.
৮. মি. দত্তের আবির্ভাব
ইহার কিছুদিন পরে মি. হেমেন্দ্র নাথ দত্ত আমার রুমে প্রবেশ করিয়া হাসিমুখে বলিলেন : নমস্কার মনসুর সাব, কৃষক-এ আমাদের ছাড়াছাড়ি হইয়াছিল। ভগবানের ইচ্ছায় নবযুগ্এ আবার একত্র হইলাম।
বিনা-খবরে মি. দত্ত আমার ঘরে প্রবেশ করায় আমি বিস্মিত হইলাম না। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে বন্ধুবর অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরের মুখে। শুনিয়াছিলাম, মি. দত্ত একটা বড় রকমের চাউলের কন্ট্রাক্ট পাইতেছেন। এবং হক সাহেব ঐ কন্ট্রাক্টের বদলা নবযুগ তহবিলে চাঁদা দাবি করিতেছেন। মি. দত্ত এককালীন চাঁদা না দিয়া নবযুগ-এর পরিচালন-ভার নিতে রাজি আছেন বলিয়া কিছু-কিছু কানাঘুষা শুনিতেছিলাম। কাজেই বিন্দুমাত্র-বিস্ময়ের ভাব না দেখাইয়া আমি প্রতি-নমস্কার দিলাম এবং হাত ইশারায় সামনের একটা চেয়ার দেখাইয়া মি. দত্তকে বসিতে বলিলাম। সাধ্যমত আত্মসম্বরণ করিয়া হাসি মুখের জবাবে হাসিমুখেই বলিলাম: কী রকম?
জবাবে মি. দত্ত যা বলিলেন তার সারমর্ম এই যে, হক সাহেব তাকে নবযুগ পরিচালনের ভার দিয়াছেন। তিনি সাধ্যমত নবযুগএর উন্নতির চেষ্টা করিবেন। টাকা-পয়সার জন্য আমাকে আর কোনও চিন্তা করিতে হইবে না। নবযুগকে বাংলার শ্রেষ্ঠ দৈনিক করিতে আমার যত-কিছু স্কিম আছে, এখন হইতে তার সবগুলি আমি প্রয়োগ করিতে পারি।
মি. দত্ত প্রফুল্ল বদনে পরম উৎসাহের সঙ্গেই তাঁর কথাগুলি বলিয়াছিলেন। হয়ত আশা করিয়াছিলেন, আমিও উৎসাহ প্রকাশ করিব। কিন্তু আমি বিন্দুমাত্র উৎসাহ দেখাইলাম না। এক বছর আগে কৃষক উপলক্ষ করিয়া যে সব ঘটনা ঘটিয়াছিল, তার সবগুলি আমার স্মৃতিপথে উদিত হইল। আমি বোধহয় তৎক্ষণাৎ ঠিক করিয়া ফেলিয়াছিলাম নবযুগ-এ কাজ করা আর আমার পক্ষে সম্ভব হইবে না। তাই আমি কৃত্রিম ভদ্রতা দেখাইয়া নিতান্ত জোর-করা হাসি মুখে বলিলাম : এ খোশ-খবরটা আপনি নিজে বহন না করিয়া যদি হক সাহেবের মারফত পাঠাইতেন, তবে ব্যাপারটা সুন্দর হইত।
মি. দত্ত আমার নিকট হইতে এমন রূঢ় কথা শুনিবার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিনা জানি না। কিন্তু তিনি অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী লোক। আমার কথার মধ্যেকার অপমানটা গায় না মাখিয়া মুখের হাসি বজায় রাখিয়া বলিলেন : ‘ও-সব টেকনিক্যাল ফরমালিটি যথাসময়ে হইয়া যাইবে। তার জন্য আমাদের বসিয়া থাকা উচিৎ নয়। আমাদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব ও অন্তরের সম্বন্ধ তাতে টেকনিক্যাল কথার স্থান নাই।’ নবযুগকে উন্নত করার কাজে তার ও আমার পূর্ণ সহযোগিতা দরকার, এই জন্যই তিনি ফর্মালিটির অপেক্ষায় বসিয়া না। থাকিয়া প্রথম সুযোগেই আমার সহিত দেখা করিতে আসিয়াছেন। এ ব্যাপারে আমার সমস্ত দ্বিধা-সন্দেহের অবসান ঘটাইবার জন্যই বোধহয় তিনি কবে, কী শর্তে নবযুগ-এর ভার নিয়াছেন, কার-কার সামনে কথা হইয়াছে, কে-কী বলিয়াছেন, সব কথা বলিয়া ফেলিলেন।
আমি বোধহয় মাত্রাতিরিক্ত চটিয়া গিয়াছিলাম। তাঁর কথা মনোযোগ দিয়া শুনিবার আগ্রহ আমার ছিল না। তবু শুধু ভদ্রতার খাতিরে বাধা দিলাম না। তার কথা শেষ হইলে বলিলাম : ‘এ সব কথা আমাকে বলিয়া লাভও নাই, দরকারও নাই। হক সাহেবের মারফতই এসব কথা জানাইবেন। হক সাহেব আপনাকে নবযুগ-এর পরিচালক বানাইয়াছেন, তিনি নিজেই আমাকে একথা জানাইবেন। তার পর আপনার পরিচালনায় নবযুগ্এ আমি চাকরি করিব কিনা, সে কথাও আমি হক সাহেবকেই জানাইব। আপনি মেহেরবানি করিয়া এখন যান। আমার কাজ আছে।
বলিয়া একটা প্যাড টানিয়া লেখা শুরু করিবার উদ্যোগ করিলাম, যদিও তখনি লেখার তাড়া ছিল না।
.
