.
৭. প্রথম বইয়ের কপিরাইট
আমি ১৯২২ সালের মাঝামাঝি খুব সম্ভব জুলাই মাসে প্রথম কলিকাতায় যাই। ঐ বছর মাঝে-মাঝে এবং ১৯২৩ সাল হইতে একটানা প্রায় আট বছর কলিকাতা থাকি এবং সংবাদপত্রের সেবা করি। আমার সাংবাদিক জীবন অন্য খণ্ডে বর্ণনা করিব। এখানে শুধু সাহিত্যিক জীবনের কথাটুকুই বলিতেছি। ১৯২৪-২৫ সালে আমি যখন সাপ্তাহিক মোহাম্মদীতে সহকারী সম্পাদকের কাজ করিতাম, তখন আমার বেতন ছিল মাত্র পঞ্চাশ টাকা। এই টাকায় তৎকালে সচ্ছলে আমার চলিয়া যাইত। কিন্তু কিছু সঞ্চয় করিতে পারিতাম না। এই সময় কতকটা উপরি আয়ের আশায় কতকটা গ্রন্থকার হইবার শখে, ছেলেদের উপযোগী করিয়া কাছাছুল আম্বিয়ার কতকগুলি গল্প লইয়া একটি বই লিখিলাম। তার নাম রাখিলাম মুসলমানী উপকথা। বই লেখা সমাপ্ত করিয়া উহা প্রকাশের জন্য প্রকাশক ও ছাপাখানার সঙ্গে দেন-দরবার করিতেছি, এমন সময় বাড়ি হইতে বাপজী জানাইলেন, শত খানেক টাকার জন্য তিনি একটা কাজে ঠেকিয়াছেন। ঐ পরিমাণ টাকা যোগাড় করা আমার দ্বারা সম্ভব হইলে তাঁর খুবই উপকার হয়। ছেলের কাছে বাপের টাকার চাওয়ার এর চেয়ে মোলায়েম ভাষা আর হইতে পারে না। কিন্তু আমি বুঝিলাম নেহাত নিরুপায় না হইলে বাপজী আমার নিকট টাকা চাহিতেন না। কিন্তু একশ টাকা যোগাড় করা তৎকালে আমাদের মত পঞ্চাশ টাকার সাংবাদিকের পক্ষে কল্পনাতীত ব্যাপার ছিল। কাজেই ঠিক করিলাম, আমার জীবনের প্রথম বই মুসলমানী উপকথার কপিরাইট বিক্রয় করিব। কপিরাইট যদি বিক্রয় করিতেই হয়, তবে যার নিমক খাই, তার কাছেই প্রথম যাচাই করা দরকার। কারণ তাদেরও ‘মোহাম্মদী বুক এজেন্সী’ নামক প্রকাশকের ব্যবসা ছিল। কাজেই আমার তকালীন মনিব মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র মৌলবী খায়রুল আনাম খার নিকট প্রস্তাব দিলাম। তারা ছয়শত টাকার বেশি দিতে চাহিলেন না। অন্যত্র বেশি দাম পাইলে সেখানে কপিরাইট বিক্রয় করিতে তাদের আপত্তি নাই বলিয়া দিলেন। এই সঙ্গে মাওলানা সাহেব বইটির নামের মধ্য হইতে ‘উপ’ কথাটা বাদ দিয়া শুধু মুসলমানী কথা নাম রাখিবার উপদেশ দিলেন। এ উপদেশ আমার পছন্দ হইল। ডা. দীনেশ চন্দ্র সেনের রামায়ণী কথার অনুকরণে আমার বইয়ের নাম রাখিলাম মুসলমানী কথা।
