এরপর আমার জয়ের পালা। মওলানা মহীউদ্দিন মুসলমানদের পাঁচ লাখের মত টাকা হস্তগত করিয়া এলাহাবাদে ফিরিয়াই আর্য ধর্মে পুনঃ দীক্ষিত হইলেন এবং স্বামী সত্যদেব হইয়া গেলেন। শুধু তা-ই নয়। তিনি আমার অভিজ্ঞতা এই গোছের নাম দিয়া একটি বই লিখিলেন। তাতে তিনি বলিলেন, ইসলাম ও মুসলমান সমাজ সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লাভের জন্যই তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। কয়েক মাস মুসলমান থাকিয়া তিনি নিঃসন্দেহে বুঝিতে পারিয়াছেন যে ইসলামের মত অসভ্য ধর্ম ও মুসলমান সমাজের মত বর্বর ও ব্যভিচারী জাতি দুনিয়ায় আর নাই। অভ্যর্থনাওয়ালাদের মুখে চুনকালি পড়িল। আমার সমর্থকদের দন্ত বিকশিত হইল। কিন্তু বিজয়ানন্দের উল্লাসের বদলে নিজের হতভাগ্য নির্বোধ সমাজের জন্য আমার চোখে পানি আসিল।
.
৬. প্রথম পর্যায়ের সমাপ্তি
ইতিমধ্যে আমি উকালতি পাশ করিয়াছিলাম। যদিও মৌলবী সাহেব আমার বেতন বাড়াইয়া পঁয়ষট্টি হইতে পঁচাশি করিয়া দিয়াছিলেন, তবু ঐ টাকাও যথেষ্ট নয় মনে করিয়া আমি ময়মনসিংহে উকালতি করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করি। মৌলবী সাহেবের ন্যায় পিতৃতুল্য স্নেহময় মুরুব্বি এবং সাংবাদিক জীবন ছাড়িয়া আসিতে আমার খুবই কষ্ট হয়। তবু এটা করিলাম। কারণ ইতিমধ্যে একটি ছেলে হইয়াছে। বাড়ির অবস্থাও অধিকতর খারাপ হইয়াছে। বাপজী আরো দেনাগ্রস্ত হইয়াছেন। কাজেই বেশি টাকা রোযগারের আশায় সাংবাদিক জীবন ছাড়িলাম।
মৌলবী সাহেব আমার স্বার্থপরতায় নিশ্চয়ই মনে-মনে দুঃখিত হইয়াছিলেন। কারণ এই সময় তিনি দি মুসলমানকে দৈনিক করিবার চিন্তা করিতেছিলেন। এ কাজে তিনি আমার উপর অনেকখানি নির্ভরও করিতেছিলেন। তবু আমাকে বাধা দিলেন না। বরঞ্চ আইনের বই-পুস্তক কিনায় আমাকে সাহায্য করিলেন। আমার মত নগণ্য সাব-এডিটারকে নিজ ব্যয়ে এক ফেয়ারওয়েল পার্টি দিলেন। এই পার্টিতে স্যার আবদুর রহিম, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মৌ, আবদুল করিম, মৌ. আবুল কাসেম, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব মশাররফ হোসেন, মওলানা আকরম খাঁ, ডা. আবদুল্লা সোহরাওয়ার্দী, মৌ. এ কে ফজলুল হক, হাজী আবদুর রশিদ, মি. সৈয়দ নাসিম আলী, খান বাহাদুর আজিজুল হক, অধ্যাপক জে এল ব্যানার্জি, খান বাহাদুর আসাদুজ্জামান প্রভৃতি অনেক গণ্যমান্য লোক উপস্থিত ছিলেন। সকলের সামনে তিনি আমার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিলেন। উপসংহারে বলিলেন : উকালতিতে আবুল মনসুর নাম করুক, আল্লাহর দরগায় এই দোওয়া করিয়াও তাঁকে এই আশ্বাস দিতেছি যে, দি মুসলমান এর দরজা সর্বদাই তার জন্য ভোলা রহিল। যখনই সে মনে করিবে উকালতি তার ভাল লাগে না, তখনই দি মুসলমান-এ আসিতে পারিবে। আমার দৃঢ়বিশ্বাস মুসলিম সাংবাদিকতায় আবুল মনসুর যথেষ্ট দান করিতে পারিত। মৌলবী সাহেবের মতের উপর আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল। কাজেই তাঁর প্রশংসায় আমি গর্বিত হইলাম। