.
৫. খান বাহাদুর মোহাম্মদ জান
এ অবস্থায় অধ্যাপক হুমায়ুন কবির দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করিয়াও কিছু করিতে পারিলেন না। পরিচালক বোর্ডের মধ্যে একমাত্র ধনী ব্যবসায়ী খান বাহাদুর মোহাম্মদ জানের উপর ম্যানেজিং ডাইরেক্টরির ভার চাপান হয়। খান বাহাদুর সাহেব ভাল মানুষ। টাকাও তাঁর আছে। কিন্তু তিনি অবাঙ্গালী। বাংলা জানেন না। কৃষক পড়িতে পারেন না। তিনি কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন পছন্দ করেন না। তিনি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সমর্থন করেন না বলিয়া আইনসভায় কৃষক প্রজা পার্টি ও কংগ্রেস পার্টিকে সমর্থন করে। এমন লোকের পক্ষে কৃষকের পরিচালনার এবং মাসে-মাসে দুই-তিন হাজার টাকা লস দেওয়ার উৎসাহ বেশি দিন স্থায়ী হইতে পারে না। কাজেই মাস চার-পাঁচেক পরে তিনি দায়িত্ব বহনে অস্বীকৃতি জানাইলেন।
৬. মি. এইচ দত্ত
এর পরে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হইলেন কলিকাতা কমার্শিয়াল ব্যাংকের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ও অন্যান্য অনেক কোম্পানি পরিচালক মি. হেমেন্দ্র নাথ দত্ত। মি. দত্তের বাড়ি ময়মনসিংহ। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়াই ব্যস্ত থাকেন বটে তবে অসাম্প্রদায়িক সুস্থ রাজনীতির তিনি উৎসাহী সমর্থক। তিনি ধর্ম বিশ্বাসে ব্রাহ্ম বলিয়া সাধারণ হিন্দুর মত সংকীর্ণ নন। মুসলমানদের প্রতি তিনি খুবই উদার। এইসব কারণেই কংগ্রেসের চেয়ে কৃষক প্রজা পার্টির তিনি বেশি সমর্থক ছিলেন। এ ছাড়া অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতাও ছিল। সুভাষবাবু দেশত্যাগের আগেই মি. দত্তকে কৃষক-এর একজন শেয়ার হোল্ডার করিয়া দিয়াছিলেন। কাজেই তাকে কৃষক-এর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর করিতে কোনোই অসুবিধা হইল না। অন্যতম সুপরিচিত কৃষক নেতা ময়মনসিংহবাসী জনাব আবদুর রশিদ খাঁ এ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজিং ডাইরেক্টর রূপে সমস্ত কাজ পরিচালনা করায় এবং দত্ত সাহেব খুব কমই আফিসে আসায় এই পরিবর্তনের কথা বড় কেউ জানিতেও পারিল না। মোটামুটি স্বচ্ছন্দেই কৃষক চলিতে লাগিল। অপেক্ষাকৃত উন্নত ধরনের আফিস করার উদ্দেশ্যে মি. দত্ত কৃষক আফিস ম্যাংগো লেন হইতে ক্রীক রোডে স্থানান্তরিত করিলেন। পরিচালনা স্থান সংকুলান ও পরিবেশ সকল দিক দিয়াই ইহাতে কৃষক-এর উন্নতি হইল। আমি কম্পোযিটারদের জন্য ফ্যানের ব্যবস্থা করিলাম। বড়-বড় লাভের কাগজ সচরাচর ঐ সময় তা করে নাই। আমার কাজকে তারা বিদ্রূপ করিয়াছে।
.
