একদিন শামসুদ্দীন বলিলেন, কলেজ স্ট্রিটে সাহিত্য-সমিতির সভা আছে। আমাকে যাইতে হইবে। তিনি অন্য মেম্বরদেরে কথা দিয়া আসিয়াছিলেন। আল-এসলাম, সওগাত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় গল্প-প্রবন্ধ লিখিয়া আমি তখন সাহিত্যিক সমাজে কতকটা পরিচিত হইয়াছি। কাজেই শামসুদ্দীন বলিলেন সবাই আমাকে দেখিতে চান। ইতিমধ্যে পথে-ঘাটে সমিতির সম্পাদক কবি মোজাম্মেল হক (ভোলা) ও সহকারী সম্পাদক মোযাফফর আহমদ সাহেবের সঙ্গে পরিচয় হইয়াছিল। শামসুদ্দীন তাঁদেরও দোহাই দিলেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় কথা বলিলেন, কাজী নজরুল ইসলাম আজকার সভায় উপস্থিত থাকিবেন। দু-এক দিনের মধ্যে তিনি ধূমকেতুনামে সাপ্তাহিক বাহির করিবেন।
যথাসময়ে সভায় গেলাম। অনেক নাম-শোনা চোখে-না-দেখা কবি সাহিত্যিকের দেখা পাইলাম। শামসুদ্দীন সভার মধ্যে আমাকে ফরমালী পরিচিত করিতে গিয়া আমার প্রতিভার, লেখার ও রসিকতার অনেক তারিফ। করিয়া শেষে বলিলেন : কিন্তু এ ব্যাপারে আপনাদিগকে সাবধান করিয়া দিতেছি। আমার এই বন্ধু যে সব কথা বলিবেন, তার বার আনা বাদ দিয়া মাত্র চার আনা বিশ্বাস করিবেন। আমার প্রতি এই আক্রমণ সকলে উচ্চ হাসিতে উপভোগ করিলেন। আমিও অগত্যা সে হাসিতে যোগ দিলাম। সকলের শেষে আমার জবাবের পালা। তারিফের উত্তরে ততোধিক তারিফ। করিয়া বিনয়ের উত্তরে সর্বাধিক বিনয় দেখাইয়া উপসংহারে বলিলাম : বন্ধুবর শামসুদ্দীন আমার কথার বার আনা বাদ দিয়া মাত্র চার আনা বিশ্বাস করিবার উপদেশ দিয়াছেন। সরলভাবে আমি স্বীকার করিতেছি যে, তাতেও আমার দুই আনা নেট মুনাফা থাকিবে।
হাসির হুল্লোড় পড়িয়া গেল। সবার সমবেত উচ্চ-হাসি তলাইয়া দিয়া ছাদফাটা হাসি হাসিলেন যিনি তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি আসন ছাড়িয়া রসিক বটে, এমনটি আর দেখি নাই বলিতে-বলিতে আমাকে হাবিলদারের সমস্ত শক্তি দিয়া জড়াইয়া ধরিলেন। অন্তরে-অন্তরে আমাদের পরিচয় হইয়া গেল।
সাংবাদিক জগতে প্রবেশ করার জন্য কিছু-কিছু প্রাথমিক কোদাল-কাম করিয়া সেবারের মত ফিরিয়া আসিলাম। পরে আরো কয়বার গিয়া পাকাভাবে গেলাম ১৯২৩-এর মার্চ-এপ্রিলে। সেবারও আবুল কালাম শামসুদ্দীনেরই মেহমান হইলাম। মেহমানদারির বদলা তাঁর সম্পাদিত মুসলিম জগত-এ কিছু-কিছু লেখা দেওয়া আমার কর্তব্য এবং সুযোগ মনে করিলাম। এইভাবে আমি ‘ছহি বড় তৈয়ব নামা’ নামে একখানা স্যাটায়ার কাব্য এবং সভ্যতায় দ্বৈতশাসন’ নামে একটি বড় প্রবন্ধ লিখিলাম। ছহি বড় তৈয়ব নামা’ মশহুর পুঁথি ‘ছহি বড় সোনাভানের অনুকরণে একটি রাজনৈতিক প্যারডি-স্যাটায়ার। আমার রাজনৈতিক সহকর্মী খেলাফত নেতা শ্রদ্ধেয় মৌলবী তৈয়ব উদ্দিন আহমদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের