আমি নিজে যতই গোপন করিতে চেষ্টা করি না কেন, মুসলিম সাংবাদিক ও রাজনৈতিকদের কাছে ধরা পড়িয়া গেলাম। প্রধানত মোহাম্মদী আফিস হইতে এটা প্রকাশ হইয়া পড়িল। আবুল হাসানাত সাহেব চারিত্রিক সবলতার দরুন নিজেই তার বন্ধুমহলে এটা প্রকাশ করিয়া দিলেন। মোহাম্মদী আফিস হইতে এই সময় দৈনিক আজাদ বাহির হয়। প্রজা সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সেক্রেটারি মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সাহেব এই সময় মুসলিম লীগে যোগ দেন। ফলে মোহাম্মদী তথা আজাদ আফিস মুসলিম লীগ নেতা-কর্মীদের আড্ডায় পরিণত হয়। সেখান হইতে প্রায় সকল মুসলিম রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা যৌন-বিজ্ঞানের রচনায়। গোপন তথ্য জানিয়া ফেলিলেন। হিন্দু সাংবাদিক বন্ধুরা এবং কংগ্রেসি সহকর্মীরা এটা জানিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার মারফতে। কলিকাতার সব ইংরাজি, বাংলা দৈনিক পত্রিকায় সদ্য-প্রকাশিত ‘যৌন-বিজ্ঞানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা বাহির হয়। আনন্দবাজার পত্রিকার সমালোচক এক ডিগ্রি আগাইয়া যান। বিরাট আকারের সমালোচনা। তাতে অন্যান্য কথার সঙ্গে এ কথাও বলেন : “এই গ্রন্থের ভাষা পড়িয়া আমরা বুঝিলাম গ্রন্থকারকে আমরা চিনি। তিনি ছদ্মনামে এই বই লিখিয়াছেন। এই সময় আমার শ্রদ্ধেয় বন্ধু মি. সত্যেন্দ্র নাথ মজুমদার আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক। আমরা হিন্দু মুসলিম সাংবাদিকরা প্রায় সবাই তাকে সত্যেনদা বলিয়া ডাকিতাম। এই সময় আমি সাংবাদিকতা ছাড়িয়া দেওয়া সত্ত্বেও কলিকাতা সফরের সময় প্রায়ই আনন্দবাজার পত্রিকা আফিসে গিয়া সত্যেনদা’র সম্পাদকীয় রুমে আড্ডা দিতাম। যৌন-বিজ্ঞান বাহির হইবার পর একদিন আমি এমনি ধরনের আনন্দবাজার পত্রিকার আফিসে সত্যেনদার রুমে হাজির হইলে সত্যেনদা সমাগত বন্ধুদের (যাদের অনেকেই আমার পূর্বপরিচিত) উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন : বহুল প্রশংসিত যৌন-বিজ্ঞানের আসল গ্রন্থকারের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করাইয়া দিতেছি। সমবেত বন্ধুদের বিস্ময়-কৌতূহলের জবাবরূপেই যেন তিনি আমার রচনার বৈশিষ্ট্য, শব্দপ্রয়োগে নিজস্বতা, ভাষার সাবলীল তেজস্বিতা, স্টাইলের অনুকরণীয়তা ইত্যাদি তাঁরই নিজস্ব ভাষার গুণাবলি উদারভাবে আমার উপর আরোপ করিয়া আমার প্রাপ্যাধিক প্রশংসা করিলেন। এ ব্যাপারে সত্যেনদা সত্যই অতুলনীয়ভাবেই উদার ও মুক্ত-রসনা ছিলেন।
আবুল হাসানাত সাহেব তাঁর ‘যৌন-বিজ্ঞান’-কে পরবর্তীকালে আকারে অনেক বিশাল ও বিষয়-সম্ভারে আরো অনেক সমৃদ্ধিশালী করিয়াছেন। এসব কৃতিত্বপূর্ণ কাজে আমার কিছুমাত্র অবদান বা সহযোগিতা নাই। এ সবই তাঁর নিজস্ব কীর্তি। তিনি আগে হইতেই স্বাধীন চিন্তক ও শক্তিশালী লেখক ছিলেন। যৌন-বিজ্ঞানকে উন্নততর মানের গ্রন্থে পরিণত করা ছাড়াও এ সম্পর্কে আরো অনেক বই-পুস্তক লিখিয়া তিনি যশস্বী হইয়াছেন।
