.
২. সাহিত্য-জীবন
ছাত্র-জীবনের অবসানে এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির যে পরিবর্তন হয়, সেটা গোড়ায় ছিল রাজনৈতিক। সে রাজনীতিতেও সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। কারণ আমার রাজনৈতিক জীবনই শুরু হয় কংগ্রেসের মধ্য দিয়া। হিন্দু কংগ্রেস নেতাদের প্রশিক্ষণের অধীনে। রাজনৈতিক জীবনের প্রাইমারি স্তরেই ১৯২২ সালে আমি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কবি মোজাম্মেল হক সাহেবদ্বয়ের সম্পাদকতায় প্রকাশিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় ‘গোলামী সাহিত্য শীর্ষক প্রবন্ধ লিখি। এই প্রবন্ধে গোটা বাংলা সাহিত্যকেই বিশেষত রবীন্দ্র শরৎচন্দ্রকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করি। সমালোচনা ত নয়, একেবারে নিন্দা। সে নিন্দায় অজ্ঞানতা, সাহিত্য সমালোচনায় অনধিকার, যতই থাকুক। তাতে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। সাহিত্যিক সাম্প্রদায়িকতা মানে এখানে রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার মত অবিচার বোধ নয়। এখানে সাম্প্রদায়িকতা মানে হিন্দু-মুসলিম স্বাতন্ত্র্য বোধ। গোলামী সাহিত্যে আমি গোটা বাঙ্গালী জাতির পক্ষ হইতেই কথা বলিবার চেষ্টা করিয়াছি। গোটা বাঙ্গালী জাতির স্বার্থের দিক হইতেই তৎকালীন সাহিত্যকে গোলামী সাহিত্য বলিয়াছি। বঙ্কিম-মাইকেল তত দিনে উনিশ শতকের ইউরোপীয় নব-জাগরণের বাণীই বাঙ্গালী জীবনে সাহিত্যের মাধ্যমে প্রচারের পথনির্দেশ করিয়াছেন। তাদেরই প্রদর্শিত পথে চলিয়া রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র বাংলা সাহিত্যকে সত্য-সত্যই আধুনিক সাহিত্যে রূপান্তরিত করিয়া চলিয়াছেন। বস্তুত বাংলা সাহিত্যের ‘স্বর্ণযুগ তখন আরম্ভ হইয়াছে।
কিন্তু আমার মত তরুণের মনে অতবড় উপলব্ধি কোনও নাড়া দেয় নাই। আমার চোখে পড়িয়াছিল শুধু এই একটা দিক : বঙ্কিম-মাইকেল যা লিখিয়া গিয়াছেন, রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র যা লিখিতেছেন এবং এ দুই শক্তিধরের অনুকরণে বাঙ্গালী সাহিত্য-সাধকরা যা লিখিতেছেন, তার সাথে বাঙ্গলার বাস্তব জীবনের কোনও মিল নাই। ইংরাজ-ফরাসি সাহিত্যিকদের অনুকরণে আমাদের সাহিত্যিকরা বাংলা ভাষায় বাঙ্গালী নামে কতকগুলি ইংরাজ ফরাসি চরিত্রের কাহিনী লিখিতেছেন। আমার বিবেচনায় পৌনে দুইশ বছরের বিদেশি প্রভাবে রাজনীতির দিক হইতে আমরা যেমন ইংরাজের গোলাম হইয়া গিয়াছি, শিল্প-সাহিত্য-কৃষ্টির ক্ষেত্রে তেমনি আমরা ইংরাজের গোলাম হইয়া গিয়াছি। এটা অবশ্য অংশত আমার তকালীন রাজনৈতিক ভাবাবেগেরই ফল। কংগ্রেসের অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের দ্বারা ভারতের অন্যান্য তরুণদের মতই আমিও বিপুলভাবে প্রভাবিত হইয়াছিলাম। কিন্তু সে কারণে সাহিত্য সম্বন্ধে আমার ঐ মতবাদের মধ্যে কোনও সাম্প্রদায়িক বা আঞ্চলিক সংকীর্ণতা ছিল না। বরঞ্চ জাতীয় সাহিত্যের প্রাণ ও রূপ সম্পর্কে একটা ধারণা প্রকাশের প্রয়াস ছিল। কেউ-কেউ তা স্বীকারও করিয়াছিলেন দেখিয়া আমি উৎসাহিতও হইয়াছিলাম। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কলিকাতার সাহিত্যিক মহলে আমার এই প্রবন্ধে প্রকাশিত আমার মতবাদকে ধৃষ্টতা বলিয়া বিরূপ সমালোচনা করা হইলেও বরিশাল হিতৈষীর সম্পাদক খ্যাতনামা কংগ্রেস নেতা শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র ঘোষ তাঁর কাগজের সম্পাদকীয়তে আমার প্রবন্ধের সত্যভাষণের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়াছিলেন এবং একজন অখ্যাতনামা সাহিত্যে-নবাগত’কে অভিনন্দন জানাইয়াছিলেন। এই মতবাদ যে আমার ক্ষণস্থায়ী ভাবাবেগ ছিল না, তার প্রমাণ এই যে পরবর্তীকালের বিভিন্ন সময়ে আমি একাধিক লেখায় এই একই কথা বলিয়া ও লিখিয়াছিলাম। তার মধ্যে ১৯৩২-৩৩ সালের সওগাত-এ ‘সাহিত্য ও যুগ-ধর্ম ও ১৯৪১ ৪২ সালে অধ্যাপক হুমায়ুন কবির-সম্পাদিত চতুরঙ্গ-এ ‘সাহিত্যিকের দৃষ্টিতে রাজনীতি’ শীর্ষক দুইটি বিতণ্ডামূলক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম। তাতে মোটামুটি ঐ একই কথা বলিয়াছিলাম বিভিন্ন যুক্তি-তর্কের অবতারণা করিয়া।
.
