১৯২৬ হইতে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত চার বছর কাল আমি সওগাত-এর সম্পাদকের দফতর লেখায় সাহায্য করি। ঐ সাথেই আমার আয়নার গল্পগুলিও সওগাত-এ বাহির হয়। এই সময় সওগাত আফিস তৎকালীন প্রগতিবাদী সমস্ত মুসলিম সাহিত্যিকদের আড্ডা ছিল। ঐ আড্ডাতে আমরা সওগাত ক্লাব’ বলিতাম। নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ইয়াকুব আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, হবিবুল্লাহ বাহার, কবি মঈনুদ্দীন, কবি ফজলুর রহমান, কবি বেনীর আহমদ, কবি মহিউদ্দিন প্রভৃতি সমস্ত সাহিত্যিকদেরই সওগাত আফিসের আড্ডায় যাতায়াত ছিল। কাজী আবদুল ওয়াদুদ ও অধ্যাপক আবুল হুসেন সাহেবরা তৎকালে ঢাকায় শিখা সম্প্রদায় বলিয়া পরিচিত প্রগতিবাদী মুসলিম সাহিত্য সংঘ চালাইতেন। এঁদের সঙ্গে চিন্তার দিক দিয়া আমাদের বহুলাংশে মিল ছিল বলিয়া ব্যক্তিগত সহযোগিতা ও যাতায়াত ছিল।
.
১১. সাহিত্য-সমিতির সেক্রেটারি
এই মুদ্দতটাতে আমি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সেক্রেটারি ছিলাম। বয়স, যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার দিক দিয়া আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় ইয়াকুব আলী চৌধুরী সাহেবকেই আমি সেক্রেটারি করিতে চাহিয়াছিলাম। কিন্তু তার স্বাস্থ্য খারাপ ও দৃষ্টিশক্তি দুর্বল ছিল বলিয়া তিনি আমাকে সেক্রেটারি হইবার জন্য জিদ করেন এবং নিজে আমার সহকারী সেক্রেটারি হইতে সম্মত হন। ফলে বার্ষিক সভায় প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট মি. এস ওয়াজেদ আলী সাহেব প্রেসিডেন্ট, আমি সেক্রেটারি, ইয়াকুব আলী চৌধুরী ও আয়নুল হক খাঁ সাহেবদ্বয় সহ সেক্রেটারি ও মৌ. মুজিবর রহমান সাহেব কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হইলেন। আমরা নির্বাচিত সম্পাদকমণ্ডলী ছাড়া মৌ. ওমেদ আলী নামে এক ভদ্রলোক ড. শহীদুল্লাহ-মমাজাম্মেল হক সাহেবের আমল হইতে বরাবর সমিতির আফিস সেক্রেটারি ছিলেন। সাহিত্য সমিতির প্রতি এই ভদ্রলোকের এমন একটা পিতৃস্নেহ ছিল যে, সামান্য বেতনে তিনি বহুদিন এই সমিতির সেবায় কঠোর পরিশ্রম করিয়াছেন। আমাদের প্রেসিডেন্ট সাহেব ক্যাম্বুিজের গ্র্যাজুয়েট ব্যারিস্টার ছিলেন। নামের শেষে তিনি বরাবর ‘বি. এ. ক্যানটাব’ লিখিতেন ও লিখাইতেন। বন্ধুবর ওমেদ আলী এ বিষয়ে খুব সচেতন ছিলেন। সমিতির প্রচারে বাহিরে গিয়া অথবা আফিসে বসিয়া নূতন লোকের প্রশ্নের উত্তরে কেউ আমরা যখন বলিতাম আমাদের প্রেসিডেন্ট মি. এস ওয়াজেদ আলী, ওমেদ আলী সাহেব ব্রাকেটে বলিয়া দিতেন ‘বি. এ. ক্যানটাব’। স্যার আবদুর রহিম, মৌ. ফজলুল হক, মৌ, আবদুল করিম