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত বদলাইলাম না। ভাগ্যিস, তিনি আমাকে মত বদলাইবার হুকুম করেন নাই। তিনি যদি একবার বলিয়া ফেলিতেন : ‘তোমার যাওয়া হইবে না’ তবে আমার পক্ষে তাঁর আদেশ অমান্য করা সম্ভব হইত না। তিনি তা জানিতেন বলিয়াই তেমন কথা বলেন নাই। এইভাবে আমার সাংবাদিক জীবনের প্রথম পর্যায় শেষ হইল ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে।
অধ্যায় আঠার – দ্বিতীয় পর্যায়
১. ‘দৈনিক কৃষক’
আমার সাংবাদিক জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। এই সময় নিখিল-বঙ্গ-কৃষক-প্রজা সমিতির উদ্যোগে কৃষক প্রজা আন্দোলনের মুখপত্ররূপে দৈনিক কৃষক প্রকাশ করা সাব্যস্ত হয়। অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরকে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর এবং মৌ. শামসুদ্দীন আহমদ, মৌ. সৈয়দ নওশের আলী, নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলী, খান বাহাদুর মোহাম্মদ জান ও ডা. আর আহমদকে ডাইরেক্টর করিয়া একটি লিমিটেড কোম্পানি। রেজিস্ট্রারি হয়। আমাকে উহার প্রধান সম্পাদক নিয়োগ করাও তাঁরাই স্থির করেন। ডালহৌসি স্কোয়ারের নিকটবর্তী ৫ নং ম্যাংগো লেনে আফিস স্থাপিত হয়। নিজস্ব ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এত সব ঠিক করিয়া আমাকে হুকুম দেওয়া হয় সম্পাদক হও, চালাও কাগজ। সমিতির প্রস্তাব। বন্ধুদের অনুরোধ নয়, আদেশ। অমান্য করিতে পারিলাম না। পারিলাম না মানে কী? করিলাম না। নিজের মনেও বোধ হয় কুকুতানি ছিল। মাসিক দুইশ টাকা বেতন ও পঞ্চাশ টাকা সম্পাদক-এর টেবিল এলাউন্স পাওয়ার শর্তে আমি কৃষক-এর সম্পাদকতার দায়িত্ব গ্রহণ করিলাম। খাঁটিলাম খুব। অল্পদিনেই কাগজ সাংবাদিক মহলে সম্মান ও জনসাধারণের মধ্যে পপুলারিটি অর্জন। করিল। আদর্শ নিষ্ঠায় স্বাধীন মতবাদে এবং নিরপেক্ষ সমালোচনায় কৃষক বেশ নাম করিল।
কিছুদিন যাওয়ার পর আমি জানিতে পারিলাম তঙ্কালীন কংগ্রেস সভাপতি শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসু কৃষক-এর একজন পৃষ্ঠপোষক। আমি এতে বরঞ্চ খুশিই হইলাম। কংগ্রেসের অনেক মত ও কর্মপন্থার সাথে আমার মিল না থাকিলেও সুভাষবাবুকে আমি ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা করিতাম। কৃষক শ্রমিকদের প্রতি তাঁর দরদ, কৃষক-প্রজা আন্দোলনের প্রতি তার সমর্থন ও সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে তার উদারতা সবই আমার জানা ছিল। কাজেই সুভাষবাবুর মত একজন মুরুব্বি পাওয়ায় কৃষক-এর আর্থিক ও বাণিজ্যিক দিকে অনেকখানি সাহায্য হইবে, ইহা আমি মনে করিলাম। কৃষক-প্রজা সমিতির আদর্শের সাথে সংগতি রাখিয়া কংগ্রেসি রাজনীতিতে ও সুভাষবাবুকে পূর্ণ সমর্থন দিলাম। মহাত্মা গান্ধীর সহিত সুভাষবাবুর বিরোধ ও ত্রিপুরী কংগ্রেসের হট্টগোল আমরা প্রকাশ্যভাবে সুভাষবাবুর পক্ষ অবলম্বন করিলাম। কলিকাতার হিন্দুদের মধ্যে কৃষক বেশ পপুলার হইল।
