ভদ্রলোককে বুঝাইবার জন্য বলিলাম যে ঐসব শব্দের উৎপত্তি আরবি ফারসি ভাষা হইতে হইয়াছে বটে, কিন্তু যুগ-যুগান্তর ধরিয়া বাংলার জনসাধারণ ঐ সব শব্দ তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করায় ও-সবই বাংলা হইয়া গিয়াছে। বলিলাম : যেসব শব্দ তিন বছরের নিরক্ষর বাঙ্গালী শিশু বুঝিতে ও বলিতে পারে, মূল যা-ই হোক, যেসব শব্দই বাংলা। দৃষ্টান্ত দিলাম ‘জংগল’ ও ‘জানালা দিয়া। দুইটাই ওলন্দাজ শব্দ। কিন্তু আমাদের দেশের মাটিতে উহারা এমন মিশিয়া গিয়াছে যে ও-গুলির বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজিয়া বাহির করার কল্পনাও কেউ করে না।
ভদ্রলোক আমার কথায় বিরক্ত হইয়া বলিলেন : আমাকে ভাষা-বিজ্ঞান শিখাইবার চেষ্টা করিবেন না। আমি ব্যবসায়ী মানুষ। আমার বই বিক্রয় দিয়া কথা। ঐ সব শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ না দিলে হিন্দুরা বুঝিতে পারিবে না। মুসলমানরা ঐসব শব্দ ব্যবহার করিলেও হিন্দুরা করে না।
আমি যখন ভদ্রলোককে বলিলাম যে হিন্দুরা ও-সব শব্দ সাধারণত ব্যবহার না করিলেও তারা সকলেই বুঝিতে পারে, তখন ভদ্রলোক ধৈর্য হারাইয়া বলেন যে তবু ওগুলি আরবি-ফারসি শব্দ, বাংলা শব্দ নয়।
আমিও রাগ করিয়া প্রশ্ন করিলাম :
শতকরা ছাপ্পান্ন জন বাঙ্গালীর মুখের ভাষাকে আপনি বাংলা স্বীকার করেন? দেশের দুর্ভাগ্য!
আমি তখন পুরা কংগ্রেসি। মাথা হইতে পা পর্যন্ত মোটা খদ্দর। তিনি নূতন করিয়া আমার পোশাকের দিকে চাহিয়া বলিলেন : দেখুন, আমি ব্যবসায়ী। আপনার সাথে আমি দেশের ভাগ্য লইয়া তর্ক করিতে চাই না। আমার শুধু জানা দরকার আপনি ঐ সব শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ দিবেন কি দিবেন না?
ভদ্রলোকের সুরে অশুভ ইঙ্গিত ফুটিয়া উঠিল। আমি অপেক্ষাকৃত নরম হইয়া বলিলাম : আমাকে ব্যাপারটা বুঝিতে দেন। আপনি কী বলিতে চান, পরিশিষ্টে ‘পানি’ অর্থ ‘জল’, ‘আল্লাহ’ অর্থ ‘ঈশ্বর’, ‘রোযা’ অর্থ উপবাস’, এইভাবে ওয়ার্ড বুকের মত শব্দার্থ লিখিয়া দিতে হইবে?
আমি অনেকটা নরম হইয়াছি মনে করিয়া ভদ্রলোক খুশি হইলেন। বিনীতভাবে বলিলেন : আজ্ঞে হাঁ, ঠিক ধরিয়াছেন।
আমি : তা হইলে আমাকে স্বীকার করিতে হইবে যে পানি, আল্লাহ, নামাজ, রোযা এসব শব্দ বাংলা নয়? জল, ঈশ্বর, উপাসনা ও উপবাসই বাংলা শব্দ?
ভদ্রলোক একটু ভাবিয়া বলিলেন : না, তা কেন? বাংলা শব্দেরও কি বাংলা প্রতিশব্দ থাকে না? ঈশ্বর অর্থ ভগবান, জল অর্থ বারি, এসব কথা কি আমরা বলি না?
আমি বলিলাম : ঠিক আছে। আপনার কথাই মানিয়া লইলাম। ঐ সব শব্দের প্রতিশব্দ আমি লিখিয়া দিব। কিন্তু এক শর্তে।
ভদ্রলোক খুশিতে হাসিতে যাইতেছিলেন। অকস্মাৎ মুখের হাসির বদলে চোখে কৌতূহল দেখা দিল। বলিলেন : কী শর্ত?