৭. নীতিগত বিরোধ
কিন্তু এ সুখ আমাদের বেশিদিন স্থায়ী হইল না। ঐ সময় হক মন্ত্রিসভার প্রস্তাবিত মাধ্যমিক শিক্ষা বিল লইয়া খুবই বাদ-বিতণ্ডা চলিতেছিল। এই বিলের বিধান অনুসারে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার কর্তৃত্ব কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতছাড়া হইয়া যাইবে বলিয়া হিন্দু শিক্ষিত সমাজের প্রায় সকলেই ইহার বিরুদ্ধতা করিতেছিলেন। হিন্দু সংবাদপত্রেরাও সমস্বরে ইহার প্রতিবাদ করিতেছিলেন। কংগ্রেস পার্টি ও আইন সভার ভিতরে বাহিরে এই বিলের বিরুদ্ধে জনমত গড়িতেছিল। এমন সময় কৃষক-এর সম্পাদকীয়তে এই বিলের সমর্থন করা হইল। মি. দত্ত এই সর্বপ্রথম সম্পাদকের দায়িত্বে হস্তক্ষেপ করিলেন। আফিসে আসিয়া আমার রুমে বসিয়া আমার লেখার প্রতিবাদ করিলেন। তিনি বলিলেন যে সম্পাদকীয় ব্যাপারে নাক ঢুকাইবার তার মোটেই ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু এই ব্যাপারে না করিয়া পারিলেন না। কারণ আমি একটা সাম্প্রদায়িক বিল সমর্থন করিয়া কষক-এর মূলনীতি লঙ্ঘন করিতেছি। আমি যুক্তিতর্ক ও তথ্যাদি দিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম যে প্রস্তাবিত বিলটা সাম্প্রদায়িক নয়, হিন্দুদের বিরুদ্ধতাটাই সাম্প্রদায়িক। তিনি আমার যুক্তি মানিলেন না। আমিও তারটা মানিলাম না। ঐ ব্যাপারে পরপর আরো কয়টা সম্পাদকীয় লিখিলাম। তিনি বোর্ডের মিটিং ডাকিয়া আমার বিরুদ্ধে নালিশ করিলেন। বোর্ডের মেম্বাররা। স্বভাবতই আমারই সমর্থন করিলেন। মি. দত্ত পদত্যাগের হুমকি দিলেন। কৃষক-এর জীবনে আবার ক্রাইসিস।
অবস্থা শেষ পর্যন্ত এই দাঁড়াইল যে আমি এডিটর থাকিলে মি. দত্ত ম্যানেজিং ডাইরেক্টর থাকিবেন না। তিনি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর না থাকিলে কৃষক চলিবে না। কাজেই কৃষক বাঁচাইয়া রাখিতে হইলে আমারই পদত্যাগ করিতে হয়। কিন্তু পরিচালক বোর্ডের মেম্বাররা তা মনে করিলেন না। তাঁরা দেখিলেন আমার অবর্তমানে কৃষকচলিবে না। তার মানে এই নয় যে আমার মত যোগ্য সম্পাদক আর নাই; আমাকে ছাড়া কাগজ চলিবে না। তারা দেখিলেন যে ইস্যুতে বিরোধ তাতে মি. দত্তকে মানিয়া নিলে কৃষক বাঁচিয়া থাকিলেও মুসলমানের কাগজ থাকিবে না। কিন্তু আমি অন্য দিক দেখিলাম। কৃষক বন্ধ হইলে শতাধিক মুসলিম যুবক বেকার হইবে। কৃষক-এর সম্পাদকীয় বিভাগের কম-বেশি পঁয়ত্রিশ জনের সকলেই মুসলমান। ম্যানেজিং বিভাগের চৌদ্দ-পনের জনের দুইজন বাদে সবই মুসলমান। কম্পোযিং বিভাগের পঞ্চাশজনের মধ্যে সকলেই মুসলমান। ইহাদের সকলকেই আমি নিযুক্ত করিয়াছি। কৃষক বন্ধ হইলে একযোগে এতগুলি লোকের চাকরি যাইবে। এঁরা সকলে আমারই দিকে তাকাইয়া আছেন। তাঁরা আমাকে আন্তরিক ভালও বাসিয়া থাকেন। কারণ সারা কলিকাতার সংবাদপত্র জগতে আমিই সর্বপ্রথম কম্পোষ সেকশনে ‘ফ্যান’ দিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলাম। ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে বলিয়াছিলাম, যত দিন কম্পোযিটরদেরে ফ্যান দেওয়া না হইবে, ততদিন সম্পাদকের রুমে ফ্যানের দরকার নাই। আমার এই কাজে কলিকাতার কম্পোযিটার শ্রেণীর মধ্যে আমার খুব নাম ছিল। কাজেই একযোগে এতগুলি লোকের বেকারির সম্ভাবনায় আমি কাতর হইলাম। আমার নিজের চাকরির জন্য এতগুলি লোককে বেকার করা আমার বিবেকে কিছুতেই বরদাশত হইল না।
