১৯৩৮ সালে সাংবাদিকতা করিতে আবার কলিকাতা যাই। সেখানে একটানা ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বার বছর বাস করি। এই সময়কার লেখা আমার গল্পগুলি ফুড কনফারেন্স-এ এবং দুই-একটা আসমানী পর্দা ও গালিভারের সফরনামাতেও ছাপা হইয়াছে। আমার সত্য-মিথ্যা নভেলও এই মুদ্দতেই লেখা হয়। যদিও এসব পুস্তক আরো পরে ঢাকা আসার বাদে ছাপা হইয়াছে। ছোটদের কাছাছুল আম্বিয়াও এ সময়ে লেখা, কিন্তু পরে ছাপা হইয়াছে।
১৯৫০ সাল হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত মুদ্দতে আমার জীবন ক্ষুধা, সত্য মিথ্যা, আবে হায়াত ইত্যাদি নভেল, আসমানী পর্দা, গালিভারের সফরনামা ইত্যাদি গল্পগ্রন্থ ও পাক-বাংলার কালচার (বর্তমান বাংলাদেশের কালচার) ও পরিবার পরিকল্পনা নামক সন্দর্ভ পুস্তক, আল-কোরআনের নসিহত নামে সিলেকশন অনুবাদ গ্রন্থও এই মুদ্দতেই বাহির হইয়াছে। এই মুদ্দতেই আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, শেরে বাংলা হইতে বঙ্গবন্ধু ও এন্ড অব এ বিট্রেয়াল (ইংরাজি) ইত্যাদি রাজনৈতিক গ্রন্থসমূহ প্রকাশিত হইয়াছে।
ময়মনসিংহ উকালতি জীবনে (১৯২৯-১৯৩৮) আমার সাহিত্য-সাধনার বিষয়বস্তুর মধ্যে অভিনবত্ব আসিয়াছিল দুই দিক হইতে : একটি স্বভাবের টানে; অপরটি অভাবের টানে। নিতান্ত দৈবাৎ। প্রথমটি আমার পাঠ্য-পুস্তক লেখা। এটি ঘটে এই ভাবে। কলিকাতার সদাব্যস্ত সাংবাদিক জীবন হইতে এই প্রথম আসিয়াছি মফস্বল শহর ময়মনসিংহের উকালতি জীবনে। নূতন উকিল। কাজ কম। অবসর প্রচুর। আনন্দ মোহন কলেজের আরবি-ফারসির দ্বিতীয় অধ্যাপক মৌ. আসাদুজ্জমান সাহেব এই শহরেরই ফিরোয় লাইব্রেরি’র মালিক। তিনি আমাকে ধরিলেন শিশু পাঠ্য-পুস্তক লিখিতে। তার অনুরোধে নয়া পড়া নামে চার খণ্ডের একটি পাঠ্য-পুস্তক লিখিলাম। মকতবের ১ম, ২য় ও ৪র্থ শ্রেণীর জন্য পুস্তক চারটি কমপালসারি পাঠ্য-পুস্তক নির্বাচিত হইল। চার বছর পাঠ্য থাকিল। প্রচুর বিক্রি হইল। আমার বেশ অর্থাগম হইল। নূতন উকিলের প্র্যাকটিসের স্বল্পতাহেতু অর্থাভাব এতে পোষাইয়া গেল। এ সম্বন্ধে অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা হইয়াছে। অতএব এখানে এ বিষয়ে আর কিছু লিখিলাম না।
.
