.
৮. ‘কৃষক’ ত্যাগ
পক্ষান্তরে আমি যদি সম্পাদকতা ছাড়িয়া দেই তবে দত্ত সাহেব কৃষক চালাইবেন। স্টাফের কাউকে তিনি ছাড়াইবেন না। কারণ কাগজের পলিসির সাথে তাদের কোনও সম্পর্ক নাই। দত্ত সাহেব স্পষ্টভাবেই প্রতিশ্রুতি দিলেন। কাজেই আমি পদত্যাগ করিতেই রাজি হইলাম। দত্ত সাহেব ডিরেক্টর বোর্ডের জরুরি সভা ডাকিলেন। সেখানে আমার বক্তব্য পেশ করিয়া পদত্যাগ করিলাম। আমাকে ধন্যবাদ দিয়া পদত্যাগপত্র গৃহীত হইল।
অতঃপর কৃষক চলিতে থাকিল। কিন্তু দুই-এক দিনের মধ্যেই সব ডাইরেক্টর পদত্যাগ করিলেন। কৃষক কার্যত দত্ত সাহেবের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হইয়া গেল। কৃষক-প্রজা সমিতির দুয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য এবং আমার কোনও কোনও সাংবাদিক বন্ধু আমাকে বলিলেন : আমি ভুল করিয়াছি। দত্ত সাহেবের হাতে কৃষক তুলিয়া না দিয়া উহা বন্ধ করিয়াই বাহির হওয়া উচিৎ ছিল। কারণ মুসলমানদের প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র এইভাবে পুঁজিবাদী হিন্দুর হাতে তুলিয়া দিয়া আমি মুসলমান সমাজের শত্রুতাই সাধন করিয়াছি। মুসলমানের শ্রম ও ঘর্মে অস্ত্র তৈয়ার করিয়া তাতে শাণ দিয়া আমি মুসলমানের গলা কাটিবার জন্য হিন্দুর হাতে তুলিয়া দিয়া আসিয়াছি। ব্যাপারটা অত সাংঘাতিক এ বিষয়ে আমি ঐ সব বন্ধুর সাথে একমত হইতে পারি নাই।
.
৯. সাংবাদিকতায় নূতন জ্ঞান
কারণ প্রায় তিন বছর কাল কৃষক–এর সম্পাদকতা করিয়া আমি দুইটা নূতন জ্ঞান লাভ করিয়াছিলাম। (১) সংবাদপত্র পরিচালন একটা ইন্ডাস্ট্রি; এতে প্রচুর মূলধন লাগে; কাজেই ধনী ছাড়া কেউ নূতন কাগজ বাহির করিয়া সফল হইবে না। মুদির দোকান চালাইতে চালাইতে বড় সওদাগর ও শিল্পপতি হওয়ার দিন যেমন আর নাই, সাপ্তাহিক চালাইতে চালাইতে দৈনিক করার দিনও তেমনি আর নাই। (২) ধনতন্ত্রী সমাজের অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে যেমন সংবাদপত্র-শিল্পও তেমনি, যার টাকা তিনিই মালিক। কাজেই শিল্পের ইঞ্জিনিয়ার যেমন শিল্পের নিয়ন্তা নন, সম্পাদকও তেমনি খবরের কাগজের নিয়ন্তা নন। খবরের কাগজে মালিক-এর মত চলিবে, না সম্পাদকের মত চলিবে, এই তর্ক আমার কৃষক-সম্পাদকতার আমলেই উঠিয়াছিল। আমাদের সকল সাংবাদিকের ‘দাদা’ শ্ৰীযুক্ত মৃণালকান্তি বোস ও আমার প্রায়ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডা. ধীরেন্দ্রনাথ সেনের সঙ্গে অমৃতবাজার পত্রিকার কর্তৃপক্ষের বিরোধ বাধে সম্পাদকীয় পলিসি লইয়া। মৃণালবাবু শ্রমিক আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। ধীরেনবাবু বামপন্থী কংগ্রেসী ছিলেন। কাজেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বড়-বড় ইস্যু সম্বন্ধে অমৃতবাজার-এর