প্রভৃতি বড়-বড় নেতাদের বাড়িতে আলোচনায় এমনকি সমিতির সভায়ও যদি কেউ কোনও কারণে মি. এস ওয়াজেদ আলী উচ্চারণ করিতেন, অমনি ওমেদ আলী সাহেব সভার যে-কোনও কোণ হইতে বলিয়া উঠিতেন, বি. এ. ক্যানটাব। আমরা ওমেদ আলী সাহেবের এই ব্যবহারে হাসিতাম। আমরা মনে করিতাম, ওয়াজেদ আলী সাহেবের ‘ক্যানটাব’প্রীতিকে তিনি এইভাবে বিদ্রূপ করিতেছেন। কিন্তু ওমেদ আলী সাহেব ছিলেন সিরিয়াস। তিনি আমাদের হাসিতে মনে মনে দুঃখিত হইতেন।
যা হোক ওমেদ আলী সাহেব ছিলেন সমিতির একটা অ্যাসেট। তার মহানুভবতায় আমি এতদিন নির্বিঘ্নে সমিতির সেক্রেটারিগিরি করিতে পারিয়াছিলাম।
সাহিত্য সমিতির সেক্রেটারিগিরি করিতে গিয়া আমার যে দুইটি চমৎকার অভিজ্ঞতা হইয়াছিল আমার সাহিত্যিক জীবনের সঙ্গে তার কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক না থাকিলেও এখানে তার উল্লেখ করার লোভ সম্বরণ করিতে পারিলাম না।
.
১২. চাঁদা আদায়
প্রথমটি নবাব মশাররফ হোসেন সাহেবের সঙ্গে। তিনি একবার বার্ষিক সভায় সমিতির তহবিলে পাঁচ শত টাকা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। তখন তিনি বাংলা সরকারের একজন মন্ত্রী। এই প্রতিশ্রুত চাদা আদায়ের জন্য আমরা সম্পাদকমণ্ডলী তার হাজরা রোডের বাড়িতে হানা দিলাম। হাজরা রোড ট্রাম লাইন হইতে অনেক দূরে। কাজেই কিছুদিন হাঁটাহাঁটি করিবার পর প্রথমে ইয়াকুব আলী চৌধুরী, পরে আয়নুল হক খ এবং শেষ পর্যন্ত ওমেদ আলী সাহেবও নিরাশ হইয়া খসিয়া পড়িলেন। আমি সেক্রেটারি পাওনাদারের তাকিদ আমার উপরই ছিল প্রত্যক্ষভাবে। সুতরাং পাঁচ শ টাকা আমি অত সহজে ছাড়িতে পারিলাম না। ঘুরা-ফেরা করিতেই থাকিলাম। একদিন আমি চটিয়া গিয়া বলিয়া ফেলিলাম : ‘নবাব সাহেব, আমাকে আর কত ঘুরাইবেন? টাকা দিবেন কি না আজ স্পষ্ট কথা বলিতে হইবে।’ নবাব সাহেব আমার কথা বলার ভঙ্গিতে বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলিয়া বলিলেন : ‘বড় যে পাওনাদারের মত মেজে কথা বলিতেছেন। আপনার কথা শুনিয়া মনে হয় আমি যেন আপনার খাতক। আমি সমান জোরে বলিলাম : ‘আলবত আপনি আমার খাতক; আলবত আমি আপনার পাওনাদার।’ নবাব সাহেব চোখ লাল করিলেন। ঘর-ভরা বড়-বড় সাহেব আইসিএস অফিসার। তারা আমার দুঃসাহসে ও আসন্ন বিপদে বিস্মিত ও চিন্তিত হইলেন। কিন্তু আমি বিন্দুমাত্র না ঘাবড়াইয়া মাথা উঁচা করিয়া বলিলাম : আপনি যেদিন প্রকাশ্য সভায় দাঁড়াইয়া সমিতির তহবিলে পাঁচ শত টাকা চাঁদা দিবেন ঘোষণা করিয়াছিলেন, সেইদিন হইতে সমিতি আপনার পাওনাদার। আপনি সমিতির খাতক। আপনি যদি ওয়াদা খেলাফ করিতে চান, তবে বলিয়া দেন সে কথা। আমি সমিতির সভা ডাকিয়া সে কথা বলি। সমিতি আপনাকে মাফও করিয়া দিতে পারে।