আমি: আপনি বহু হিন্দু গ্রন্থকারের বইয়ের প্রকাশক। তাঁদেরে ডাকিয়া রাজি করুন : তাঁদের বইয়ের পরিশিষ্টের শব্দার্থে ঈশ্বর অর্থ আল্লাহ, জল অর্থ পানি, উপবাস অর্থ রোযা; ইত্যাদি যোগ করিবেন। এতে রাজি আছেন আপনি?
.
৯. প্রথম স্যাক্রিফাইস
ভদ্রলোক রাগে ফাটিয়া পড়িলেন। এর পর যা কথাবার্তা হইল তার খুব স্বাভাবিক পরিণতি হইল আমার জন্য খুব খারাপ। ভদ্রলোক স্পষ্ট বলিয়া দিলেন, আমার সাথে তার চুক্তি বাতিল। তিনি কপিরাইট কিনিলেন না। ব্লক তৈয়ার করিতে তাঁর যে হাজার খানেক টাকা খরচ হইয়া গিয়াছে, তা তিনি আমার কাছে দাবি করিলেন না। আমার অগ্রিম নেওয়া একশত টাকা ফেরৎ দিয়া যে-কোনও দিন আমি পাণ্ডুলিপি ফেরৎ নিতে পারি বলিয়া ভদ্রলোক চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া পড়িলেন। অগত্যা আমিও উঠিলাম। আদাব’ বলিয়া বাহির হইলাম। প্রায় চৌকাঠ পার হইয়াছি এমন সময় ভদ্রলোক ডাকিয়া বলিলেন : মনসুর সাহেব, আপনি রাগিয়া গিয়াছেন। আবার ভাবিয়া দেখুন। পরিশিষ্ট দিতে রাজি হইলে এখনও আপনার বই নিতে পারি।
কিন্তু এ কথার যে জবাব আমি দিতে চাহিলাম, তা পারিলাম না। তার বদলে কে যেন আমার মুখ দিয়া বাহির করিয়া দিল : ‘ভট্টাচাৰ্য্য মশায়, আপনি রাগিয়া গিয়াছেন। আবার ভাবিয়া দেখুন। পরিশিষ্ট ছাড়া বই ছাপিতে রাজি হইলে এখনও আপনাকে বই দিতে পারি।’
ব্যবহারের প্রতিবিম্বরূপে ব্যবহার করা, আর কথার প্রতিধ্বনি রূপে কথা কওয়ার সেই পুরাতন বদভ্যাস! আমি কিছুতেই এই অভ্যাসের হাত হইতে রেহাই পাইলাম না।
গিয়াছিলাম মোটরে। ফিরিতে হইবে ট্রামে। ফুটপাথ ধরিয়া ট্রামস্টপে যাইতে, ট্রামের জন্য অপেক্ষা করিতে এবং ট্রামে চড়িয়া শিয়ালদহে মোহাম্মদী আফিসে আসিতে শুধু একটা কথাই আমার মাথায় কিলবিল করিতে থাকিল : এটা কী করিলাম? এক হাজার টাকা হারাইলাম একটা জিদের বশে? হাজার টাকা ত গেল, আবার আগাম-নেওয়া টাকাটাও ত ফেরৎ দিতে হইবে। এগারশ টাকার সব গেল? মনে হইল, বাদশাহী তখৃত হারাইয়া পথের ফকির হইলাম। বস্তুত, তৎকালে আমার জন্য এগারশ টাকাই ছিল বিপুল সম্পদ। মাসে চল্লিশ হাজার টাকার আইন ব্যবসায় ছাড়িয়া দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় একদা ঐ মহাপুরুষের উদ্দেশ্যে মাথা নত করিয়া আমিও অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়াছিলাম। আজ মনে হইল আমার এই এগারশ টাকা ত্যাগ দেশবন্ধুর ত্যাগের চেয়েও বড়। কারণ দেশবন্ধু ঐ ত্যাগের পরেও সুখে-সম্মানে বাঁচিয়া আছেন। কিন্তু আমার এই ত্যাগে সুখ-সম্মান ত দূরের কথা, একশ টাকা ফেরৎ না দিলে ত আমাকে চরম অপমান হইতে হইবে। কী দরকার ছিল জিদ করিবার? দিলেই ত হইত একটা পরিশিষ্ট লিখিয়া। বইটায় ত আমার কোনও স্বত্বাধিকার থাকিত না। কাজেই তার ভুলত্রুটির জন্য আমাকে কেউ দোষও দিত না, তবে কি ভুল করিলাম?
