অধ্যায় উনিশ – তৃতীয় পর্যায়
১. ‘নবযুগ’
১৯৪১ সালের অক্টোবর মাসে হক সাহেব নবযুগ বাহির করেন। আমি ইহার সম্পাদনার ভার গ্রহণ করি। কিন্তু উহাতে সম্পাদকরূপে আমার নাম দিতে রাজি হই নাই। ইহার একাধিক কারণ ছিল। প্রথমত, যদিও আমি সাংবাদিকতাকে প্রফেশন হিসাবে গ্রহণ করিয়া ব্যক্তিগত মতামত নিরপেক্ষভাবে যে কোনও মতের কাগজে চাকুরি নিতে সাংবাদিক বন্ধুদের উপদেশ দিতাম। কিন্তু আমি নিজে তা করিতে রাজি ছিলাম না। কারণ আমার নিজের একটা রাজনীতিক জীবন ছিল। সেটা নষ্ট করিতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। দ্বিতীয়ত, যে উদ্দেশ্য প্রচারের জন্য হক সাহেব নবযুগ বাহির করিলেন, সে উদ্দেশ্যের সহিত আমার পূর্ণ সহানুভূতি থাকিলেও হক সাহেবের মতের স্থিরতায় আমার আস্থা ছিল না। মুসলিম লীগ নেতৃত্বের সাথে বিশেষত জিন্নাহ সাহেবের সহিত হক সাহেবের বিরোধের মূল কথা আমি জানিতাম। মুসলিম বাংলার স্বার্থ জিন্নাহ নেতৃত্বের হাতে নিরাপদ নয় বলিয়াই হক সাহেব জিন্নাহ সাহেবের সাথে কলহ করিতেছেন, হক সাহেবের এ কথা আমি বিশ্বাস করিতাম। নবযুগ বাহির হইবার মাসাধিক কাল আগে হইতেই হক সাহেব তার উদ্দেশ্যের কথা আমাকে বলেন এবং আমার সহযোগিতা দাবি করেন। আমার কলমের উপর হক সাহেবের আস্থা ছিল। তিনি মুসলিম লীগে থাকিয়া মুসলিম লীগ প্রধানমন্ত্রী হিসাবেই নবযুগ বাহির করিতেছেন। অথচ শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগ হইতে তিনি বাহির হইয়া আসিবেন। এসব ব্যাপারে তাঁর ধারণা ছিল সুস্পষ্ট। এ অবস্থায় নবযুগ-এর সম্পাদকীয় নীতি পরিচালনার দায়িত্ব তিনি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে দিয়া বিশ্বাস পাইতেছেন না, হক সাহেবের এসব কথাও আমি বিশ্বাস করিয়াছিলাম। দাম্ভিকতা ও অহংকার না করিয়াও আমি বলিতে পারি, আমার মত উকিল-সম্পাদক ছাড়া আর কারো পক্ষে এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে হক সাহেবের পছন্দ-মত কাগজ চালানো সম্ভব ছিল না। এ অবস্থায় আমি সর্ব শক্তি দিয়া হক সাহেবের সমর্থন করিতে প্রস্তুত ছিলাম। এর উপর আমার বিশেষ অন্তরঙ্গ শ্রদ্ধেয় বন্ধু সৈয়দ বদরুদ্দোজা আমাকে বুঝাইলেন যে মুসলিম বাংলার স্বার্থে হক নেতৃত্বের পিছনে দাঁড়াইতে তাঁর মত বহু মুসলিম লীগার প্রস্তুত। আসল কারণ তারাও বিশ্বাস করেন যে হক সাহেব জিন্নাহ সাহেবের নিকট পরাজিত হইলে অথবা হক সাহেবের রাজনৈতিক অপমৃত্যু ঘটিলে মুসলিম বাংলার ভবিষ্যৎ নাই। সুতরাং হক সাহেবের নবযুগ-এ যোগ দেওয়া সম্বন্ধে আমার মনে কোনও দ্বিধা থাকিল না। এলাউন্সসহ মাসে তিনশ টাকা বেতনের অফার দিয়া আর্থিক দিক দিয়া আমার আপত্তিও খণ্ডন করা হইয়াছিল। এসব সত্ত্বেও আমি সন্দেহ করিতাম এবং আমার অনেক বন্ধুও আমার সাথে একমত হইতেন যে, হক সাহেব যে কবে আবার লীগের সাথে রফা করিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইবেন, তার কোনও নিশ্চয়তা নাই। তৃতীয়ত, আমি জানিতাম নবযুগ বেশি দিন টিকিবে না। কারণ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই যে, রাজনৈতিক নেতাদের স্থাপিত কাগজ স্থায়ী হয় না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, মি. জে এম সেন গুপ্ত, শ্রীযুক্ত শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, পণ্ডিত জওয়াহরলাল নেহরু প্রভৃতি বড়-বড় নেতা নিজস্ব দৈনিক কাগজ বাহির করিয়াছেন। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধুমধামের মধ্যে কাগজ চলিয়াছে কিছুদিন। তারপর সব ঠাণ্ডা। হক সাহেবের কাগজও এর ব্যতিক্রম হইবে না। সুতরাং ব্যাপারটা যখন শেষ পর্যন্ত একটা অনিশ্চিত এক্সপেরিমেন্ট তখন সম্পাদকরূপে নিজের নামটা দিয়া বদনাম কিনি কেন? বদনামের কথা আমি এই জন্য বলিলাম যে হক সাহেবের বিরুদ্ধে গত তিন চার বছর যত-কিছু লিখিয়াছি ও সভা-সমিতিতে যে সব কথা বলিয়াছি, নবযুগ-এ সে সবেরই উল্টা উতার গাইতে হইবে। তাছাড়া উকালতি সাসপেন্ড করারও রিস্ক ছিল।
.
