এসব পুস্তক ছাড়া দুই-একখানা সর্বাধুনিক যৌন-বিজ্ঞানের বইও তিনি নিজে বিদেশ হইতে খরিদ করিলেন। এইসব বইয়ে দীর্ঘ চার মাস কাল আমি এমন ডুবিয়াছিলাম যে, এই চার মাস কেমন করিয়া কাটিয়া গেল, আমি যেন তার টেরই পাইলাম না। এই সব বই পড়িয়া আমি সম্পূর্ণ নূতন জ্ঞান লাভ করিলাম। সাধারণভাবে জীবন-দর্শন বিশেষভাবে যৌন-জীবন সম্পর্কে আমার ধ্যান-ধারণা বহু পরিবর্তন হইল। অতিশয়োক্তি না করিয়াও বলা যায়, আমি যেন জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকে একদম অন্ধকার হইতে আলোর রাজ্যে চলিয়া আসিলাম।
ফলে যে কাজ শুরু করিয়াছিলাম অনিচ্ছা ও অভক্তি লইয়া নিতান্ত আর্থিক টানে বাধ্য হইয়া, সেই কাজই শেষ করিলাম স্বেচ্ছায়, সশ্রদ্ধভাবে এবং বিপুল জ্ঞান ও আনন্দ-উৎসাহের মধ্য দিয়া। মানসিক এই পরিবর্তনে দেহে ও হাতে এমন শক্তি ও উদ্যম আসিল যে দেড়শ বইয়ের সারমর্ম পাঁচশ পৃষ্ঠার একটি বইয়ে জমাট বাঁধাইলাম বিনা আয়াসে দুই মাস সময়ে। লেখাটাও এমন প্রাণবন্ত, জোরালো, যুক্তিপূর্ণ ও শালীন ভাষায় রচিত হইল যে, যিনি এই বইয়ের জন্য ছয় মাসে আমাকে ছয় হাজারের বেশি টাকা দিলেন, তিনি পুস্তকের ভূমিকার একাংশ পড়িয়াই আর পড়িলেন না। সোজা ছাপার ব্যবস্থা করিলেন। মধ্যস্থ বন্ধুদ্বয় সিরাজুল ইসলাম ও নবাবদা পড়িতে বা শুনিতেও চাহিলেন না। বলিলেন : আমরা জানিতাম মনসুর সাব যা লিখিবেন, তাই শ্রেষ্ঠ হইবে। পড়িয়া দেখিতে হইবে কেন?
বড়াই-অহংকার না করিয়াও বলা যায় যে চল্লিশ বছর আগে, তকালীন সমাজ-চিন্তার স্তরে ও জনমতের সেই পরিবেশে যৌন-বিজ্ঞানের প্রথম বাংলা গ্রন্থটি সত্যই ভাল হইয়াছিল। তার প্রমাণ এই যে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের মত চিরকুমার ব্রহ্মচারী-বিজ্ঞানী-দর্শনী এই পুস্তকটিকে ‘যৌন-সংহিতা’ বলিয়া অভিনন্দিত করিয়াছিলেন। তাছাড়া ডা. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, ডা. গিরিন্দ্র চন্দ্র দে প্রভৃতি বিশেষ-বিশেষ দৃঢ় মতবাদী পণ্ডিত ব্যক্তিগণও এই পুস্তকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়াছেন। কলিকাতার সকল মত, শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের দৈনিক, সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ও মাসিকাদি সাহিত্য-পত্র যেভাবে এই তথাকথিত অশ্লীল বিষয়ে লেখা পুস্তকের প্রশংসা করিয়াছেন ও এর প্রকাশককে অভিনন্দন জানাইয়াছেন, তাতে বলা যায়, বইটি সকল দিক দিয়াই সুলিখিত হইয়াছিল।