মালিকদের সাথে এঁরা একমত ছিলেন না। কাগজে তারা নিজেদের মতামত চালাইতেন। অমৃতবাজার কর্তৃপক্ষ এদের দুইজনকেই কর্মচ্যুত করেন। ব্যক্তিগতভাবে এঁরা দুইজনই সাংবাদিকদের কাছে খুব শ্রদ্ধেয় ও জনপ্রিয় ছিলেন। কাজেই বিভিন্ন কাগজে অমৃতবাজারকর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠিল। জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনে এর কথা উঠিল। ঐ এসোসিয়েশনের অনেক মালিক মেম্বর ছিলেন বলিয়া ওয়ার্কিং জার্নালিস্টরা নিজেদের প্রতিষ্ঠান খাড়া করিলেন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ আন্দোলন করিতে। কাজেই শিক্ষিত সমাজে, বিশেষত সাংবাদিকদের সামনে একটি মাত্র ইস্যু দেখা দিল : খবরের কাগজে কার মত চলিবে : মালিকের? না সম্পাদকের? সব সাংবাদিক ও অধিকাংশ খবরের কাগজে একই মত দেওয়া হইতে লাগিল : সম্পাদকের মত চলিবে। একমাত্র আমি কৃষক-এর সম্পাদকীয় লিখিলাম : মালিকের মত চলিবে।
.
১০. সম্পাদক বনাম মালিক
কলিকাতার সাংবাদিক মহল স্তম্ভিত হইল। মালিকরাও বোধ হয় অতটা আশা করেন নাই। মালিকের পক্ষের কথা বলে একজন ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট তাও আবার বামপন্থী কাগজে? অনেক বন্ধু আমার নিন্দা করিলেন। ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন আমার কথায় প্রতিবাদ করিলেন। আমি কিন্তু অটল। নিজের কথার সমর্থনে পরপর আরো কয়েকটা সম্পাদকীয় লিখিলাম। আমি বলিয়াছিলাম সাংবাদিকতা উকালতির মতই একটা প্রফেশন। এটা মিশনারির মত আদর্শ সেবা নয়। উকিল যেমন দোষী-নির্দোষ-নির্বিশেষে সকলের কেস নেন, সাংবাদিকও তেমনি কংগ্রেস, মুসলিগ লীগ, হিন্দু সভা নির্বিশেষে সকলের কেস নিবেন। অর্থাৎ যিনি তার ফিস দিবেন তাঁরই পক্ষে সাংবাদিক কলম ধরিবেন। এটা তার ব্যবসায়িক কাজ। এটাকে তার ব্যক্তিগত মতামত বলিয়া কোনও বুদ্ধিমানই ধরিয়া লইবে না। সাংবাদিক এইভাবে পরের জন্য টাকার বিনিময়ে কলম চালাইতে গিয়া এতটুকু মাত্র দেখিবেন যে ঐ সাংবাদিক কর্তব্যের বাহিরে তার স্বাধীনতা যাতে ব্যাহত বা সংকুচিত না হয়। আপনি যদি কংগ্রেসী হন, তবে কংগ্রেস-বিরোধী কাগজে আপনি চাকুরি নিবেন না। যদি নেন, তবে কংগ্রেস-বিরোধী কথাই আপনাকে লিখিতে হইবে। আপনি কংগ্রেস-বিরোধীর টাকায় খানা খাইয়া তাঁরই কাগজে কংগ্রেসী প্রচার করিবেন, এটা আইন বা নীতির কোনও দিক দিয়াই সমর্থনযোগ্য নয়। যদিও কংগ্রেস-বিরোধী কথা বলিলে কাগজ না চলে, তবে সেটা দেখা যার টাকা তারই কর্তব্য, সাংবাদিকের নয়। সাংবাদিক সে ক্ষেত্রে মালিককে সদুপদেশ দিতে পারেন মাত্র। মালিক যদি সে উপদেশ না রাখেন। তবে সাংবাদিককে কাগজের মালিকের কথাই লিখিতে হইবে। আমি কৃষক ছাড়িবার সময় মুসলিম স্টাফকে এই উপদেশ দিয়াই আসিয়াছিলাম।
