নবাব সাহেব আমার দিকে আর না চাহিয়া প্রাইভেট সেক্রেটারিকে একটা পাঁচ শ টাকার চেক লিখিয়া আনিতে বলিলেন। চেক আসিলে তিনি তাতে সই করিয়া আমার দিকে ঠেলিয়া দিলেন। আমিও একটা রসিদ লিখিয়া একটানে ছিঁড়িয়া তাঁর দিকে ঠেলিয়া দিলাম। খুব নুইয়া একটা ‘আদব আরয’ করিয়া বিদায় হইলাম। দুইদিন পরে আমার মনিব মৌ. মুজিবর রহমানের কাছে। নবাব সাহেব বলিয়াছিলেন : ‘আপনার ঐ আবুল মনসুরটা একটা মস্তবড় বেয়াড়া লোক। সে আমাকে সেদিন অফিসারদের সামনে কি বেকায়দায়ই না ফেলিয়াছিল।’ সমস্ত ঘটনা শুনিয়া মৌলবী সাহেব হাসিয়া বলিয়াছিলেন : ‘ছেলেটা অমন বেয়াড়াই বটে।’
.
১৩. চাঁদা দান
দ্বিতীয় ঘটনাটা হক সাহেবের সঙ্গে। বাড়িওয়ালা কর্পোরেশনের বকেয়া ট্যাক্স না দেওয়ায় সেবার আমাদের সমিতি অফিস, লাইব্রেরির বই-পুস্তক, আলমারি ও টেবিল-চেয়ার ক্রোক হইয়াছিল। তিন দিন সময় নিয়াছিলাম। সে তিন দিনের শেষ দিন। সেদিন টাকা শোধ না করিলে পরদিন সকালে নিলাম হইবে। মোট দেনা সাড়ে তিনশ টাকা। সম্পাদকমণ্ডলী আড়াই দিন ঘুরিয়া নবাব, জমিদার, ব্যারিস্টার, উকিল, মার্চেন্ট প্রভৃতি বিরাট ধনী লোকের নিকট হইতে মাত্র পঞ্চাশ টাকার মত চাঁদা তুলিতে পারিয়াছি। তৃতীয় দিনের বেলা তিনটা পর্যন্ত বিনা গোসল-খাওয়ায় তিন-চার-বন্ধু নিতান্ত নিরাশ হইয়া ক্ষুধা ক্লান্ত দেহে বাসায় ফিরিতেছি। পথে মৌলবী ফজলুল হকের বাসা। বাসার সামনে গিয়া হঠাৎ একজন বলিয়া ফেলিলেন : হক সাহেবের কাছে একবার গেলে হয় না? কিন্তু আমরা কথাটায় আমল দিলাম না। আমরা সবাই হক সাহেবের ভক্ত বটে, কিন্তু তাঁর ওটা চরম দারিদ্র্যের সময়। কাবুলী মহাজনের তাগাদায় তিনি রাস্তায় বাহির হইতে পারেন না। তার ভাঙ্গা ফোর্ড মোটরের হেডলাইট, সাইড লাইট কিছুই না থাকায় দুই দিকে দুইটা হ্যারিকেন বাঁধিয়া রাত্রে রাস্তায় বাহির হন। হাইকোর্টে প্রায় যানই না। শুধু মফস্বলে প্র্যাকটিস করেন। তার বাসার অদূরেই একটা মেসে আমরা থাকি। কাজেই এসবই আমাদের জানা কথা। হক সাহেবকে ঋণমুক্ত করিবার জন্য পাবলিকের কাছে অর্থ সাহায্য চাহিয়া কিছুদিন আগে ইয়াকুব আলী চৌধুরী সাহেবের নেতৃত্বে আমরা আবেদনপত্র ছাপিয়া বিলি করিয়াছি। এমন বিপন্ন হক সাহেবের কাছে চাঁদা চাইতে যাওয়া কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ামাত্র। কিন্তু ঐ বন্ধু জিদ করিলেন : হক সাহেব সমিতির অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট। চাঁদা চাই আর না চাই, সমিতির বর্তমান বিপদটা তাকে জানান আমাদের কর্তব্য।
এ যুক্তির জবাব ছিল না। কাজেই আমরা হক সাহেবের বৈঠকখানায় ঢুকিলাম। দেখিলাম তিনি একজন মাত্র মওক্কেল লইয়া বসিয়া আছেন। আমরা সবিস্তারে সব কথা তাঁকে বলিলাম। তিনি মাথা চুলকাইলেন এবং মওক্কেলটির দিকে চাহিয়া বলিলেন : বেশ আমি যাইব। বায়নার টাকা ফেলেন। লুঙ্গি-পরা সাদাসিধা বুড়া মানুষ। জলপাইগুড়ির এক কেসে হক সাহেবকে জলপাইগুড়ি নিতে আসিয়াছেন। হক সাহেবের আদেশে তিনি টেবিলের উপর পাঁচশ টাকা রাখিয়া বলিলেন : এটা বায়না। টিকিট আমি কিনিব। বাকিটা জলপাইগুড়িতে দিব।
হক সাহেব আমাদের দিকে চাহিয়া বলিলেন : তোমাদের দরকার কত?
