কিন্তু আর কোনো রোমান সেনা আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের সামনে আসতে সাহস করলো না। তারা এতটাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো যে, ওখানেই রণভঙ্গ দিয়ে পালালো।
আবদুল্লাহ নামের ওই লোক আরো বলেন, ‘যুদ্ধশেষে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক পুনরায় আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং আমার কানের কাছে মুখ এনে চুপিসারে বললেন, ‘আবদুল্লাহ, এতক্ষণ ধরে তুমি যা দেখলে, আল্লাহর ওয়াস্তে আমি বেঁচে থাকা অবধি এই ঘটনা তুমি কাউকেই বোলো না।[3]
সেদিনও আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ আত্মম্ভরিতার ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি জানতেন–আত্মমুগ্ধতার বিষবাষ্প যদি তাকে একবার পেয়ে বসে, তবে তার পদস্খলন অবশ্যম্ভাবী। বিশাল প্রতাপশালী রোমান বীর এবং যুদ্ধবাজ রোমান সৈন্যদের হত্যার সংবাদ যদি দিকে দিকে, মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, সেটা নিয়ে যে তার অন্তরে অহংকার দানা বাঁধবে না, অহমিকা যে জেঁকে বসবে না তার মনে–তার কী নিশ্চয়তা? তিনি ভয় পাচ্ছিলেন–যদি শয়তান তার কৃতিত্বকে তার সামনে বড় করে তুলে ধরে? যদি অবচেতন মনের কোথাও এই আত্মপ্রশংসা ধ্বনিত হয়–এই মহাবীরকে পরাস্ত করার সকল কৃতিত্ব আমার’ ‘আমার শক্তিবলেই এই অসাধ্য সাধিত হয়েছে’–তবে ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের পতন ঠেকাবে কে? আমাদের পূর্বসূরিরা নিজেদের জীবনটাকে এভাবেই সাজিয়েছেন। তারা ছিলেন বীর, কিন্তু বীরত্বের সবটুকু কৃতিত্ব তারা সোপর্দ করতেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে। তারা ছিলেন জ্ঞানের ভান্ডার, তথাপি সেই জ্ঞানের ভারত্ব তাদেরকে বেপরোয়া করে তুলতো না। যুগান্তকারী সকল কর্ম সম্পাদন করতেন, কিন্তু প্রশংসার ভাগিদার তারা হতে চাইতেন না। সমস্ত প্রশংসাকে তারা কেবল মহান মালিকের জন্য তুলে রাখতেন। কৃতিত্বের ভাগ-বাঁটোয়ারা থেকে পালাতেন তারা। বেশ ভালোমতোই তারা জানতেন–যেখানেই কৃতিত্বের আকাঙ্ক্ষা, সেখানেই দাম্ভিকতার সূত্রপাত। যেখানেই প্রশংসা কুড়ানোর লোভ, সেখানেই লোকদেখানো কাজের জন্ম।
তিন.
কুরআনের দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে দেখবো এই আত্মম্ভরিতা, আত্মমুগ্ধতার কারণেই কিন্তু ইবলিস অভিশপ্ত হয়েছিলো। আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টির পরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবাইকে আদেশ করলেন আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করার জন্য। সকল ফেরেশতা বিনা বাক্যব্যয়ে আল্লাহর আদেশ পালন করলো। তারা সিজদা করলো আদম আলাইহিস সালামকে; কিন্তু ইবলিস, যে কিনা একজন উঁচু পর্যায়ের জিন ছিলো, সে রীতিমতো বেঁকে বসলো। আত্মমুগ্ধতায় বিভোর হয়ে সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে বসলো। নিজে আগুনের তৈরি হওয়ায় মাটির তৈরি আদম আলাইহিস সালামকে সে তুচ্ছজ্ঞান করলো। সে বললো, ‘আদম মাটির তৈরি, আমি আগুনের। আগুন মাটির চাইতে সেরা। আদমের চেয়ে তাই আমিই শ্রেষ্ঠ। আগুনের তৈরি হয়ে মাটির তৈরি কাউকে আমি সিজদা করতে পারবো না।
পরের গল্পটা তো আমাদের সবার জানা। ইবলিস অভিশপ্ত হলো চিরতরে। সে হয়ে গেলো মানবজাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা একজনের জন্য কীভাবে যে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, তা ইবলিসের ঘটনা থেকেই জানতে পাই আমরা।
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একটা বড় গুণ হলো–তারা কখনোই আত্মম্ভরিতায় ভোগেন না। আত্মপ্রশংসায় গদগদ হোন না। আত্মবিমুগ্ধতায় ডুবে থাকেন না। কোনোকিছু অর্জন করলে কিংবা কোনো কিছু যদি আমরা ভালো করতে পারি, অথবা ভালো করার যোগ্যতা রাখি, তখনই আমাদের মাঝে অহংকার প্রবেশ করে। আমরা ভাবি–এ বুঝি কেবল আমারই শ্রম আর মেধার ফসল। এ বুঝি কেবল আমারই যোগ্যতা, কিন্তু আল্লাহর কাছে যারা প্রিয় হয়েছেন, যারা নিজেদের নাম লিখে নিতে পেরেছেন আসমানের সোনালি পর্দায়, তারা ভাবতেন ঠিক এর উল্টো।
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম মারইয়াম আলাইহাস সালামের ঘরে এসে নানাবিধ ফলমূল দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন। এমনসব ফলমূল যা ওই অবস্থায়, ওই সময়ে বসে পাওয়া মারইয়াম আলাইহাস সালামের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। চমকিত হয়ে যান যাকারিয়া আলাইহিস সালাম! কৌতূহল নিবৃত করতে না পেরে তিনি মারইয়াম আলাইহাস সালামের কাছে সরাসরিই জানতে চান এতসব ফলমূল তিনি কোথা থেকে পেয়েছেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালামের কৌতূহলের জবাবে মারইয়াম আলাইহাস সালাম সেদিন যা বলেছিলেন, তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। মারইয়াম আলাইহাস সালাম বলেছেন, ‘এগুলো আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। নিশ্চয় আল্লাহ যাকে চান তাকে অবারিত রিযিক দান করেন।[4]
মারইয়াম আলাইহাস সালাম বলতে পারতেন, ‘আমি বেশি বেশি ইবাদত করি, তাই তার বিনিমিয়ে এসব লাভ করেছি। অথবা তিনি এ-ও বলতে পারতেন যে, ‘এগুলো আমি আমার যোগ্যতা-বলে লাভ করেছি। আপনি কিংবা আমি হলে হয়তো-বা এভাবেই বলতাম, কিন্তু মারইয়াম আলাইহাস সালাম এভাবে বলেননি। তিনি এই অর্জনকে, এই প্রাপ্তিকে সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালামের কাছে নিজের বড়োত্ব আর গুরুত্ব জাহির না করে তিনি প্রশংসার ঝুড়িটা তাঁর দিকেই সোপর্দ করে দিয়েছেন, যিনি প্রকৃতপক্ষে সকল প্রশংসার হকদার।
