অনুষ্ঠানটা ছিল সেই সন্ধেবেলায়ই। আমি বুলুর ওখানেই রয়ে গেলাম। বিকেলে মানসীরা এসে পড়ল। তারপর পাঁচজনে একত্রে যাত্রা। লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে হলে ঢোকা। হল তো নয়-লোকারণ্য।
সংগীতানুষ্ঠানের শুরুতে দিলীপকুমার মঞ্চে উঠে আহ্বান করলেন লতা মঙ্গেশকরকে। শ্রোতাদের করতালি থামতে চায় না। তার মধ্যে সায়রা বানু এসে পুস্পার্ঘ্য দিলেন লতাকে। তাঁকে সম্মান জানিয়ে দিলীপকুমার নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন উর্দুতে, তবে সে-উর্দু ফারসিবহুল। সব কথার অর্থ বুঝিনি, কিন্তু এমনই শ্রুতিমধুর তাঁর বাচন, শব্দের ঝংকার এমন লালিত্যপূর্ণ, এমন। দৃষ্টিনন্দন তাঁর সর্বদেহের ভঙ্গি যে সে-বক্তৃতা শোনাও এক পরম রমণীয় অভিজ্ঞতা। এরপর একে একে সহশিল্পীদের আবির্ভাব–আশা ভোসলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, নীতীন মুকেশ, বাদকবৃন্দ। ঘোষণায় বলা হলো, প্রথম দুজনের সঙ্গে গীত লতার কিছু জনপ্রিয় গান আবার তাঁদের কণ্ঠেই শোনা যাবে, আর মুকেশের সঙ্গে যেসব গান গেয়েছিলেন তিনি, তার কয়েকটি গাইবেন লোকান্তরিত শিল্পীর পুত্র নীতীনের সঙ্গে। নীতীন মঞ্চে প্রবেশ করে লতাকে প্রণাম করেছিলেন পা-ছুঁয়ে, তারপর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন লতার কাছে এই বলে যে, তাঁর বাবার গাওয়া গান তাঁর মতো অযোগ্য মানুষ গাইবার সুযোগ পাচ্ছেন লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে।
লতার একক গান, সহশিল্পীর সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গান এবং দু-একটি সম্মেলক গান হলো। আশা ও হেমন্তও একক গান গাইলেন ফাঁকে ফাঁকে। গনের মাঝে যে দু-চারটে কথা বললেন লতা মঙ্গেশকর–সেও অতি মধুর। সেদিন মিলনায়তন তেমন সজ্জিত ছিল না, মঞ্চসজ্জাও ছিল সাধারণ, কিন্তু কী যে অসাধারণ একটা আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল, তা বলার নয়। প্রতিটি গানের পরে শ্রোতাদের করতালি আনন্দ-হিল্লোল বইয়ে দিয়েছিল। কোথা থেকে যে দু-আড়াই ঘণ্টা চলে গেল, টের পাওয়া গেল না। অনুষ্ঠানশেষে দিলীপকুমার আবার মঞ্চে উঠলেন বিদায়বার্তা জানাতে, কিন্তু ততক্ষণে তাঁর কথা জড়িয়ে এসেছে–প্রারম্ভিক ভাষণের ইন্দ্রজাল অপগত হয়েছে। তারপরও, এমনকী মিলনায়তন থেকে বেরিয়ে আসার পরেও, মোহের ঘোর আমাদের কাটে না।
এই প্যালেডিয়ামেই আমরা পাঁচজন ইউল ব্রাইনারের দি কিং অ্যান্ড আইনাটক দেখতে গিয়েছিলাম। পঞ্চাশের দশকে তার চলচ্চিত্র আনা অ্যান্ড দি কিং অফ সিয়াম দেখে সকলে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখন দেশের তরুণদের মধ্যে ইউল ব্রাইনারের মতো মাথা কামিয়ে ফেলার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। চলচ্চিত্রটি অমন সাড়া জাগিয়েছিল বলে তার নাট্যরূপ দেখার আগ্রহ ছিল বহুজনের। চলচ্চিত্রের অত কারিগরি সুবিধে থাকা সত্ত্বেও নাটকটি বহুগুণ ভালো লাগলো। সকলেই ভালো অভিনয় করেছিলেন, কিন্তু মনে হলো, ইউল ব্রাইনার একাই মাতিয়ে রাখলেন সবটা সময়। নাটকের