হয়ত গোড়ায় আমার প্রদর্শিত পন্থায় তিনি কিছুটা উপকৃত হইয়াছেন। কিন্তু আমি নিজে উপকৃত হইয়াছি অনেক বেশি। তার দেওয়া উল্লিখিত বিপুল সংখ্যক বই পড়িয়া আমার জীবন-দর্শনে প্রভূত প্রসারতার উন্মেষ হইয়াছে সে কথা আগেই বলিয়াছি। তাছাড়াও আবুল হাসানাত সাহেবের প্রদর্শিত পথে আরো অগ্রসর হইয়া কিছুদিনের মধ্যেই ফ্রয়েড ও ইয়ুংয়ের বই-পুস্তকের ও মনোবিকলনের সঙ্গে পরিচিত হই। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে মনোবিকাশের ফলে ফ্রয়েডিয়ান মতবাদের শুধু ভক্ত পাঠকই হই নাই, তার মতবাদের তীব্র সমালোচকও হইয়াছি।
সক্রিয় রাজনীতি ও উকালতি হইতে অবসর গ্রহণের পর বৃদ্ধ বয়সে নিজেই পরিবার পরিকল্পনা নামে যৌন-বিজ্ঞানের একখানা বইও লিখিয়া ফেলিয়াছি। তাতে আমি খাদ্যাভাব মোচনের প্রচলিত উদ্দেশ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের চেয়ে দম্পতি ও পরিবারের সুখ-শান্তির জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণকে উচ্চতর ও মহত্তর জীবন-বিধি রূপে প্রমাণ করিবার চেষ্টা করিয়াছি।
পঞ্চম খণ্ড
সাহিত্যিক জীবন (গরমামুলি)
অধ্যায় চৌদ্দ – গণভিত্তিক সাহিত্যিক মোড়
১. উৎপ্রেরণা-জাত জাতীয় চিন্তা
সাহিত্যকে জীবন-ভিত্তিক হইতে হইবে এ ধারণাটা আমার ছিল একরকম সহজাত। এটাকে উৎপ্রেরণা-ভিত্তিকও বলা যাইতে পারে। তবে সে জীবন যে গণজীবন হইতে হইবে, এ উপলব্ধি আসে আরো পরে। কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হইবে যে, গোড়ায় এর মধ্যে কোনও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। সাম্প্রদায়িক চেতনা ত ছিলই না। ছাত্রজীবনের গোড়া হইতেই আমি বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, রমেশ দত্ত, শরৎচন্দ্র প্রভৃতি কবি ঔপন্যাসিককে বাংলা সাহিত্যের দিকপাল মনে করিতাম, এবং এঁদের অনুসারী আরো শত-শত হিন্দু সাহিত্যিককে আমার অনুকরণযোগ্য আদর্শ ভাবিতাম। শ্রদ্ধার সঙ্গে অথবা মনোযোগে পড়িতামও। এই সব মনীষীর লেখায় কোনও মুসলমান চরিত্র নাই। বঙ্কিম-রমেশচন্দ্রের মত দুই-একজনের লেখায় যাও আছে, তা-ও ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ। এসব দেখিয়া মনে আফসোস হইত বটে, কিন্তু তাতেও কোনও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ দেখিতাম না। কাজেই আফসোস হইলেও রাগ হইত না।
বরঞ্চ মনে করিতাম, বলিতামও যে, মুসলমান সমাজে নাটক-নভেলের চরিত্র হইবার মত লোকই নাই। নারী-পুরুষের প্রেমই যখন নাটক নভেলের উপজীব্য তখন কড়া পর্দাপালক মুসলিম সমাজ লইয়া উপন্যাসই হইতে পারে না। শিশু-সুলভ এই সব চিন্তা-ধারণার যখন অবসান হইল, তখনও হিন্দু সাহিত্যিকদের মুসলিম-চরিত্রহীন বই-পুস্তককে ক্ষমার চক্ষেই দেখিয়া আসিতে থাকিলাম। লেখকদেরে কোনও দোষ দিতাম না। কারণ দোষটা ত আমাদের সমাজের, মানে আমাদের। নাহক অপরকে দোষ দিব কেন?
