.
২. কৃষক’-এর অর্থাভাব
গেল এমনি করিয়া বছর খানেক। হঠাৎ হুমায়ুন কবির সাহেব জানাইলেন আর চলে না। অর্থাভাব। আলোচনা করিয়া বুঝিলাম, দৈনিক চালাইবার মত যথেষ্ট মূলধন না লইয়াই এঁরা কাগজ প্রকাশে হাত দিয়াছিলেন। দৈনিক কাগজ চালান যে আগের মত মিশনারি ওয়ার্ক নয়, ইতিমধ্যে সংবাদপত্র যে একটা ইন্ডাস্ট্রি হইয়া উঠিয়াছে, এতে যে অন্যান্য শিল্পের মতই মোটা টাকা মূলধন লাগে পরিচালকরা এ খবর রাখিতেন না। দোষ তাদের নয়। কারণ তাঁরা কেউ সাংবাদিক নন, যদিও হুমায়ুন কবির সাহেব সাংবাদিকতার সাথে কিছু কিছু পরিচিত ছিলেন। কাজেই তাদের দোষ দেওয়া যায় না। পক্ষান্তরে আমারও দোষ নাই। কারণ আমার সাথে আর্থিক ব্যাপারে বা পরিচালনা সম্বন্ধে কোনও পরামর্শ করা হয় নাই। সম্পাদকের সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করিবার কথাও নয়। আর করিলেই যে আমি খুব নির্ভরযোগ্য উপদেশ বা অর্থ সংগ্রহে সাহায্য করিতে পারিতাম, তা-ও নয়। ডাইরেক্টর বোর্ডের মেম্বরদের তুলনায় আমার কি দাম আছে? তাঁরা সব কলিকাতার বাসেন্দা, আমি মফস্বলের লোক। তারা সব আইনসভার মেম্বর, ভূতপূর্ব বা হবু মন্ত্রী। টাকাওয়ালা লোকদের সাথে পরিচয়ও আমার তেমন ছিল না। অতএব টাকা-পয়সার ব্যাপারে তাঁরা আমাকে কিছু না জানাইয়া অন্যায় কিছু করেন নাই।
কিন্তু কৃষক বাঁচাইয়া রাখার ইচ্ছা ও উৎকণ্ঠা পরিচালক বোর্ড ও আমার নিজের সমান। কৃষক প্রজা পার্টি হইতে নিজস্ব দৈনিক বাহির করার চেষ্টা এই প্রথম। এটা ব্যর্থ হইলে কৃষক-প্রজা-নেতৃত্ব এবং আন্দোলন একটা মার খাইবে। জনপ্রিয় কৃষক-প্রজা-নেতা প্রধানমন্ত্রী হক সাহেবের সহিত আদর্শগত বিরোধ হওয়ায় এবং তার ফলে হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব দিয়া পরাজিত হওয়ায় ইতিপূর্বে কৃষক-প্রজা-নেতৃত্ব একটা মার খাইয়াছে। তার পরপরই এটা হইলে আরো বিপদ। কৃষক-প্রজা নেতাদের দুশ্চিন্তা এইখানে। এই চিন্তায় আমিও শরিক।
.
৩. ব্যক্তিগত বিপদ
আর একটা দুশ্চিন্তা আমার ব্যক্তিগত। আমি দশ বছরের জমানো উকালতি ব্যবসাটা ছাড়িয়া সপরিবারে কলিকাতার বাসেন্দা হইয়াছি। আসিবার সময় শুধু হাতের মামলা-মোকদ্দমাগুলি নয় বই-পুস্তক, সাজ-সরঞ্জাম, টেবিল চেয়ার, মায় গাউনটা পর্যন্ত বন্ধুবান্ধবের মধ্যে বিতরণ করিয়া আসিয়াছি। অর্থাৎ যাকে বলে ‘পিছনে নৌকা তলাইয়া দিয়া সামনে অগ্রসর হওয়া’, আমি তাই করিয়াছি। সুতরাং ফিরিবার উপায় নাই। নিজের অস্তিত্বের জন্যও কৃষককে বাঁচাইয়া রাখিতে হইবে। পরিচালকদের সকলেই আমার হিতৈষী বন্ধু। তারাও আমার ব্যক্তিগত মঙ্গল-অমঙ্গল ও সুবিধা-অসুবিধায় সম্পূর্ণ সচেতন।
এইসব কারণে কৃষক-এর অর্থাভাব দূরীকরণের জন্য আমিও পরিচালকদের সাথে সক্রিয় সহযোগিতা করিতে লাগিলাম। এতদিন আমি কাগজের সম্পাদনা কার্যের উন্নতির চিন্তায় সময় ব্যয় করিতাম। এখন হইতে উহার আর্থিক দিকটাতেও জড়াইয়া পড়িলাম। কাজটা কঠিন। সম্পাদকরা লেখক-ভাবুক। শিল্পী। টাকা-পয়সার ঝামেলার মত বৈষয়িক ও ব্যবসায়িক ব্যাপার তাদের চোখে নিতান্ত অশিল্পী দোকানদারি ব্যাপার। কাজেই নিম্নশ্রেণির বিষয়। এতদিন ছিল আমার এই ধারণা। এখন বুঝিলাম অশিল্পী অসুন্দর হইলেও এই ব্যবসায়ী দিকটাই আসল। এতদিনে বুঝিলাম, মৌলবী মুজিবর রহমান সাহেবকে একাধারে সম্পাদকতা ও অর্থ সংগ্রহ করিতে কী ঝামেলা পোহাইতে হইত।