আমাদের দরকার তিনশ। কিন্তু মোটে পাঁচশ টাকার মধ্যে তিনশ টাকা চাহিতে আমাদের জিভ আড়ষ্ট হইয়া আসিল। আমাদের সংকোচ দেখিয়া হক সাহেব নিজেই হিসাব করিয়া দুইশ টাকা নিজের ড্রয়ার টানিয়া বাকি তিনশ আমাদের দিকে ঠেলিয়া দিলেন। স্তম্ভিত আমরা কম্পিত হস্তে টাকা তুলিয়া নির্বাক সালাম দিয়া বাহির হইয়া আসিলাম।
.
১৪. সাহিত্য-জীবনের মুদ্দত ভাগ
প্রকাশিত পুস্তকগুলির রচনাকালের দিক হইতে আমার সাহিত্যিক জীবনকে চারটি মুদ্দতে ভাগ করা যায়। প্রথম মুদ্দত কলিকাতা-জীবন ১৯২২ হইতে ১৯২৯। দ্বিতীয় মুদ্দত, ময়মনসিংহ-জীবন ১৯৩০ হইতে ১৯৩৮। ১৯৩৮ হইতে ১৯৫০ পর্যন্ত আবার কলিকাতা-জীবন আমার সাহিত্যিক জীবনের তৃতীয় মুদ্দত। ১৯৫০ সাল হইতে আজ পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহের জীবন। আমার চতুর্থ মুদ্দত। পূর্বেকার মুদ্দতে ছাত্রজীবনে আমি যেসব প্রবন্ধ আল এসলাম-এ এবং যেসব গল্প সওগাত-এ লিখিয়াছিলাম, তা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় নাই বলিয়া এই চার মুদ্দতে সেটা পড়ে না।
১৯২২ হইতে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত এই আট বছরে আমি যেসব গল্প লিখিয়াছিলাম এবং সওগাত-এ প্রকাশিত হইয়াছিল তার প্রায় সবগুলি আয়নায় ছাপা হইয়াছে। কাছাছুল আম্বিয়ার কিচ্ছাগুলি শিশুদের জন্য লিখিত মুসলমানী কথাও এই মুদ্দতেই লেখা। সেটিও পুস্তকাকারে বাহির হইয়াছিল এই মুদ্দতেই আয়না প্রকাশের আগেই। এই মুদ্দতের লেখা আমার গোলামী সাহিত্য ও সভ্যতায় দ্বৈতশাসন ইত্যাদি বিতণ্ডামূলক প্রবন্ধগুলি তৎকালে খুবই আলোড়ন সৃষ্টি করিয়াছিল বটে, তবে সেগুলি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় নাই। এই মুদ্দতে সওগাত-এ যেসব প্রবন্ধাদি ছাপা হইয়াছিল, সেগুলিরও সংগ্রহ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় নাই।
১৯২৯ সালের শেষ দিকে সাংবাদিকতা ও কলিকাতা ছাড়িয়া উকালতি করিতে আমি ময়মনসিংহ শহরে আসি এবং ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত এখানে থাকি। এই সময়ে সওগাত আমি সাহিত্য ও যুগ-ধর্ম’, ‘মুসলমান সমাজে আনন্দ ইত্যাদি যেসব সাহিত্যিক-সামাজিক প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম সেগুলিও পুস্তকাকারে ছাপা হয় নাই। কিন্তু এই মুদ্দতে আমার জীবন ক্ষুধা নামক বিশাল আকারের নভেলটি সওগাত-এ ক্রমশ প্রকাশিত হইতে শুরু হয়। প্রতিমাসে বাহির হইয়াও চার বছরে শেষ হয়। আমার আয়নাও পুস্তকাকারে এই মুদ্দতেই প্রথম প্রকাশিত হয়।
