কিন্তু নজরুল ইসলামের লেখায় কাজ হইল। হক সাহেব ও জিন্নাহ সাহেবের মধ্যে যে আপোস একরূপ চূড়ান্ত হইয়া গিয়াছিল, কাজী সাহেবের ঐ লেখাকে কেন্দ্র করিয়া সে আপোস ভণ্ডুল হইয়া গেল। নবযুগ বাহির হইবার দুই-আড়াই মাস মধ্যে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে মুসলিম লীগ ত্যাগ করিয়া হক সাহেব ‘প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি গঠন করিলেন এবং কংগ্রেস, হিন্দু সভা, কৃষক প্রজা সব পার্টিকে লইয়া নয়া মন্ত্রিসভা গঠন করিলেন।
প্রস্তুতই ছিলাম। কলম ঘুরাইয়া ধরিলাম। আগের কথা ত পুরান কথা, গত আড়াই মাস ধরিয়া যা কিছু লিখিয়াছি সে সব কথাও উল্টাইয়া বলিতে শুরু করিলাম। এবার সত্য-সত্যই প্রফেশনাল সাংবাদিকতা শুরু করিলাম। অর্থাৎ নিজের মতামত, আদর্শ ও বিবেক-বুদ্ধি চুঙ্গায় ভরিয়া রাখিয়া নূতন নূতন যুক্তিতে প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশনকে জনপ্রিয় ও সফল করিতে উকিলের মতই আরগুমেন্ট করিতে লাগিলাম। এ কাজে এমন সফল হইয়াছিলাম যে, এই কোয়ালিশনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও নেতা জনাব সৈয়দ নওশের আলী সাহেব একদিন নবযুগআফিসে আমার রুমে আসিয়া বলিলেন : কংগ্রেচুলেশন মনসুর সাহেব। আমি নীতিগতভাবেই খবরের কাগজ পড়ি না; কিনিয়া পয়সা অপব্যয় ত করিই না : খবরের কাগজের আফিসেও যাই না। বিনা পয়সায় যায়। বলিয়া নবযুগআমার বাড়িতে ঢুকিতে পারে। আপনার লেখা আমার ভাল লাগে বলিয়া দুই-একদিন নবযুগআমি পড়িয়া থাকি। আপনি প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন। সম্পর্কে ক্রমান্বয়ে যে পাঁচ-সাতটা এডিটরিয়েল লিখিয়াছেন, আপনি শুনিয়া আশ্চর্য হইবেন যে সবগুলি আমি এক নিশ্বাসে পড়িয়া ফেলিয়াছি।
আমি গালটি প্রশস্ত করিয়া বলিলাম : তবে ত কংগ্রেচুলেশন দিতে হয় আপনাকেই। কী হইয়াছে?
সৈয়দ সাহেবও হাসিয়া বলিলেন : হইবে আর কী? বুকের বোঝা নামিয়াছে। প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন করিয়া আমার চোখের ঘুম গিয়াছিল। ভাল করিলাম কি মন্দ করিলাম বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিলাম না। আপনার সম্পাদকীয় কয়টা পড়িয়া এতদিনে বুঝিলাম, এমন ভাল কাজ জীবনে আর একটাও করি নাই। আমাদের এই কাজের সমর্থনে যে এত-এত যুক্তি আছে, আপনার লেখা পড়িবার আগে তা জানিতাম না।
সৈয়দ সাহেবের কথার জবাবে আমি মুখে কিছু বলিলাম না বটে কিন্তু মনে-মনে বলিলাম: আপনার ও আমার অবস্থা একই। লিখিবার আগে আমিও জানিতাম না যে আপনাদের পক্ষে অত কথা বলিবার আছে।
