কিন্তু মুহূর্তেই জবাব পাইলাম। আমার সারা অস্তিত্ব এক সঙ্গে হুংকার দিয়া উঠিল : না না, ভুল করি নাই। আমার আত্মসম্মানবোধ ঝাঁকি মারিয়া মাথা তুলিয়া বুক টান করিয়া বলিল : ঠিক করিয়াছি। বাংলার মেজরিটি মুসলমানের মুখের ভাষাকে বাংলা ভাষা বলিয়া স্বীকার করিল না বাংলার মাইনরিটি হিন্দুরা? এ অবস্থা চলিতে থাকিলে মুসলমানের ত ভাল হইবেই না, সারাদেশের, সুতরাং হিন্দুরও ভাল হইবে না। কাজেই এটা বন্ধ করিতেই হইবে। হিন্দুদের বর্তমান মতিগতিতে কাজটা খুবই কঠিন। কাজেই স্যাক্রিফাইস দরকার। আমার মত গরীবের পক্ষে এগারশ টাকা স্যাক্রিফাইস খুব বড় ত্যাগ বটে, কিন্তু উদ্দেশ্যের তুলনায় এ ত্যাগ খুবই সামান্য। হয়ত এর চেয়েও বড় ত্যাগ করিতে হইবে। মনে সান্ত্বনা পাইলাম। আফিসে ফিরিয়া খায়রুল আনাম খাঁ সাহেবকে সব বলিলাম। তিনি দয়া করিয়া পূর্ব প্রস্তাব মত ছয়শ টাকায় আমার বই কিনিতে রাজি হইলেন। এক শ টাকা অগ্রিম দিলেন। পাণ্ডুলিপি ফেরৎ আনিলাম।
যথাসময়ে মোহাম্মদী বুক এজেন্সী আমার মুসলমানী কথা প্রকাশ করিলেন। অতঃপর যা ঘটিল, তাতে মুসলমানের মুখের ভাষার জন্য আমার মত গরীবের স্বার্থ ত্যাগের অহংকার ষোল আনা অটুট থাকিল। কারণ আমার ত্যাগের পরিমাণ আরেকটু বাড়িল। কিন্তু ঐ ত্যাগও যথেষ্ট নয়, আর ত্যাগের দরকার হইতে পারে বলিয়া আমি সেদিন যে আশঙ্কা করিয়াছিলাম, বারটি বছর না যাইতেই সে আশঙ্কা আমারই ঘাড়ের উপর দিয়া কার্যে পরিণত হইল।
.
১০. দ্বিতীয় স্যাক্রিফাইস
আমি তখন ময়মনসিংহ জজকোর্টে উকালতি করি। নূতন উকিল। পসার খুব জমে নাই। সাহিত্যিক নেশায় এবং উপরি আয়ের জন্য নয়া পড়া নামক চার খণ্ডের একখানা শিশুপাঠ্য বই লিখি। চার খণ্ড বই মকতবের চার ক্লাসের জন্য টেক্সট বুক কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়। এই চারখানা বই হইতে আমি যথেষ্ট টাকা-কড়ি পাইতে থাকি। তিন বছর মুদ্দত পার হয়-হয় অবস্থায় বাংলার প্রাইমারি এডুকেশন অ্যাক্ট পাশ হয়। এই নূতন আইনে প্রাইমারি স্কুল ও মকতব এক করিবার বিধান হয়। আমার নয়া পড়াঅনুমোদিত পুস্তকগুলির মধ্যে ‘এ’ ক্লাসের বই ছিল। সুতরাং নূতন বিধানেও আমার বই পাঠ্য-পুস্তক থাকিয়া যাইবে, এ কথা প্রকাশকসহ সকলেই বলিলেন। নয়া পড়ার চাহিদা বাড়িয়া যাইবে। আমার আয়ও বাড়িবে, এই আশায় আমি গোলাপি স্বপ্ন দেখিতে থাকিলাম।
।এমন সময় টেক্সট বুক কমিটির তরফ হইতে এক পত্রে আমাকে জানান। হইল যে আমার নয়া পড়া নূতন আইনে পাঠ্য-পুস্তকরূপে অনুমোদিত হইয়াছে, তবে উহাতে যে সব আরবি-ফারসি শব্দ আছে, সেসব শব্দের জায়গায় বাংলা প্রতিশব্দ বসাইতে হইবে।