বিপদই মানুষের বড় শিক্ষক। কৃষক-এর সম্পাদকতা করিতে গিয়া আমি সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা, সংবাদ-শিল্পী ও সংবাদ-বাণিজ্য সকল দিকে নজর দিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। শুধু প্রধান সম্পাদকের আসনে বসিয়া থাকিলে আমার চলিত না। ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের সঙ্গে যেমন চাদা আদায়ে, বিজ্ঞাপন ক্যানভাসিং-এ ঘুরিয়া বেড়াইতে হইত, তেমনি ছাপাখানার আধ-অন্ধকার চিশিলা গরমের মধ্যে কম্পোযিটার, মেশিনম্যানের কাঁধের কাছে দাঁড়াইয়া কাজে তাকিদ দিতে হইত। এটা করিতে গিয়া একদিকে যেমন পরিচালকদের আর্থিক অভাবের কথা জানিলাম। অপর দিকে বেচারা কম্পোযিটারদের শারীরিক অসুবিধার কথাও জানিলাম। কম্পোযিটাররা অন্ধকার সংকীর্ণ ও আলো-বাতাসহীন কুঠরিতে বসিয়া দিনরাত শিসা হাতাইয়া কীভাবে শরীর, স্বাস্থ্য ও চোখ নষ্ট করিতেছে, তা দেখিয়া শিহরিয়া উঠিলাম। আমাদের অভাব মিটিলে এদের জন্যও কিছু একটা করিব অন্তত দু-চারটা ফ্যানের ব্যবস্থা করিব মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম।
.
৪. অর্থাভাবের সংগত কারণ
কিন্তু টাকা কোথায়? কে দিবে টাকা কৃষককে? খবরের কাগজের টাকা মানে বিজ্ঞাপনের আয়। কাগজ বিক্রির টাকায় কাগজ-কালির দামটা উঠে মাত্র। বিজ্ঞাপনের টাকা দিয়াই স্টাফ চালাইতে হয়। লাভও থাকে। কিন্তু কৃষক বিজ্ঞাপন পাইবে কেন? বিজ্ঞাপনদাতারা বড়-বড় ধনিক-বণিক শিল্প মালিক। কৃষক কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের সমর্থক। জমিদারি শিল্প-বাণিজ্য সমস্ত কায়েমি স্বার্থ জাতীয়করণ করিতে চায়। এই কৃষককে বিজ্ঞাপন দিয়া তারা শত্রু পুষিবে? হিন্দুরা বিজ্ঞাপন দেয় না কৃষক মুসলমান বলিয়া, মুসলমানরা দেয় না কৃষক হিন্দু-কংগ্রেস’, ঘেঁষা বলিয়া। বিপদের উপর বিপদ। কৃষক-প্রজা দলের একমাত্র মন্ত্রী মৌ. শামসুদ্দীন আহমদ সমিতির নির্দেশে মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করিয়াছেন। মন্ত্রিত্বের প্রভাব খাটাইয়া কিছু বিজ্ঞাপন ও অর্থ সাহায্য পাইব, সে আশায় ছাই পড়িয়াছে। সুভাষবাবুর সাহায্যে হিন্দু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কিছু কিছু বিজ্ঞাপন পাইব, সে গুড়ে বালি পড়ে। সুভাষবাবু মহাত্মাজীর সাথে ঝগড়া করিয়া কংগ্রেসের সভাপতিত্ব ত্যাগ করিয়াছেন। ধনিক-বণিকরা আসলে সকাজে চাদা দেয় না, তারা ভবিষ্যৎ মুনাফার আশায় টাকা খাটায়, ইনভেস্ট করে। অদূরে কংগ্রেস রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করিবে, এটা সকলের কাছেই সুস্পষ্ট। সেজন্য সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও ধনিকরা তলে-তলে কংগ্রেসকে। সাহায্য করিত। সুভাষবাবু প্রেসিডেন্ট থাকিলে তার ‘ছিটাফোঁটা’ কৃষকও পাইত। সে আশাও গেল। শেষ পর্যন্ত সুভাষবাবু দেশ ত্যাগ করিলে এদিককার কোনও আশাই আর থাকিল না।