৩. খণ্ডতার সংগত কারণ
এই সব বিতর্কমূলক প্রবন্ধে আমি তৎকালীন সাহিত্যিক নেতৃত্বের সমালোচনামূলক অনেক কথা বলিয়াছি বটে, কিন্তু সে সব আপত্তিকর কথার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। ঐ সব সাহিত্যিক সমস্যার মধ্যে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের স্বার্থের কোনও বিরোধ আছে, তেমন কোনও কথা আমি প্রকারান্তরেও বলি নাই। কারণ এ সম্পর্কে আমার কোনও চেতনাই তখনও জন্মে নাই। সামাজিক আচার-আচরণে মুসলমানদের প্রতি হিন্দুদের ব্যবহারে ছেলেবেলা হইতেই আমি ঘোরতর অসন্তুষ্ট ছিলাম। কিন্তু ওটাকেই হিন্দুদের সামাজিক কুসংস্কার, তার মানে তাদের দুর্বলতা মনে করিতাম। ওতে আমার মনে মুসলমানদের কোনও ইনফিরিওরিটি বা হিন্দুদের কোনও সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স ছিল না। তবু সামাজিক ব্যবসায় হিন্দু ও মুসলমানের স্বাতন্ত্র সম্বন্ধে ছেলেবেলা হইতেই একটা ধারণা হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু হিন্দুদের প্রতি সাধারণভাবে আমার কোনও বিদ্বেষ বা ঘৃণা ছিল না। হিন্দু শিক্ষক-অধ্যাপকদের ও বহু গুরুজনের প্রতি আমার সীমাহীন ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালবাসা ছিল। আজও আছে। ঐ ধরনের স্বাতন্ত্রের চিন্তা ভাবনা আমার সামাজিক চিন্তা-ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমার চিন্তা-ধারায় এই প্রকার কোনও ভাবনাই আমাকে স্পর্শ করিত না। রাজনীতিতে আমি ছিলাম জাতীয়তাবাদী ও কংগ্রেসি। সে কারণেও আমার সাহিত্য-চিন্তায় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবেশ না করিয়া থাকিতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য এই যে বয়স ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম সামাজিক স্বাতন্ত্র-চিন্তা আমার মনে আসে রাজনীতি ক্ষেত্রের আগে সাহিত্যক্ষেত্রে। কংগ্রেসি হিসাবে আমি যখন প্রজা-আন্দোলনে প্রবেশ করি, তখন প্রায় সকল হিন্দু কংগ্রেস-নেতাই তার বিরুদ্ধাচরণ করেন। প্রজা-আন্দোলনের বহু মুসলিম সহকর্মী এটাকে হিন্দুদের সাম্প্রদায়িকতা বলিতেন। কিন্তু আমি তা বলিতাম না। সাম্প্রদায়িকতার বদলে এটাকে আমি ভেস্টেড ইন্টারেস্টের স্বার্থপরতা বলিতাম। হিন্দু-জমিদার মহাজনদের দ্বারা হিন্দু মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত সম্প্রদায় সাধারণভাবে উপকৃত হইতেছেন বলিয়া কৃষক-প্রজা-খাতক আন্দোলনে তারা সাধারণভাবে যোগ দিতেছেন না, এই যুক্তিতে এ ক্ষেত্রেও হিন্দুদের সাম্প্রদায়িকতা অভিযোগ হইতে রেহাই দিতাম।
