কাজেই অন্তত নবযুগ-এর জন্যও হক সাহেবের এই নয়া রাজনীতিকে সফল করিতেই হইবে, এই প্রয়োজনের বিচারেই আমি সম্পাদকীয় লিখিয়া চলিলাম। তারই একটাতে বলিলাম: এই মুহূর্তে হক সাহেবের পশ্চিম বাংলা ও ডা. শ্যামাপ্রসাদের পূর্ব বাংলা সফরে বাহির হওয়া উচিৎ। এই সম্পাদকীয়ের সমর্থনে আমি হক সাহেব ও ডা. শ্যামাপ্রসাদকে মৌখিক পরামর্শ দিলাম এবং আমার নিজ জিলায় ডা. শ্যামাপ্রসাদকে নিমন্ত্রণ জানাইলাম। তাকে আমি ভরসা দিলাম, আমি নিজে গিয়া সভার আয়োজন করিব এবং লক্ষ লোকের সমাবেশ করাইব। ঐ সভায় ডা. শ্যামাপ্রসাদ যদি মুসলিম স্বার্থ রক্ষার ওয়াদা করিয়া আসেন, তবে প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশনের গতি ও জয় দুর্বার হইয়া উঠিবে। আমার এই প্রস্তাবে হক সাহেব ও ডা. শ্যামাপ্রসাদ উভয়েই রাজি হইলেন। মি. সন্তোষ কুমার বসু, অধ্যাপক প্রমথ ব্যানার্জী প্রভৃতি অন্য মন্ত্রীরাও পরম উৎসাহেই আমার প্রস্তাব সমর্থন করিলেন।
কিন্তু কার্যত তা হইল না। বরঞ্চ হক সাহেব পূর্ব বাংলা এবং শ্যামাপ্রসাদ পশ্চিম-বাংলা সফরে বাহির হইলেন। বোধ হয় তারা আগে যার যার ঘর সামলানোকেই অধিকতর আসন্ন জরুরি কাজ মনে করিলেন। আমি বুঝিলাম, এই ভুলের দরুনই কোয়ালিশনের সাফল্যের সম্ভাবনা দূর হইল। যদি শেষ পর্যন্ত এই চেষ্টা ব্যর্থই হয়, তবু এ ব্যর্থতায়ও যাতে হক সাহেবের চূড়ান্ত রাজনৈতিক মৃত্যু না ঘটে, সেদিকে নজর রাখিয়া আমি কলম চালাইলাম। প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন না বাচুক, হক সাহেবকে বাঁচাইতে হইবে।
.
৪. আমার ব্যক্তিগত সংকট
এই ধরনের লেখা স্বভাবতই হিন্দু মন্ত্রীদের পছন্দ হইল না। যতদূর মনে পড়ে এই সময়ে বিভিন্ন বিভাগের চাকুরির ব্যাপারে বিশেষত এ. আর. পি. বিভাগের চাকুরিতে মুসলমানদের দাবি-দাওয়া পদদলিত হইতেছে বলিয়া মুসলমানদের মধ্যে যে অসন্তোষ দেখা যাইতেছিল, হক সাহেব এবং তার মন্ত্রিসভার কারো কারো সাথে পরামর্শ করিয়াই আমি এ ব্যাপারেও ভারত সরকারের সমালোচনা করিতে লাগিলাম। এতে হিন্দু মন্ত্রীরা আমার উপর চটিলেন। কেউ-কেউ আমার সাথে তর্ক করিলেন। আমি নানা যুক্তি-তর্ক দিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম, প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশনের জনপ্রিয়তা রক্ষার খাতিরেই আমি ঐ সব লেখা লিখিতেছি।
হক সাহেব পরে আমাকে জানাইলেন, তাঁর হিন্দু মন্ত্রীরা আমার যুক্তিতে মোটেই কনভিন্সড হন নাই। তারা আমার উপর খুবই অসন্তুষ্ট। কেউ-কেউ আমাকে সরাইবার কথা বলিতেছেন। সঙ্গে সঙ্গে হক সাহেব অবশ্য আমাকে আশ্বাস দিলেন, আমার চিন্তার কোনও কারণ নাই। আমি যেভাবে সম্পাদকীয় লিখিতেছি, তাতে তাঁর নিজের এবং মুসলমান মন্ত্রীদের পূর্ণ সমর্থন আছে। অন্যতম মন্ত্রী খান বাহাদুর হাশেম আলী ও বন্ধুবর শামসুদ্দীন আহমদও আমার নীতিতে পূর্ণ সমর্থন জানাইলেন। উভয়েই আমাকে নিশ্চিন্ত থাকিতে বলিলেন।
আমি নিশ্চিন্ত হইবার চেষ্টা করিলাম। নিশ্চিন্ত হওয়া আমার দরকারও ছিল। কারণ ইতিমধ্যে এই সনের আগস্ট মাসেই আমার চতুর্থ পুত্র মনজুর আনামের জন্ম হইয়াছে। আমার সংসার-খরচা বাড়িয়াছে।
.