১৫. অভিনব বিষয়বস্তু
দ্বিতীয়টা, আমার জীবনে প্রথম যৌনবিজ্ঞানের পুস্তক রচনা। এটি ঘটে এইভাবে। আমার ছাত্রজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম পরে খান বাহাদুর এই সময়ে ময়মনসিংহে মুনসেফ। নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলী এই সময়ে এই শহরে তাঁর নিজস্ব প্রাসাদ হাসান মনজিলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করিয়াছেন। আমার সাথে রাজনীতি করিবার উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছেন। আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছি। সিরাজুল ইসলাম সাহেব ও নবাব্যাদা ঘন-ঘন আমার বাসায় যাতায়াত করেন। আমার স্ত্রী এই সময়ে (১৯৩৫ সালে) তৃতীয় পুত্র মতলুব আনামকে প্রসব করিয়াই টাইফয়েড জ্বরে ঘোরতর অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছেন। তাঁর খোঁজখবর করিতে তারা আরো বেশি ঘন-ঘন আসিতে বাধ্য হন। কারণ আমি এ সময়ে কোর্টে খুবই কম যাইতে পারিতাম। এমনি দিনে তারা দুইজনই এক সঙ্গে এ জিলার এডিশনাল এসপি মি. আবুল হাসানাত মোহাম্মদ ইসমাইলের সাথে আমার পরিচয় করাইয়া দেন। তাদের প্রস্তাব : আবুল হাসানাত সাহেব উদীয়মান সাহিত্যিক। তিনি একটি পুস্তক রচনা করিয়াছেন। আমাকে পুস্তকখানা সংশোধন করিয়া দিতে হইবে। এসপি সাহেব আমাকে যথেষ্ট পারিশ্রমিক দিবেন। আমার বর্তমান অসুবিধা ও অভাবের মধ্যে এতে আমার খুবই উপকার হইবে।
আমি রাজি হইলাম। আবুল হাসানাত সাহেব তার লেখা যে পাণ্ডুলিপিটি আমাকে দিলেন, সেটি একটি যৌন পুস্তক। কলিকাতার আন্ডার ওয়ার্ল্ড বাজারে এই ধরনের পুস্তকের গোপন বিক্রির কথা আমি কিছু-কিছু জানিতাম। এই ধরনের অশ্লীল পুস্তক রচনাকে আমি পাপ ও অপরাধ মনে করিতাম। কাজেই এসপি সাহেবের এ কাজে সহায়তা করিতে আমি অস্বীকার করিলাম। এসপি সাহেব তখন আমাকে বুঝাইলেন, অশ্লীল যৌন রচনা তার উদ্দেশ্য নয়। তিনি পশ্চিমী সভ্য জগতে প্রচলিত বিজ্ঞানের সাহিত্যই রচনা করিতে চান। এই ধরনের কোনও পুস্তক আমি পড়ি নাই, জানিতে পারিয়া তিনি অবাক হইলেন এবং কিছু কিছু পুস্তক আমাকে দিতে লাগিলেন। এইভাবে তিনি আমাকে হ্যাভলক এলিস, ফোরেল এবং মেরিস্টোপস প্রভৃতির বেশ কিছু বই পড়িতে দিলেন। ফলে এই ধরনের পুস্তক রচনায় এসপি সাহেবকে সহায়তা করিতে রাজি হইলাম। জনাব সিরাজুল ইসলাম ও নবাব্যাদার মধ্যস্থতায় আমার পক্ষে সুবিধাজনক আর্থিক চুক্তি হইয়া গেল। এসপি সাহেব আমার স্ত্রীর চিকিৎসা খরচা বাবত বেশ কিছু টাকা অগ্রিম দিলেন। ঔষধের দামের সব বিল তাঁর কাছে পাঠাইবার জন্য ঔষধের দোকানদারকে বলিয়া দিলেন। আমি কোর্টে যাওয়া প্রায় একদম বন্ধ করিয়া দিয়া রুগ্ণ স্ত্রীর শুশ্রূষায় ও যৌন বিজ্ঞানের বিশাল বিশাল পুস্তক পড়ায় লাগিলাম। আমার স্ত্রীর অসুখ সারিতে চার মাস লাগিয়াছিল। সম্পূর্ণ সুস্থ হইতে আরো দুই মাস লাগিয়াছিল। প্রথম চার মাস আমি শুধু পড়িলাম ও নোট করিলাম। পরের দুই মাস আমি অবিরাম লিখিয়া গেলাম। চার মাসে আমি মোট ১৪৩ খানা যৌন বিজ্ঞানের বই পড়া শেষ করিয়াছিলাম। এর মধ্যে চল্লিশখানার বেশি বড়-বড় বই। আর শত খানেকের বেশি চটি বই। এর প্রায় সবাই এসপি সাহেব এ জিলার চার-পাঁচটি বড়-বড় জমিদার বাড়ির লাইব্রেরি হইতে যোগাড় করিয়াছিলেন। এঁদের মধ্যে ময়মনসিংহের ও সুশুঙ্গের মহারাজা, মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের রাজা, শেরপুর ও আঠারবাড়ির জমিদারদের লাইব্রেরিই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজা-জমিদাররা এইসব পুস্তক লাইব্রেরি হইতে বাহিরে যাইতে কখনও দিতেন না। কিন্তু একজন এসপির অসাধ্য তৎকালে কিছুই ছিল না।