বেশি দামের সন্ধানে ঘুরিতে-ঘুরিতে অবশেষে এগারশ টাকা কপিরাইট বিক্রয় করিতে সমর্থ হইলাম। খরিদ্দার বিখ্যাত প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতা ভট্টাচাৰ্য্য এন্ড সন্স। যথাসময়ে পাণ্ডুলিপি তাদের হাতে দিয়া এক শ টাকা অগ্রিম লইলাম। বাকি হাজার টাকা পুস্তক ছাপা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাইব, কথা স্থির হইল। ছাপা হওয়ার সময় প্রথম প্রফটা আমি দেখিয়া দিতে ওয়াদা করিয়াছিলাম। তাই বোধ হয় অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ভট্টাচার্য্য। মহাশয় বাকি টাকা দেওয়ার ঐরূপ শর্ত করিয়াছিলেন। আমার তাতে মোটেই আপত্তি ছিল না। কারণ প্রথমত বাড়িতে পাঠাইবার মত টাকা আমি পাইয়াছি; এখন আমার আর টাকার প্রয়োজন নাই। দ্বিতীয়ত নিজের প্রথম বইটায় ছাপার ভুল না থাকে, সে বিষয়ে আমার আগ্রহ প্রকাশকের আগ্রহের চেয়ে কম ছিল না।
ইতিমধ্যে ভট্টাচাৰ্য্য এন্ড সন্স রঙ্গিন কালিতে বড় বড় হরফে বর্ডারসহ বই ছাপিবার জন্য ব্লকাদি করিয়া ফেলিলেন। একটা সম্পূর্ণ নূতন ধরনের চমৎকার শিশুপাঠ্য পুস্তক বাহির হইতেছে বলিয়া বিজ্ঞাপন বাহির হইল। সঙ্গে সঙ্গে আমার নামও প্রকাশ হইল। ভট্টাচার্য্য এন্ড সন্সের এই সময়ে শিশু সাথী নামে একটি সুন্দর শিশু মাসিক ছিল। এই শিশু মাসিকে কারুনের ধন’ নামক মুসা ও কারুনের গল্পটি ছাপা হইয়া গেল। কলিকাতার সাহিত্যিক সমাজে গল্পটির যথেষ্ট সমাদর হইল। আমার আনন্দ আর ধরে না। ঐ বইয়ে আমার কোনও স্বত্ব নাই। ওটা লাখ লাখ কপি বিক্রয় হইলেও তাতে আমার এক পয়সা লাভ হইবে না। এসব কোনও কথাই আমার আনন্দে বিঘ্ন ঘটাইতে পারিল না।
.
৮. আরবি-ফারসি বনাম বাংলা শব্দ
কয়েক দিন পরই ভট্টাচাৰ্য্য এন্ড সন্সের মালিক আমাকে নিবার জন্য লোক ও গাড়ি পাঠাইলেন। আমি তাদের কর্নওয়ালিস স্ট্রিটস্থ দোকানে গেলাম। কুশল মন্দ জিজ্ঞাসা ও চা’র অর্ডার ইত্যাদি প্রাথমিক ভদ্রতার পরই আমার বইয়ের কথা তুলিলেন। বই খুব জনপ্রিয় হইবে, গল্প ও ভাষা খুবই চমৎকার, ইত্যাদি কয়েক কথার পরেই তিনি বলিলেন : “কিন্তু বই-এ অনেক আরবি-ফারসি শব্দ আছে। এইগুলির ফুটনোট দিতে হইবে।’ ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের কথা আমার পছন্দ হইল না। কিন্তু ভদ্রলোকের সঙ্গে তর্ক করা যায় না, কারণ হাজার টাকা এখনো বাকি। কাজেই খুব সাবধানে অতি মোলায়েম ভাষায় যুক্তি ও দৃষ্টান্ত দিয়া বলিলাম যে অমন সুন্দর রঙ্গিন কালির ছাপ শিশুপাঠ্য বইয়ে ফুটনোট একেবারে বেমানান হইবে। বইয়ের সৌন্দর্য একদম নষ্ট হইয়া যাইবে।
ভদ্রলোক আমার যুক্তি মানিয়া লইলেন। কিন্তু ফুটনোটের বদলে ‘পরিশিষ্টে’ শব্দার্থ দিতে বলিলেন। পরিশিষ্টের বিরুদ্ধে খানিকক্ষণ এটা-ওটা যুক্তি দিয়া শেষ পর্যন্ত আসল যুক্তিটা বাহির করিলাম। বলিলাম : আমার বইয়ে কোনও আরবি-ফারসি শব্দ নাই। সবই বাংলা শব্দ। কাজেই পরিশিষ্টে শব্দার্থ দেওয়ার দরকার নাই।
