.
৬. নজরুলের আধ্যাত্মিকতা
তিনি দরজা বন্ধ করিয়া গোপনে আমার সাথে অনেক আধ্যাত্মিক আলোচনা করিতেন। আলোচনা করিতেন মানে তিনি বলিয়া যাইতেন, আমি শুনিয়া যাইতাম। এ সব কথার মধ্যে দুর্বোধ্যতা, এমনকি অনেক সময় কাণ্ডজ্ঞানহীনতা থাকিলেও তাতে পাগলামি ছিল না। বরঞ্চ অনেক কথা আমার ভাল লাগিত। এমন ধরনের একটি কথা এখানে উল্লেখ করার লোভ সম্বরণ করিতে পারিলাম না। একদিন তিনি আফিসে আসিয়া নিজের আসনে বসিলেন। মিনিট খানেক কী ভাবিলেন। পরে নিজের আসন ছাড়িয়া আমার টেবিলের সামনের ভিজিটার্স সিটে বসিলেন। তারপর আমার দিকে গলা বাড়াইয়া গোপন কথা বলিবার ভঙ্গিতে বলিলেন, তার সারমর্ম এই : তিনি এবং তাঁর স্ত্রীর মধ্যে একটা দুর্ভেদ্য চীনা দেওয়াল উঠিয়াছে। তারা উভয়ে উভয়ের সহিত মিলিত হইবার জন্য আঁকুপাঁকু করিতেছেন। তারা উভয়েই পরস্পরের প্রেমের রজু টানিয়া একজন আরেকজনকে নিজের কাছে নিতে চাহিতেছেন। উভয়ের মধ্যে এই টাগ-অব-ওয়ার চলিতেছে দীর্ঘদিন ধরিয়া। কিন্তু এ চেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছে। কারণ এটা অবৈজ্ঞানিক। কীরূপে, তা বুঝাইবার জন্য তিনি আমার টেবিলের উপর হইতে একটা বড় ডিকশনারি লইয়া তা উপুড় করিয়া টেবিলের উপর বসাইলেন। কলমদানের উপর হইতে এক টুকরা মোটা সুতা লইয়া তার দুই মাথায় দুইটা পেপার-ওয়েট সুকৌশলে বাঁধিলেন। এবং খাড়া করা বইটার উপর তা ঝুলাইয়া দিলেন। তারপর তিনি বলিলেন : লক্ষ্য করুন, দুইটা পেপার-ওয়েট সমান ওজনের। তাই একটার ভারে অপরটা উঠিয়া আসিতেছে না। উভয়ের ওজন সমান না হইয়া যদি একটা অপরটার দশ গুণ ভারী হইত, তবে ভারীটার টানে পাতলাটা উঠিয়া আসিত। কারণ গত কয়েক বছর ধরিয়া আমি নিজের ওজন স্ত্রীর ওজনের দশ গুণ বাড়াইবার চেষ্টা করিয়াছি। অনেক বাড়াইয়াছি। কিন্তু যথেষ্ট বাড়াইতে পারি নাই। তাই আমি ওজন বাড়াইবার চেষ্টা ত্যাগ করিয়া দেওয়ালের চূড়ায় উঠিয়া সেখান হইতে তাকে টানিয়া তুলিবার চেষ্টা করিতেছি। সেটা কেন দরকার এবং কেমন করিয়া সম্ভব, তাই এখন বুঝাইতেছি।
এইখানে আমাকে তিনি প্র্যাকটিক্যাল ডিমনস্ট্রেশন করিয়া দেখাইয়া দিলেন যে নিচে হইতে টানিয়া অপর পারের পেপার-ওয়েটটা এ পাশে আনা যত কষ্টসাধ্য, বইটার উপর হইতে টানিয়া তোলা তেমন কঠিন নয়, অনেক সহজ। এটা যখন আমি অতি সহজেই স্বীকার করিলাম, তখন তিনি আমাকে বলিলেন : “অতএব আমি স্থির করিলাম আমি এই চীনা দেওয়ালের উপর উঠিব। সেখান হইতেই স্ত্রীকে টানিয়া তুলিব। গত এক বছর এই চেষ্টা করিয়াও পারি নাই। এখন আমাকে অগত্যা দেওয়ালের অপর পারে নামিয়া পড়িতে হইবে। উপর হইতে রশি ধরিয়া টানিয়া তোলার চেয়ে ওপারে মিয়া ওকে কাঁধে তুলিয়া নিয়া আসা অনেক সহজ হইবে।’ আমি ব্যাপারটা বুঝিবার জন্যই জেরা করিলাম। তিনি শেষ পর্যন্ত বলিলেন : ‘আপনি ঠিকই বুঝিয়াছেন আমাকেও আমার স্ত্রীর রোগে পীড়িত হইতে হইবে।’
.