৯. লজ্জাকর দুর্ঘটনা
মি. দত্ত স্বভাবতই অপমান বোধ করিলেন। তিনি ধৈর্য হারাইলেন। এতক্ষণের ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের পোশাক তাঁর একদম খসিয়া পড়িল। তিনি গলায় অতিরিক্ত জোর দিয়া বলিলেন : ‘আমাকে এভাবে এখান হইতে যাইতে বলার কোনও অধিকার আপনার নাই। আপনি জানেন, আজ হইতে এ। আফিসের মালিক আমি। আমি বাহির হইয়া যাইব না। যদি আমাদের দুইজনের কারো বাহির হইয়া যাইতে হয়, তবে সে ব্যক্তি আমি নই, আপনি।’
আমি বিদ্রুপের হাসি হাসিয়া বলিলাম: ‘আপনি এ আফিসের কর্তা হইলে আমি এখানে থাকিব না। তা আমি মানি। কিন্তু ঠিক এ মুহূর্তে আমিই এখানে কর্তা। সুতরাং আপনিই দয়া করিয়া বাহির হইয়া যান।’
মি. দত্ত চেয়ার ছাড়িতেছেন না দেখিয়া আমিই চেয়ার ছাড়িয়া দাঁড়াইলাম। মি. দত্ত আমার এই দাঁড়ানোর খুব খারাপ অর্থ করিলেন। আমাকে উঠিতে দেখিয়াই তিনি চট করিয়া চেয়ার ছাড়িয়া উঠিলেন এবং বলিলেন : আমাকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইয়াছেন? এ অপমানের আমি বিচার করাইব। অবশ্যই করাইব।
মি. দত্তের গলা ও সর্বাঙ্গ কপিতেছিল। তিনি অতি ব্যস্ততার সহিত দরজার দিকে ছুটিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত হুমড়ি খাইয়া চৌকাঠের উপর পড়িয়া গেলেন এবং মূৰ্ছা গেলেন। আমার রুমের সামনেই প্রকাণ্ড হলঘর। এই হলঘরটাই। আমাদের আফিস ঘর। ম্যানেজার, একাউন্টেন্ট ও তাদের গোটা স্টাফই এই হলে বসেন। আফিস পাঁচটায় ছুটি হইয়া গেলেও ম্যানেজার ও একাউন্টেন্ট দুই একজন সহকারী লইয়া কাজ করিতেছেন। মি. দত্ত তার এক ছেলেকে সঙ্গে লইয়া আসিয়াছিলেন। তিনি পিতাকে আমার রুমে ঢুকাইয়া ম্যানেজারের সাথে বসিয়া গল্প করিতেছিলেন। দত্ত সাহেবকে পড়িয়া যাইতে দেখিয়া এঁরা সকলেই ছুটিয়া আসিলেন। চোখে-মুখে পানি ছিটাইয়া যথাসম্ভব প্রাথমিক তদবিরাদি করিয়া তাঁকে ধরাধরি করিয়া গাড়িতে তোলা হইল। দত্ত সাহেবের নিজের মোটর রাস্তায় দাঁড়ান ছিল। সেই গাড়িতেই তাঁকে হাসপাতালে পাঠান হইল। পরে টেলিফোনে জানিতে পারিলাম, পথেই তার সংজ্ঞা ফিরিয়া আসায় হাসপাতালে নেওয়ার দরকার হয় নাই। তিনি এখন ভাল আছেন।