৫. নজরুলের ধর্মে মতি
ইতিমধ্যে নজরুল ইসলাম সাহেবের মধ্যে একটু-একটু মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা দিল। আগেই শুনিয়াছিলাম, তিনি বরদাবাবু নামক জনৈক হিন্দু যোগীর নিকট তান্ত্রিক যোগ সাধনা শুরু করিয়াছেন। জিজ্ঞাসা করিলে কাজী সাহেব মিষ্ট হাসি হাসিতেন। কিন্তু তাঁর স্বাভাবিক প্রাণচঞ্চল ছাদ-ফাটানো হাসি তিনি আর হাসিতেন না। তার বদলে উঁচু স্তরের এমন সব আধ্যাত্মিক কথা বলিতেন, যা সংবাদপত্র আফিসে মোটেই মানায় না। একদিন আফিসে। আসিয়া তিনি আমাকে বলিলেন : একটা জায়নামাজ ও অযুর জন্য একটা বদনা কিনাইয়া দিন। তাই করা হইল। আফিসে দুতালার পিছন দিকে একটি ছোট কামরাকে নামাজের ঘর করা হইল। কাজী সাহেব সপ্তাহে দু চার দিন যা আসিতেন এবং দুই-তিন ঘণ্টা যা থাকিতেন তার সবটুকুই তিনি অযু ও নামাজে কাটাইতেন। অযু করিতে লাগিত কমছে-কম আধ ঘণ্টা। আর নামাজে ঘণ্টা দুই। এ নামাজের কোনও ওয়াকত-বেওয়াকত ছিল না। কেরাত-রুকু-সেজদা ছিল না। জায়নামাজে বসিয়া হাত উঠাইয়া মোনাজাত করিতেন এবং তার পরেই মাটিতে মাথা লাগাইতেন, সিজদার মত কোমর উঁচা করিয়া নয়, কোমর উরুর সাথে ও পেট জমির সাথে মিশাইয়া। এইভাবে ঘণ্টার-পর ঘণ্টা এক সিজদায় কাটাইয়া দিতেন। আমি যতদূর দেখিয়াছি, তাতে তিনি সিজদা শেষ করিয়া একবারই মাথা উঠাইতেন।
আমাদের দুশ্চিন্তার মধ্যেও এইটুকু সান্ত্বনা ছিল যে অন্তত তান্ত্রিক সাধনা ছাড়িয়া তিনি মুসলমানি এবাদত ধরিয়াছেন। এইভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর তিনি একদিন আমাকে বলিলেন : তাঁকে সেই দিনই পাঁচ শত নামাজশিক্ষা কিনিয়া দিতে হইবে। কারণ তাঁর পাঁচ শত হিন্দু মহিলা শিষ্য হইয়াছেন; তাঁদের সকলকে কাজী সাহেব নামাজ শিখাইবেন। তখন শেখ আবদুর রহিম সাহেবের নামাজ শিক্ষা’র দাম পাঁচ আনা। পাঁচশ কপি কিনিতে লাগে প্রায় দেড়শ টাকা। ম্যানেজার, একাউন্টেন্ট ও ক্যাশিয়ার গোপনে আমার সাথে। পরামর্শ করিলেন। সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক হইল, দশটা টাকা দিয়া একজনকে বাজারে পাঠাইয়া দেওয়া হউক। দশ টাকায় যা পাওয়া যায় আনিয়া বলা হউক, মার্কেটে আর কপি নাই। তাই করা হইল। ত্রিশ কপি নামাজ শিক্ষা আনিয়া কাজী সাহেবকে দেওয়া হইল। ঐ কৈফিয়তটাও দেওয়া হইল। আশ্চর্য এই যে কাজী সাহেব ঐ ত্রিশ কপি পাইয়াই খুশি হইলেন এবং বিনা প্রতিবাদে চলিয়া গেলেন। আর কপি কোনও দিন চাইলেন না। আরো কপি কিনিবার ভয়ে কাজী সাহেবের হিন্দু শিষ্যদের নামাজ শিক্ষার অগ্রগতি সম্বন্ধেও আমরা কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করিলাম না। কিন্তু কাজী সাহেবের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আমার সহকর্মী মি. কালীপদ গুহ ও মি. অমলেন্দু দাসগুপ্ত এটাকে মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ বলিয়া স্বীকার করিলেন না। এই দুই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার আগের পরিচয় ছিল না। আমার দীর্ঘদিনের সাংবাদিক জীবনে বা কংগ্রেসী রাজনীতিতে এঁদেরে কোনও দিন দেখি নাই। তবু কাজী সাহেবের পীড়াপীড়িতে আমরা এই