বার বছর আগেকার ঘটনা মনে পড়িল। তখন ছিলেন ভট্টাচাৰ্য্য এন্ড সন্স, এবার স্বয়ং টেক্সট বুক কমিটি মানে, খোদ সরকার। কিন্তু আমিও আজ বার বছর আগের অসহায় লোকটি নই। ইতিমধ্যে দেশে বিরাট পরিবর্তন হইয়াছে। কৃষক প্রজা পার্টির নেতা হক সাহেব প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী হইয়াছেন। তাঁর আমি একজন প্রিয় শিষ্য। তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করার ব্যাপারে আমার যথেষ্ট হাত আছে। হক সাহেব আমার কোনও কথাই ফেলেন না।
অতএব টেক্সট বুক কমিটিকে আমার সেই পুরাতন মত জানাইলাম, যা ভট্টাটাৰ্য্যকে জানাইয়াছিলাম। টেক্সট বুক কমিটি কিন্তু ভট্টাচাৰ্য্যকে ছাড়াইয়া গেলেন। তারা অন্যান্য যুক্তির সঙ্গে এটাও জানাইলেন : “আল্লা’, ‘খোদা’, ‘পানি ইত্যাদি শব্দ প্রাইমারি পাঠ্য-পুস্তকে থাকিলে হিন্দু ছাত্রদের ধর্মভাবে আঘাত লাগিবে। আমার মাথায় আগুন চড়িয়া গেল। আমি জানাইলাম, একশ বছরের বেশি বাংলার মুসলমান ছাত্ররা পাঠ্য-পুস্তকে ‘ঈশ্বর’, ‘ভগবান’, ‘জল’ পড়াতেও যদি তাদের ধর্মভাবে আঘাত লাগিয়া না থাকে, তবে এখন হইতে ‘আল্লা’, ‘খোদা পড়িয়া হিন্দুদেরও ধর্মভাবে আঘাত লাগা উচিৎ নয়।
আমার যুক্তি ভট্টাচাৰ্য্য যেমন মানেন নাই, টেক্টট বুক কমিটিও মানিলেন না। আমাকে জানাইয়া দিলেন, অত্র অবস্থায় আমার বই বাতিল করিয়া দিতে তারা বাধ্য হইলেন বলিয়া দুঃখিত।
আমি রাগ করিলাম না। মনে মনে হাসিলাম। বেচারা টেক্সট বুক কমিটি জানেন না : কার বই তাঁরা বাতিল করিলেন। তাঁরা জানেন না, প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী হক সাহেবকে দিয়া আমি শুধু তাদের এই বাতিল অর্ডারই বাতিল করিতে পারি না। তাদের চাকুরি পর্যন্ত নট’ করিয়া দিতে পারি। অবশ্য আমি বেচারাদের চাকরি সত্য-সত্যিই নট’ করিব না। তবে সে মর্মে ধমক দিয়া তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য হুঁশিয়ার করিয়া দিতে এবং তাঁদের বাতিলি অর্ডার বাতিল করাইতে আমি কলিকাতা গেলাম। হক সাহেব যথারীতি হৈ চৈ করিলেন : টেক্সট বুক কমিটি ভাঙিয়া পড়িবেন, কর্মচারীদের ডিসমিস করিবেন। বলিয়া হুংকার দিলেন। তাঁদের কৈফিয়ত তলব করিলেন। আমি আশ্বস্ত হইয়া এবং কারো চাকুরি নষ্ট না করিতে হক সাহেবকে পুনঃপুন অনুরোধ করিয়া ময়মনসিংহ ফিরিয়া আসিলাম। বহুদিন অপেক্ষা করিবার পর আবার কলিকাতা গেলাম। এইবার হক সাহেব আমাকে জানাইলেন যে হিন্দু বদমায়েশ অফিসারদের জ্বালায় তিনি কিছু করিতে পারিলেন না। বিলম্বও হইয়া গিয়াছে যথেষ্ট। এখন পাঠ্যবই বদলাইলে ছাত্রদের অসুবিধা হইবে। আমারও আর্থিক লাভ বিশেষ হইবে না। তবে আগামী বৎসর যাতে আমার বই অবশ্যপাঠ্য হয়, সে ব্যবস্থা তিনি নিশ্চয় করিবেন। আমি এতদিন ব্যাপারটার আর্থিক দিক মোটেই ভাবিতেছিলাম না। হক সাহেবের আশ্বাসের পর সে বিষয়েও আমি সচেতন হইলাম। কিন্তু তাঁর প্রতিশ্রুত আগামী বছর আর আসিল না। বাঙ্গালী মুসলমানের মুখের ভাষা বাংলা সাহিত্যে স্বীকৃতি পাইবার প্রয়াসে ইহাকে আমার আরেকটা স্যাক্রিফাইস বলিয়া অবশেষে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিলাম।