৭. নজরুলের রোগ লক্ষণ
কাজী সাহেবের স্ত্রী বহুদিন ধরিয়া দুরারোগ্য পক্ষাঘাত রোগে ভুগিতেছেন। তার রোগের রোগী হওয়া মানে কাজী সাহেবেরও পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া। কথাটা মনে হইতেই গা কাঁটা দিয়া উঠিল। এই অশুভ চিন্তার জন্য মনে-মনে তওবা করিলাম। কাজী সাহেব আমার বিচলিত ভাব দেখিয়া সান্ত্বনা দিলেন : ‘চিন্তার কোনও কারণ নাই। ব্যাপারটাকে যত সাংঘাতিক মনে করিতেছেন, তত সাংঘাতিক এটা নয়। আমি আমার স্ত্রীর মত অসুস্থ হইয়া আবার ভাল হইব এবং তখন স্ত্রীও আমার সাথে-সাথে আরোগ্য লাভ করিবে। আধ্যাত্মিক সাধনার বলে এমন ইচ্ছাধীন রোগাক্রান্তি এবং রোগমুক্তি সম্ভব এটা বৈজ্ঞানিক কথা। এটাকে বলে সাইকো-থিরাপি। আমার মন মানিল না, কারণ আমি ও-সম্বন্ধে কোনও বই-পুস্তক পড়ি নাই। কেমন যেন অশুভ অশুভ মনে হইতে লাগিল। যিনি শুনিলেন তিনিই এটাকে মস্তিষ্ক বিকারের লক্ষণ বলিলেন।
এরপর কাজী সাহেব আফিসে আসা একদম বন্ধ করিয়া দিলেন। শুধু বেতন নিবার নির্ধারিত তারিখে রশিদ সই করিয়া টাকা নিতে আসিতেন। তাও খবর দিয়া আনিতে হইত। কয়েক মাস পরে তা-ও বন্ধ করিলেন। লোক পাঠাইয়া বেতনের টাকা নিতে লাগিলেন। নজরুল ইসলাম সাহেবই ছিলেন নবযুগ আফিসে ছাত্র-তরুণদের বড় আকর্ষণ। তিনি আর আফিসে আসেন না কথাটা জানাজানি হইয়া যাওয়ায় আস্তে-আস্তে তাদেরও যাতায়াত কমিয়া গেল।
ইতিমধ্যে হক সাহেব একদিন কথা প্রসঙ্গে নবযুগ-এর আর্থিক দুরবস্থার কথা আমাকে জানাইলেন। তিনি বলিলেন : মন্ত্রী হওয়ার আগে সকলেই তাঁদের বেতনের মোটা অংশ পত্রিকা ফান্ডে দিবার ওয়াদা করিয়াছিলেন। কিন্তু কোনও মন্ত্রীই তার ওয়াদা পূরণ করেন নাই।’ কিছুদিন ধরিয়া আমিও এই আশঙ্কাই করিতেছিলাম। কারণ পরিচালকদের অর্থাভাবের হাওয়া বেতন-ভোগীদের গায়েই সবার আগে লাগিয়া থাকে। আমার চোখে-মুখে বোধহয় দুশ্চিন্তা ফুটিয়া উঠিয়াছিল। হক সাহেব আমাকে আশ্বাস দিলেন, বিপদটা খুব আসন্ন নয়। আমি হক সাহেবের। আশ্বাসে খুব ভরসা পাইলাম না বটে, কিন্তু খুব চিন্তাযুক্তও হইলাম না। কারণ আমার কাছে এটা খুব অচিন্তিত-আকস্মিক ব্যাপার ছিল না। এমন কিছু একটা ঘটিবে, আগে হইতেই তা আমি জানিতাম। তবে অত তাড়াতাড়ি হইবে তা জানিতাম না। তাছাড়া চাকরি পাওয়া-যাওয়া, সাধারণ আর্থিক দুরবস্থা ও বিপদ-আপদের সাথে এই কুড়ি-বাইশ বছরেই এত বেশি পরিচিত হইয়া গিয়াছি যে অদূর-ভবিষ্যতে বিপদের। সম্ভাবনাতেও চঞ্চল হইয়া উঠিলাম না।