২. বেনামী সম্পাদক
কাজেই হক সাহেবকে পাল্টা প্রস্তাব দিয়াছিলাম। সম্পাদকরূপে তাঁর নিজের নাম দিতে হইবে। যুক্তি দিলাম, প্রথম পর্যায়ে বিশ বছর আগের নবযুগ-এর সম্পাদকরূপে তাঁরই নাম ছিল। তার পছন্দ হইল। তিনি নিমরাজি হইলেন। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরে তিনি জানাইলেন যে সরকারি আইন ও স্বরাষ্ট্র বিভাগ আপত্তি করিয়াছে। লাট সাহেবও বারণ করিয়াছেন। অতঃপর বন্ধুবর সৈয়দ আজিজুল হক (নান্না মিঞা), জনাব ওয়াহিদুযযামান (ঠাণ্ডা মিঞা) ও স্নেহাস্পদ মাহমুদ নূরুল হুদা প্রভৃতির সঙ্গে পরামর্শ করিয়া হক সাহেবের সম্মতিক্রমে কাজী নজরুল ইসলামের নাম ঠিক করিলাম। কাজী সাহেব এ সময় দায়-দেনায় খুবই বিপন্ন ছিলেন। পাওনাদাররা ডিক্রিজারী করিয়া তাকে অপমান করিবার চেষ্টা করিতেছে। পক্ষান্তরে তার পাবলিশাররা ও গ্রামোফোন কোম্পানিরা তাকে ঠকাইতেছে। এ সময়ে কাজী সাহেবকে আর্থিক সাহায্য করাও হইবে। আমার সাড়ে তিনশ টাকা বেতন অফার করিলাম। কিছু করিতে হইবে না, মাঝে-মাঝে বিকাল বেলা আফিসে আড্ডা। এবং সপ্তাহে এক-আধটা কবিতা দিলেই যথেষ্ট। কাজী সাহেব রাজি হইলেন। ধুমধামের সাথে নবযুগবাহির হইল। চলিলও ভাল। কাজী সাহেব সত্য-সত্যই সন্ধ্যার দিকে আফিসে আড্ডা দিতে লাগিলেন। মুসলিম ছাত্র তরুণরা হক সাহেবের নয়া নীতিতে কতকটা, নজরুল ইসলামের আকর্ষণে কতকটা, নবযুগ আফিসে ভিড় করিতে লাগিল। আচ্ছা খুব জমিয়া উঠিল। নজরুল ইসলামও উৎসাহিত হইয়া উঠিলেন। তিনি জোরদার কবিতাই শুধু নয়, দুই-একটা সম্পাদকীয়ও লিখিয়া ফেলিলেন। এমনই একটার মধ্যে জিন্নাহ সাহেবকে কাফের’ ও পাকিস্তানকে ফাঁকিস্তান’ বলাতে মুসলিম লীগ মহলে আগুন লাগিল। নবযুগ বাহির হওয়ায় আজাদ স্বভাবতই আতঙ্কগ্রস্ত হইয়াই ছিল। এই সুযোগে নবযুগও নজরুল ইসলামকে কঠোর ভাষায় গাল দিয়া এক সম্পাদকীয় লিখিলেন। নজরুল ইসলামের নাম সম্পাদক হিসাবে প্রকাশিত হওয়ায় আমি কবি ও কাদা’ নামে একটি দস্তখতী সম্পাদকীয় লিখি। লেখাটা সত্যই মর্মস্পর্শী ও যুক্তিপূর্ণ হইয়াছিল। ছাত্র-তরুণরা ও সাহিত্যিক-সাংবাদিক মহলে উহা উচ্চ প্রশংসা লাভ করল। অনেকে আফিসে আসিয়া, অনেকে টেলিফোনে আমাকে কংগ্রেচুলেট করিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, নজরুল ইসলাম আমাকে ধন্যবাদ দিতে আসিয়া, আমার হাত ধরিয়া আনন্দে কাঁদিয়া ফেলিলেন। আমি নজরুল ইসলামের তর্কিত প্রবন্ধটা ছাপা হওয়ার দরুন নিজেই দুঃখিত ছিলাম। আমার অবর্তমানে লেখাটা ছাপা হইয়া যাওয়ায় নিজের উপরও যেমন রাগ ছিল, নজরুল ইসলামের উপরও গোস্বা ছিল। কিন্তু নজরুল ইসলামের শিশুসুলভ সরলতায় আমি এই দিন সব ভুলিয়া গেলাম।