শেষে মোহিত দর্শকেরা হলের বাইরে ভিড় করলো–নায়ককে এক নজর দেখবে কিংবা তার স্বাক্ষর শিকার করবে বলে। এমন ভিড়ভাট্টা অপ্রত্যাশিত ছিল না, তাই ইউল ব্রাইনার প্রেক্ষাগৃহের অত্যন্তরেই রয়ে গেলেন অনেকক্ষণ। পুরো ব্যাপারটা তখন ধৈর্যের প্রতিযোগিতায় পরিণত হলো। অভিনেতা বেরিয়ে আসেন না, দর্শকেরাও জায়গা ছাড়ে না। দু-চারজন যে রণে ভঙ্গ দেয়নি, তা নয়, কিন্তু বুলু ও মানসী পণ করেছে, অনুষ্ঠানপত্রে তার স্বাক্ষর নেবেই। দাঁড়িয়ে থাকতে মাসিমার কষ্ট হয়, সরোজ ও আমার ধৈর্য ফুরিয়ে আসে, কিন্তু আমাদের অন্য দুই সঙ্গিনী অদম্য। শেষ পর্যন্ত ইউল ব্রাইনার বেরিয়ে আসেন, প্রবল করতালি রাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে, কেউ কেউ তার হাতে ফুল গুঁজে দেয়, কেউ কেউ দূর থেকে ফুল ছুঁড়ে দেয়, কেউ কেউ অনুষ্ঠানপত্র এগিয়ে দেয় স্বাক্ষরের দাবিতে। বুলু ও মানসী স্বাক্ষরসমেত অনুষ্ঠানপত্র নিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে ফেরে। বুলু তারটা আমাকে দান করতে চায়। আমি বলি, কী করবো নিয়ে, আমার তো অটোগ্রাফ জমাবার শখ নেই।’ সে বলে, এটা বাড়ি নিয়ে যাও, তোমার ছেলেমেয়েকে দিও-ওরা খুশি হবে। একবার ইচ্ছে হলো বলি, আমরা থাকি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিভৃতে–সেখানে বাইরের পৃথিবীর আঘাত অতি মৃদু–আমার সাত থেকে পনেরো বছর বয়সের ছেলেমেয়েরা ইউল ব্রাইনারকে জানার সুযোগ পায় না। কিন্তু বুলুর আন্তরিকতা দেখে তা আর বলা হয় না। আমি ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানপত্র নিই, দেশে ফিরে তা তুলে দিই ছেলেমেয়ের হাতে। তারা নেড়েচেড়ে রেখে দেয় সেটা, তারপর একসময়ে হারিয়ে ফেলে। আমার কাছে থাকলেও তার পরিণতি এমনি অমোঘ হতো।
এইবার প্রবাসকালে তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়ে গেল। প্রতিবারই তার স্ত্রী ছিলেন সঙ্গে, একবার ছিলেন তার মাও। অমিতা সেনের সঙ্গে সেই আমার প্রথম ও শেষ দেখা। ঢাকার স্মৃতি তাঁর চিত্তে দেদীপ্যমান। আমি সত্যেন সেনকে চিনি বলায় খুশি হলেন। নবনীতার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের কথাও বলেছিলাম। সে-সন্ধের বেশির ভাগ সময়টা তিনি কাটিয়েছিলেন আমার সঙ্গে গল্প করে। শান্তিনিকেতনের নানা প্রসঙ্গ তুলেছিলেন।
৪৪.
১৯৭৬ সালে আমাকে হারিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলা অনুষদের ডিন হয়েছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী। ১৯৭৮ সালে তিনি আবার একই পদের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের মনোনীত ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন। তিনি সেবার জয়লাভ করেছিলেন। ১৯৮০ সালে আমি প্রার্থী হলাম এবং এবারে নির্বাচিত হলাম। আলমগীর হয়তো দ্বিতীয়বার ডিন হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন মনে মনে, যদিও মুখ ফুটে কিছু বলেননি। তবে তাঁর সঙ্গে ধীরে ধীরে আমার একটা দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করলো।
