‘বাছা, তুমি কি আমায় চিনতে পেরেছো?’
‘আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।’
বৃদ্ধ লোকটা বললেন, ‘আমি ওবাইদুল্লাহ ইবনু মুসা ইবনি জাফর ইবনি মুহাম্মাদ ইবনি আলি ইবনিল হুসাইন ইবনি আলি ইবনি আবি তালিবের বংশের মানুষ। আমি গতকাল স্বপ্নে দেখেছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বাগদাদ অতিক্রম করছেন। এমন সময় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ডান কাঁধ থেকে তার চাদরখানা মাটিতে পড়ে যায়। তারপর আমি দেখলাম, হঠাৎ কোত্থেকে যেন এসে তুমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদরখানা মাটি থেকে কুড়িয়ে পুনরায় তার ডান কাঁধে চড়িয়ে দিলে। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার দিকে তাকালেন। সাথে আবু বকর ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাও। তারা হাসিমুখে তোমাকে বললেন, ‘আহমাদ! সুসংবাদ গ্রহণ করো! জান্নাতে তুমি আমাদের সাথি হচ্ছো।
এরপর, ওই বৃদ্ধলোক সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘তোমরা কি জানো, ‘আহমাদ ইবনু হাম্বল নবিজির চাদর কুড়িয়ে নিয়ে নবিজির কাঁধে তুলে দিয়েছেন’ বলতে স্বপ্নে কী বোঝানো হয়েছে?’ উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে একজন শাইখ বললেন, এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে–নবিজির সুন্নাহকে, যা থেকে এখন মানুষ বিমুখ হয়ে আছে, দূরে সরে আছে, আহমাদ ইবনু হাম্বল তা পুনরায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।
ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ বলেন, বৃদ্ধের এই কথা শুনে বিমর্ষ হয়ে যান আহমাদ ইবনু হাম্বল। তিনি বলেন, ‘আহা! এই কথা শোনার আগে যদি আমার এবং এই লোকের মাঝে একটা পাহাড় এসে দাঁড়াতো, কতই না উত্তম হতো।’[1]
আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, জান্নাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথি হতে পারার যে সৌভাগ্য ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহকে বৃদ্ধ লোকটা শোনালেন, তা কি ইমাম আহমাদ পছন্দ করেননি? এজন্যই কি তিনি বলেছেন, এই কথা শোনার আগে আমার এবং এই লোকের মাঝে যদি একটা পাহাড় এসে দাঁড়াতো, কতই না উত্তম হতো?
না, আসলে ব্যাপারটা তা নয়। জান্নাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথি হওয়ার স্বপ্ন তো প্রত্যেক মুমিনের। ইমাম আহমাদ সেটা অপছন্দ করবেন, তা কী করে হতে পারে? বরং তিনি ভয় পেয়েছেন একটা জিনিসকে–আত্মম্ভরিতা। আত্মমুগ্ধতার ভয়। তিনি শঙ্কিত হয়েছেন–যদি এই বৃদ্ধ লোকের কথা শুনে তার মনে অহমিকা প্রবেশ করে? নবিজির হাদিসকে পুনরুজ্জীবিত করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে পুরস্কারের কথা এই বৃদ্ধলোক তাকে জানিয়ে গেলেন, তা থেকে যদি তার অন্তরে আত্মম্ভরিতার জন্ম নেয়? যদি কোনোভাবে তাতে রিয়া তথা লোকদেখানো অনুভূতি প্রবেশ করে, তাহলে তো সর্বনাশ! এ-কূল ওকূল সবকূলই যে তখন হারাবেন তিনি!
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ ঠিক এই কারণেই সেদিন ভীত হয়ে ছিলেন। নিজের ভেতরে যাতে কোনো অহংকার, আত্মমুগ্ধতা না আসে, সেজন্যই তিনি দুজনের মাঝে একটা পাহাড়ের বাধা আশা করে ছিলেন।
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহর এই ঘটনা থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। নিজের ব্যাপারে আমরা যখন অনেক বেশি আত্মতুষ্টিতে ভুগবো, তখন আখিরাতে ভালো ফলাফল লাভের আশা আমাদের জন্য ক্ষীণ হয়ে আসবে। আমি তো অনেক বেশি ইবাদত করি, আমল করি, সাদাকা করি, দ্বীন প্রচার করি’–এই অতি-ভাবনাগুলো আমাদের যাবতীয় আমলকে বিনষ্ট এবং আমাদের আখিরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবার জন্য খুবই যথেষ্ট।
দুই.
আবদুল্লাহ নামের একজন বর্ণনা করেছেন, তারাসুসে[2] আমি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক এবং মুতামির ইবনু সুলাইমানের সাথে অবস্থান করছিলাম। এমন সময়, হঠাৎ চারদিকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো এবং চারদিক থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহ্বান এলো। রোমান ও মুসলিমরা মুহূর্তের মধ্যেই মুখোমুখি সমরে লিপ্ত হলো।
রোমানদের একজন দলনেতা বললো, ‘আমরা মুখোমুখি, জনে জনে যুদ্ধ করবো। একজনের বিরুদ্ধে কেবলমাত্র একজন।’
সে মুসলিমদের আহ্বান করলো যেন একজন একজন করে তার সাথে ময়দানে নেমে যুদ্ধ করে। তার কথানুযায়ী মুসলিম শিবির থেকে এক যোদ্ধা তার বিরুদ্ধে ময়দানে নামল এবং ওই যোদ্ধা রোমান দলনেতার হাতে শহিদ হলো। এরপর আরেকজন গেলো এবং সেও শহিদ হলো। এভাবে ওই দলনেতার হাতে মুসলিম শিবিরের মোট ছয়জন যোদ্ধা শহিদ হলেন।
মুসলিম শিবিরে ততক্ষণে একটা চাপা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং ওই রোমান দলনেতা খুব গর্বভরে, অহংকারের সাথে বিজয়োল্লাস করে চেঁচিয়ে বললো, আর কার বুকে সাহস আছে আসো দেখি?
এরপর, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক আমার দিকে তাকালেন আর বললেন, আমি যাচ্ছি তার সাথে লড়তে। আমি যদি মারা যাই, তাহলে তুমি অমুক অমুক কাজ করতে ভুলে যেয়ো না কিন্তু।
আমাকে এতটুকু বলে নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে যুদ্ধের ময়দানে রোমান সেনাপতির সাথে সম্মুখ সমরে নেমে পড়লেন তিনি। তখন একটা কাপড় দিয়ে চেহারা ঢেকে নিয়েছিলেন, যাতে কেউ তাকে চিনতে না পারে। দীর্ঘক্ষণ টানা যুদ্ধের পর আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের হাতে ওই দাম্ভিক রোমান সেনাপতির মৃত্যু হয়। তারপরে আরো ছয়জন রোমানযোদ্ধাকে হত্যা করেন তিনি। সম্মুখ সমরে বিজয়াসনে দাঁড়িয়ে তিনি বলতে লাগলেন, আর কে কে লড়তে চাও, এসো?’