স্বরাজ দলের একজন আইন সদস্য। তিনি অন্যতম মন্ত্রী স্যার আবদুল করিম গযনবীর খাতির এড়াইতে না পারিয়া সরকার পক্ষে একটি ভোট দিয়া দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন। তার এই কাজের নিন্দায় আমি এই স্যাটায়ারটি লিখি। স্যাটায়ার লেখায় এই আমার প্রথম উদ্যম। মুসলিম জগত-এ এটি বাহির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলিকাতার সাহিত্যিক মহলে বিশেষত মুসলিম সাহিত্যিক মহলে আমার সুনাম হয়। আমি খুবই উৎসাহবোধ করি। সভ্যতায় দ্বৈতশাসন’ রাজনৈতিক দার্শনিক দীর্ঘ প্রবন্ধ। ইহা কয়েক মাস কাল ধরিয়া মুসলিম জগত-এ ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়। এই সময়ে ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনে যে কিছু আংশিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হইয়াছিল, কংগ্রেস-খিলাফত নেতারা উহাকে ‘ডায়ার্কি বা দ্বৈতশাসন’ বলিতেন। কাজেই আমরা তখন দ্বৈতশাসনকে খুব খারাপ জিনিস মনে করিতাম। আমি এই প্রবন্ধে প্রমাণ করিবার চেষ্টা করিয়াছিলাম, ইংরাজের-দেওয়া শাসন-ব্যবস্থাটাই শুধু দ্বৈতশাসন নয়, ইংরাজি সুতরাং গোটা ইউরোপীয় সভ্যতাটাই আসলে দ্বৈতশাসন। কাজেই ইংরাজ সাম্রাজ্যবাদীরা যে আমাদের ঘাড়ে রাজনৈতিক দ্বৈতশাসন চাপাইবার চেষ্টা করিতেছেন, এটা কোনও ‘বিচ্ছিন্ন আকস্মিক ব্যাপার নয়। তাদের সভ্যতার এটা অংশ মাত্র। ছহি বড় তৈয়ব নামা’ বা ‘সভ্যতায় দ্বৈতশাসন’ কোনটারই কপি বর্তমানে আমার কাছে নাই। কাজেই এত বড় বিষয়ে আমার মত সাধারণ যুবক কী লিখিয়াছিলাম, আজ তা বলিতে বা বুঝিতে পারিতেছি না। যতদূর স্মরণ পড়ে, ঐ প্রসঙ্গে আমি বলিবার চেষ্টা করিয়াছিলাম যে পাশ্চাত্য সভ্যতা দু’মুখা সভ্যতা। এ সভ্যতা মুখে-মনে এক কথা বলে না। যা শিখায় তা করায় না। আমার আরো মনে পড়ে যে তৎকালে মহাত্মা গান্ধীর ইয়ং ইন্ডিয়া এবং রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধাবলি পড়িয়া আমি খুবই প্রভাবিত হইয়াছিলাম। তাদেরই ভাবকে নিজের ভাব মনে করিয়া ছোটমুখে বড় বড় কথা বলিয়াছিলাম। নিজে ঐ সব কথা বলিতে পারিয়া আমি এতটা গর্ব বোধ করিয়াছিলাম যে, গোটা প্রবন্ধের কাটিংগুলি একত্রে গাঁথিয়া আমার দর্শনের অধ্যাপক (তকালে ভাইস চ্যান্সেলার) ডা. ল্যাংলির কাছে ঢাকা পাঠাইয়াছিলাম এবং সঙ্গীয় পত্রে তাঁকে সসম্মানে অনুরোধ করিয়াছিলাম, তিনি যেন কাউকে দিয়া উহার অনুবাদ করাইয়া পড়িয়া দেখেন। ল্যাংলি সাহেব ধর্মপ্রাণ খৃষ্টান ছিলেন। কয়েক মাস পরে তিনি একখানা স্নেহপূর্ণ সংক্ষিপ্ত পত্রে জানাইয়াছিলেন, যে আমার প্রবন্ধটা তার ভাল লাগিয়াছে। লেখক হিসাবে আমার সাফল্যের জন্য তিনি দোওয়া করিতেছেন।
