার কামরায় ভিড় করিয়া আমার কথা শুনিলেন এবং সকল কথা শুনিয়া আমাকে কংগ্রেচুলেট করিলেন। কিন্তু আমি নিজে খুব উৎসাহ পাইলাম না। এই ঘটনার পরে এখানে আমার চাকুরি নাই, এ কথাটা হয়ত আমার মনের তলে লুকাইয়া আমাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করিতে ছিল। কিন্তু আমার মনে যা পীড়া দিতেছিল তা ছিল আমার ব্যবহার। আমার ক্রমেই বেশি করিয়া মনে হইতে লাগিল, সব দোষ আমার, দত্ত সাহেবের কোনও দোষ নাই। মনটা খারাপ হইল। সকলকে বিদায় দিয়া লেখায় ডুবিবার চেষ্টা করিলাম।
পরদিনই হক সাহেব ডাকিয়া পাঠাইলেন। যা অনুমান করিয়াছিলাম তাই। দত্ত সাহেব আগেই হাজির। আমি গেলে হক সাহেব আমাদের দুইজনকে লইয়া তাঁর শোবার ঘরে গেলেন। কাউকে কিছু বলিতে না দিয়া তিনিই শুরু করিলেন। ওয়াদা-করা চাঁদা না দেওয়ার অপরাধে সমস্ত মন্ত্রীদের বিশুদ্ধ বরিশালী ভাষায় গাল দিয়া, আর্থিক দুরবস্থার বর্ণনা করিয়া তিনি। আমাকে বুঝাইলেন, তিনিই বাধ্য হইয়া অনিচ্ছুক দত্ত সাহেবকে এ ব্যাপারে টানিয়া আনিয়াছেন। দত্ত সাহেব রাজি না হইলে তিনি অগত্যা নবযুগবন্ধই করিয়া দিতেন। এমতাবস্থায় আমাকে ও দত্ত সাহেবকে এক যোগে মিলিয়া মিশিয়া কাজ করিতেই হইবে। গতকালের ব্যাপারটা উভয়কেই ভুলিয়া যাইতে হইবে। ওতে দত্ত সাহেবেরও দোষ আছে। দত্ত সাহেব অন্তত নান্না মিয়াকে সঙ্গে না লইয়া আফিসে যাইয়া কাজ ভাল করেন নাই। আমারও দোষ আছে। দত্ত সাহেবকে অপমান করিয়া বাহির করিয়া দেওয়া ঠিক হয় নাই। হক সাহেবই কথা শুরু করিয়াছিলেন। তিনিই শেষ করিলেন। আমাদের কোনও কথা বলিতে দিলেন না। নবযুগ চালাইতে হইলে আমাদের উভয়কে মিলিতে হইবে, এই কথার পুনরাবৃত্তি করিয়া আমাদিগকে মুসাফিহা করাইয়া বিদায় দিলেন।
.
১০. আগুনে ইন্ধন
আমরা ভুলিতে চেষ্টা করিলে কী হইবে? পাড়ার লোক আমাদের ভুলিতে দিল না। ভোটরঙ্গ ও অবতার নামে এই সময়ে কলিকাতায় খুব জনপ্রিয় দুইটি ব্যঙ্গ-সাপ্তাহিক ছিল। আমাদের ঘটনা লইয়া ওদের একটিতে হেমেন্দ্র বধ কাব্য ও আরেকটিতে হেমেন্দ্র-মনসুর সংবাদ নামে অমিত্রাক্ষর ছন্দে দুইটি কাব্য-নাটিকা প্রকাশিত হইল। তার ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া কলিকাতার রাস্তাঘাটে, ট্রামে-বাসে, স্কোয়ারে-ময়দানে, আমরা দুইজন আলোচনার বিষয় থাকিলাম। লেখা দুইটি ছিল মোটামুটি শক্তিশালী লেখকের হাতের। সুতরাং প্যারডি খুব উপভোগ্য হইয়াছিল। ভাষায় যথেষ্ট মুনশীয়ানা ছিল। এই মুনশীয়ানা করিতে গিয়া লেখককে স্বভাবতই কল্পনার আশ্রয় নিতে হইয়াছিল। তবু তাকে সত্য-অর্ধসত্য মিলিয়া মোটামুটি লেখা দুইটিতে সত্যের রূপ দিতে পারিয়াছিল। ওতে আমাকেও যথেষ্ট বিদ্রূপ করা হইয়াছিল। কিন্তু সাহিত্যিক রণযোদ্ধা হিসাবে আমি সে সব বিদ্রুপের কশাঘাতকে শিল্প হিসাবে গ্রহণ করিলাম। কিন্তু রস-কষহীন নিরেট ব্যবসায়ী ভাল মানুষ দত্ত সাহেব ঐ স্যাটায়ারের রস গ্রহণ করিতে স্বভাবতই অসমর্থ হইলেন। বরঞ্চ তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিলেন, ও-দুইটা ব্যঙ্গ-রচনা আমার সাহায্যে লেখা হইয়াছে। প্রমাণস্বরূপ তিনি দেখাইলেন যে, রচনা দুইটিতে আমাকে নরম হাতে এবং দত্ত সাহেবকে নির্দয়ভাবে আক্রমণ করা হইয়াছে। ফলে আমরা উভয়কে যথাসম্ভব এড়াইয়া চলিতে লাগিলাম। দত্ত সাহেব এর পরে দুপুরের দিকেই নবযুগ”এ আসিতেন। বিকাল বা সন্ধ্যায় কখনও আসিতেন না।
এই সময়ে আমি কঠিন আমাশয়ে আক্রান্ত হই। ডাক্তার স্থান পরিবর্তনের উপদেশ দেওয়ায় আমি হক সাহেবের নিকট হইতে এক মাসের ছুটি নিয়া সপরিবারে গ্রামের বাড়িতে চলিয়া যাই। বার্তা সম্পাদক কবি বেনীর আহমদকে মাসখানেক কোনও মতে চালাইয়া যাইবার ভার দিয়া যাই।
.