দুইজনকেই সহকারী সম্পাদক করিয়া নিয়াছিলাম। কাজী সাহেব এবং বোধহয় ম্যানেজমেন্টের কেউ-কেউ আমাকে বলিয়াছিলেন যে উহারা যুগান্তর’-’অনুশীলন দলের বিপ্লবী লোক বলিয়াই কংগ্রেসী রাজনীতিতে ওঁদের সাক্ষাৎ পাই নাই। শুনিয়া শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হইল। ওঁদেরে সহকারী সম্পাদক নেওয়া হইল কারণ ওঁদের দুইজনেই শক্তিশালী লেখক ছিলেন। বিশেষত, অমলেন্দু বাবুর কলমে খুবই জোর ছিল। তবে সাংবাদিকতায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অভাবেই বোধ হয়, তাঁদের লেখাগুলি বাস্তবের চেয়ে অবাস্তব, জার্নালিস্টেকের চেয়ে লিটারির, অবজেকটিভের চেয়ে সাবজেকটিভই হইত বেশি। সেজন্য তাঁদের সব লেখা ছাপা যাইত না। সেজন্য তারা বোধ হয় মনে-মনে আমার প্রতি। অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন এবং কাজী সাহেবের কাছে বোধ হয় এক-আধবার নালিশও করিয়াছিলেন। কাজী সাহেব সম্পাদনার ব্যাপারে মোটেই হাত দিতেন না। তাঁর সময়ই ছিল না। কাজেই তাঁরা মনে-মনে আমার উপর বিক্ষুব্ধ ছিলেন, এটা বলা যায়। কিন্তু আমি তাদের উপর অসন্তুষ্ট হইলাম। কাজী সাহেবের অসুখকে তারা অগ্রাহ্য করিতেন বলিয়া। শুধু অগ্রাহ্য করা নয়, এটাকে তারা আধ্যাত্মিক জীবনের অগ্রগতি বলিয়া ব্যাখ্যা করিতেন। আমি ও-সব কথাকে প্রথমে হাসিয়া এবং পরে দৃঢ়তার সাথে উড়াইয়া দিতাম বলিয়া আমার সামনে তারাও ও-বিষয়ে কথা আর বলিতেন না। ফলে লাভ এই হইল যে, কাজী সাহেব আমার রুমে তার নির্দিষ্ট আসনে না বসিয়া প্রায়ই সহ-সম্পাদকের জন্য নির্দিষ্ট রুমে অমলবাবুদের সাথেই বেশি সময় কাটাইতেন। তিনিই আইনত নবযুগএর প্রধান-সম্পাদক। তাঁর আসনও প্রধান-সম্পাদকের উপযোগী করিয়া সাজানো। গদি-আঁটা-চেয়ার, সেক্রেটারিয়েট টেবিল। টেবিলে বিশালকার ব্লটিং প্যাড হইতে শুরু করিয়া প্রকাণ্ড কাঁচের দোয়াতদান, দুরঙ্গা দুইটা কালি-ভরা দোয়াত-কলমসহ পেন হোল্ডার, পেপার-কাটার সবই সাজান থাকিত। কিন্তু এ সব ফেলিয়া তিনি অমলবাবুদের রুমে কাঠের চেয়ারে বসিয়া চুপি-চাপি আলাপ করিতেন। নজরুল ইসলাম বাংলার তরুণদের বিশেষত মুসলিম তরুণদের জন্য বিরাট আকর্ষণ। প্রধানত তাঁকে দেখিবার জন্যই মুসলিম ছাত্ররা দলে-দলে নবযুগ আফিসে আসিত। অন্য কোনও কারণই ছিল না তাদের। মুসলিম ছাত্রসমাজের প্রায় গোটাটাই এই সময় পাকিস্তান আন্দোলনের সুতরাং মুসলিম লীগের, সমর্থক এবং হক সাহেবের নবযুগ-এর সমর্থক। গোড়াতে নজরুল ইসলামকে ঘিরিয়া মুসলিম ছাত্র-তরুণদের সমাগমে নবযুগ আফিস সরগরম থাকিত। এইরূপ মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা দেওয়ার পর হইতে তিনি যেন ছাত্রদের এই ভিড় না-পছন্দ করিতে লাগিলেন। আমি তাঁকে তাঁর সিটে থাকার পরামর্শ দিয়া আমলবাবু ও বরদাবাবুর যোগটোগের সমালোচনা করায় তিনি গম্ভীরভাবে বলিয়াছিলেন : বরদাবাবু সিদ্ধ পুরুষ, তিনি বার বছর আগে-মরা বুলবুলকে একদিন সশরীরের তাঁর সামনে উপস্থিত করিয়াছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কোনও কথা বলিলে তিনি মনে কষ্ট পান। আমার সমালোচনার এটা দৃঢ় প্রতিবাদ। এরপর আমি আর কোনও কথা বলি নাই।