বইটি ছাপিতে দেওয়া হইয়াছিল কলিকাতা মোহাম্মদী প্রেসে। মোহাম্মদী প্রেসের সব প্রবীণ ও প্রধান কম্পোযিটররাই দীর্ঘদিনের পরিচিতির ফলে আমার হাতের লেখা চিনিতেন। প্রেসে যাওয়া-মাত্র তারা ধরিয়া নিলেন ওটা আমার বই। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ও উপরওয়ালাদের কাছে খবর দেওয়ার সময় তারা ওটাকে ‘মনসুর সাহেবের বই’ বলিয়াই উল্লেখ করিতেন। এ সব কথা আমাকে বলিলেন আবুল হাসানাত সাহেব নিজেই। তিনি এ সব খবর আমাকে দিলেন আমাকে তাঁর বইয়ের একটা প্রুফ দেখিতে অনুরোধ করিয়া। তিনি নিজেই ছুটি লইয়া কলিকাতা থাকিয়া আসিয়াছেন। কিন্তু প্রফ দেখায় তিনি তখনও উস্তাদ নন। খুব ভাল প্রুফরিডার তিনি রাখিয়াছেন সত্য, কিন্তু তাদের দিয়া বিশ্বাস পাইতেছেন না। আমি ত কৃষক-প্রজা সমিতির কাজে ঘন-ঘন কলিকাতা গিয়াই থাকি; এ কাজে কিছুদিন বেশি করিয়া থাকিয়া-থাকিয়া এক-একটা ফাইনাল প্রুফ দেখিয়া দিলে খুব ভাল হয়। সেজন্য তিনি আমাকে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দিবেন। ততদিনে ১৯৩৫ সাল পার হইয়া ‘৩৬ সালে পড়িয়াছে। আসন্ন নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টি কনটেস্ট করিবে। এই উপলক্ষে সত্যই আমাকে ঘন-ঘন কলিকাতা যাতায়াত করিতে হইতেছিল। তাছাড়া নিজের লেখা ছাপার সময়ে প্রুফ দেখার আগ্রহ আমার বরাবরের। নিজের লেখাটা, তা যার নামেই প্রকাশ হউক না কেন, ভুল ছাপান হইলে আমার মনে অসহনীয় কষ্ট হইত। কাজেই আমি রাজি হইলাম। সপ্তাহ-পনের দিনে কলিকাতা যাতায়াত করা, সেখানে থাকা-খাওয়া আমার ব্যবসায়িক লোকসান ইত্যাদি সাকুল্য বিষয় বিবেচনা করিয়া তিনি আমাকে এবারেও যথেষ্ট টাকা দিলেন। আমাকে প্রুফরিডার পাইয়া প্রেসও কাজে জোর দিল। ত্রিশ-বত্রিশ ফর্মার বই দুই মাসে ছাপা হইয়া গেল। ছাপা শেষ হইয়া আসিতে থাকায় আবুল হাসানাত সাহেব আমাকে আরেক বিপদে ফেলিলেন। তিনি আমাকে তার বইয়ের কো-অথার রূপে নাম দিতে চাপিয়া ধরিলেন। আমার মধ্যস্থ বন্ধুদ্বয়ও সে অনুরোধে যোগ দিলেন। কিন্তু এবার আমি দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করিলাম। দুই কারণে। এক, আমি তখনও পাক্কা কংগ্রেসি। অধিকাংশ কৃষক-প্রজা নেতা-কর্মীও তাই। জিলার পুলিশ সুপারের সাথে বইয়ের কো-অথার রূপে নাম ছাপা হইলে সহকর্মী ও কংগ্রেসি সার্কেলে আমার বদনামের সীমা থাকিবে না, এ ভয়ে আতঙ্কিত হইলাম। দুই, আমি নিজে ততদিনে যৌন-বিজ্ঞানকে একটি সুষ্ঠু-শালীন বিজ্ঞান বলিয়া মানিয়া লইয়াছি বটে, কিন্তু আমাদের দেশের পাবলিক তখনও ওটাকে অশ্লীল কুকর্ম বলিয়াই জানিত। সরকারি অফিসাররা বিশেষত একজন পুলিশ অফিসার অনায়াসে জনমত অগ্রাহ্য করিয়া চলিতে পারেন। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর পক্ষে ওটা সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যস্থ বন্ধুদ্বয়কে। উভয় আপত্তিই জানাইলাম বটে, কিন্তু আবুল হাসানাত সাহেবকে শুধু দ্বিতীয় আপত্তির কথাই জানাইলাম। আবুল হাসানাত সাহেব অগত্যা আমাকে কো অথার করার অভিপ্রায় ত্যাগ করিলেন। কিন্তু নিজে একটি সংক্ষিপ্ত ‘গ্রন্থকারের নিবেদন’ লিখিয়া তাতে বলিলেন, ‘সুসাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ’ এই গ্রন্থ রচনায় আমাকে বিশেষ সহায়তা করিয়াছেন।