১১. ‘নবযুগে’ চাকুরি খতম
ছুটির পনের দিন যাইতে না যাইতেই নজরুল ইসলাম সাহেবের এক টেলিগ্রাম পাইলাম : আপনার সার্ভিসের আর দরকার নাই।’ অর্থাৎ আমার চাকুরি খতম। এমনটি একদিন ঘটিবেই, তা জানিতাম। কিন্তু কাজী সাহেব আমাকে টেলিগ্রাম করেন কেন? হয় হক সাহেব নয় ত মি. দত্তই আমার চাকুরি খতম করিবেন। কাজী সাহেব কেন? আমার সন্দেহ হইল। আমি আগেই জানিতাম, অন্যতম মন্ত্রী এবং কাগজে-পত্রে নবযুগ–এর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর খান বাহাদুর হাশেম আলী ঐদিন ময়মনসিংহ শহরে আছেন। আমি তার সাথে দেখা করিলাম। তিনি ব্যাপার শুনিয়া আকাশ হইতে পড়িলেন। এটা কিছুতেই বরদাশত করা হইবে না বলিয়া তিনি অবিলম্বে কলিকাতা যাইতে আমাকে পরামর্শ দিলেন। তিনি নির্দিষ্ট ট্যুর প্রোগ্রাম শেষ করিয়াই দু-চার দিনের মধ্যেই কলিকাতা ফিরিবেন বলিলেন।
মন বলিল কোনও লাভ হইবে না। তবু কলিকাতা গেলাম। কারণ দেনা-পাওনা মিটাইয়া এবং জিনিস-পত্র গোছাইয়া আসিতে একবার কলিকাতা ত যাইতেই হইবে। সে জন্য বাড়িতে কাউকে কিছু না বলিয়া শহরে দু-এক বন্ধুকে আমার জন্য একটি বাড়ি ঠিক করিতে অনুরোধ করিয়া কলিকাতা গেলাম। হক সাহেবের সাথে দেখা করিয়া টেলিগ্রামটা দেখাইলাম। তিনি শুধু বিস্ময় প্রকাশ করিলেন না : ‘কোন বদমায়েশ এই বদমায়েশি করিল’ বলিয়া দু-চারটা হুঙ্কারও দিলেন। কিন্তু নান্না মিয়া, মি. সৈয়দ বদরুদ্দোজা, নূরুল হুদা ও বেনযীর আহমদের নিকট আসল কথা জানিতে পারিলাম। তারা যা বলিলেন তার সারমর্ম এই : আমি ছুটিতে যাওয়ার পর হইতেই মি. দত্ত হিন্দু মন্ত্রীদিগকে দিয়া আমাকে সরাইবার জন্য হক সাহেবের উপর চাপ দেওয়া শুরু করেন। হক সাহেব শেষ পর্যন্ত রাজি হন। কিন্তু নিজে ডিসমিস করিতে রাজি হন না। দত্ত সাহেব নিজেও ডিসমিসের পত্র দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। কাজেই অনেক বুদ্ধি-পরামর্শ করিয়া তিনি কাজী সাহেবকে ধরেন। কাজী সাহেবের সঙ্গে মি. দত্ত একা অনেক আলাপ করিতেন। সে আলাপে নূরুল হুদা ও বেনযীর আহমদকে কাজী সাহেবের কাছে থাকিতে দেওয়া হয় নাই। তবে তারা শুনিয়াছেন কাজী সাহেবের সমস্ত দেনা শোধ করিবার ওয়াদা করিয়া মি. দত্ত কাজী সাহেবকে চিঠির বদলে টেলিগ্রাম করিতে রাজি করিয়াছেন। কাজী সাহেবের এই কাজের নিন্দা সকলেই করিলেন। আমিও মনে আঘাত পাইলাম। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে কাজী সাহেবের তল্কালীন মানসিক অবস্থার কথা মনে পড়ায় তাঁর প্রতি নরম হইয়া গেলাম।