বস্তুত প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশনের সমর্থনে পরপর কয়েকদিন এডিটরিয়েল লিখিয়া আমি নিজেই নিজের যুক্তির ফাঁদে পড়িলাম। যদিও প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন গঠনে আমার কোনও কনট্রিবিউশন ছিল না, সুতরাং উহাকে সফল করিবার কোনও দায়িত্ব আমার ছিল না। ক্রমেই আমার মনে হইতে লাগিল চেষ্টা করিলে ইহাকে সফল করা যাইতে পারে এবং সে চেষ্টা করাও উচিৎ। এমন সময় হক সাহেব এক বিবৃতিতে বলিলেন : ডা. শ্যামাপ্রসাদ মুসলিম বাংলার স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছেন, আর হক সাহেব স্বয়ং নিয়াছেন হিন্দু বাংলার স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব। হক সাহেব তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যতগুলি ঐতিহাসিক ঘোষণা করিয়াছেন, তার মধ্যে এইটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘোষণা। কারণ হিন্দু সভার নেতা ডা. শ্যামাপ্রসাদকে এই সময় বাংলার, এমনকি গোটা ভারতের, মুসলমানরা নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করিত। সেই ডা. শ্যামাপ্রসাদকেই মুসলিম স্বার্থ রক্ষার ভার দেওয়া হইয়াছে শুনিয়া মুসলমানরা সোজাসুজি বুঝিল বাঘের হাতেই ছাগল রাখানি দেওয়া হইয়াছে।
.
৩. আমার রাজনীতিক সাংবাদিকতা
কিন্তু আমি হক সাহেবের ঐ ঘোষণার মধ্যে প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশনের সাফল্যের চাবিকাঠি দেখিতে পাইলাম। বাহ্যত অসম্ভব এবং হাস্যকর এ ঘোষণা স্পষ্টতই একটা রাজনৈতিক স্টান্ট। সাংবাদিকের দায়িত্ব এটা নয়। ‘রাজনীতি’ ও ‘সাংবাদিকতা সম্পূর্ণ আলাদা কাজ। সাংবাদিকতা উকিলের মত ‘প্রফেশনাল’ মাত্র, এসব কথা মাত্র কয়েকদিন আগে প্রচার করিয়াছি; ওটা তখনও আমার দৃঢ় মত। তবু আমি হক সাহেবের নবযুগ-এ চাকুরি নিয়া তাঁর রাজনীতিতে জড়াইয়া পড়িলাম। সেটা পারিলাম দুই কারণে। প্রথমত, রাজনীতি ও সাংবাদিকতার স্বাতন্ত্রটা আমার সাম্প্রতিক মত। অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধি মাত্র। মুরুব্বিদের কাছে-শেখা জ্ঞান হইতে এই মত সম্পূর্ণ আলাদা। মওলানা ইসলামাবাদী, মওলানা আকরম খাঁ ও মৌলবী মুজিবর রহমান প্রভৃতি শিক্ষাগুরুদের কাছে পাওয়া জ্ঞানের এটা সম্পূর্ণ বিপরীত। সাংবাদিকতা মিশনারির দায়িত্ব, চাকুরিয়ার কাজ নয়, এটাই শিখিয়াছিলাম এদের খেদমতে। পরে মুরুব্বিদের এই মতের ত্রুটি বুঝিয়াছিলাম। কিন্তু অভ্যাস বদলাইতে পারি নাই। শৈশবে-পাওয়া মুরুব্বিদের-দেওয়া জ্ঞান সত্যই মানুষের স্বভাবে অন্তর্ভুক্ত হইয়া যায়। দ্বিতীয়ত, হক সাহেবের তখনকার রাজনৈতিক সাফল্য-অসাফল্যের সাথে নবযুগএরা মরা-বাঁচা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল। নবযুগ-এর বাঁচিয়া থাকা শুধু আমার একার নয়, নবযুগএর শতাধিক চাকুরিয়ার জীবিকা নির্ভর করিতেছে। দু-চারজন বাদে এঁরা সবাই মুসলমান। নবযুগ না থাকিলে এঁদের বিপদ হইবে। কৃষক-এর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা হইতে এটা আমি বুঝিয়াছিলাম।
