কৃষ্ণ তারে কয়।
পুরুষ যেই হয় সেই রাধার গতি॥
এ কী তত্ত্ব? কৃষ্ণ যদি হয় বিন্দু তবে তাকে ধারণ করে আছে যে পুরুষ দেহ সেই রাধা। অন্তর্কৃষ্ণ বহিরাধার তা হলে এমন ব্যাখ্যাও হতে পারে? আমি বাউল গোঁসাইয়ের দুহাত জড়িয়ে ধরে বলি, ‘বলুন বলুন, আর একটু বলুন। গানের বাকিটুকু।’
কিন্তু হঠাৎ দারুণ হইচই চারধারে। দৌড়াদৌড়ি। শতশত লোক চারদিকে উথাল পাথাল। ব্যান্ডেল কাটোয়া লোকাল দেখা দিয়েছে দু ঘণ্টা লেটে। উঠে দাঁড়িয়ে আমার ছলছল চোখের দিকে চেয়ে বাউল বললে, ‘তোমার একটু দেরি আছে। তবে জানতে পারবে তাঁকে।’
চৈতন্যকে বোঝার একটা সোজা পথ তো ইতিহাসে, শাস্ত্রে, জীবনীগ্রন্থে ধরা আছে। আর একটা পথ গোপ্য ও নির্জন। সে পথ একবার আমাকে অনেক দূর এগিয়ে দেয় আবার উলটো টানে গভীর রহস্যে ফেলে সরে দাঁড়ায়। আমার মনে তাই কিছুতেই স্থির সিদ্ধান্ত আসে না যে চৈতন্যকে আমি কোন দিক থেকে বুঝব। তাঁকে কি ভাবব একজন ঐতিহাসিক যুগপুরুষ, ধর্মনেতা ও সমাজত্রাতা ব্যক্তিরূপে? না কি ভাবব গভীর নির্জন পথের এক আলোকচেতনার উপলব্ধি রূপে? এ দ্বৈধ থেকে আরেকটা প্রশ্ন জাগে। উচ্চবর্গের বৈষ্ণব সমাজ যাকে অধিনেতা ভাবে, মনে করে অবতার ও পূজ্য, এমনকী গড়ে মূর্তি ও পূজাপদ্ধতি; নিম্নবর্গের মানুষ কেন তাকে মানতে চায় অমূর্ত আচরণে, গোপন সাধনে? এরমধ্যেই কি রেখায়িত হয়ে আছে কোনও অভিমানী প্রতিবাদের অনচ্ছ সমাজচিত্র? কোনও অধিকার বিচ্যুতির গহন দুঃখ থেকে কি তারা চৈতন্যকে গোপন করল ব্যক্তি থেকে ভাবে?
এইসব সূত্র চৈতন্য সমকাল ও তাঁর প্রয়াণ পরবর্তী বৈষ্ণবমণ্ডলীর ইতিহাসে খোঁজ করা উচিত। আসলে চৈতন্য থেকেই বাংলা সমাজে একধরনের ভাঙনের শুরু। কীসের ভাঙন? ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র তথা বৈদিক সংস্কৃতির ভাঙন। তার মানে, জাতিবর্ণ শাস্ত্র সামন্ত সমাজের ভাঙন। এক দিকে ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের সমাজনেতৃত্ব আরেক দিকে মুসলমান রাজতন্ত্র আর তার মাঝখানে ছিল চৈতন্যের বৈষ্ণব সমাজের স্বপ্ন ও আহ্বান। লড়াইটা ছিল অসম কিন্তু আদর্শ ছিল মানবিক। সব মানুষ সমান, শুধু হরি বললেই মুক্তি, বৈষ্ণবকে হতে হবে অতিসহিষ্ণু দীনাতিদীন—চৈতন্য তো এই তিনটে সার কথা বলেছিলেন তাঁর ধর্ম-আন্দোলনে। কথাগুলি শুনতে চমৎকার, ভাবতেও ভাল কিন্তু আচরণে ফুটিয়ে তোলা কঠিন। তাঁর এই নতুন ভাবনার সঙ্গে ছিল ভক্তি ও সাহস আর অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত দেহের দীপ্তি। সেই ব্যক্তিত্বের টানে কত লোক ভক্তিতে ভালবাসায় আবার আত্মরক্ষা বা প্রতিবাদে ছুটে এল তাঁর পাশে, নিল শরণ। এখানে মনে রাখতে হবে চৈতন্য ব্রাহ্মণ বলেই তাঁর বাণীগুলি মানিয়ে গেল, হল সকলের গ্রহণীয়, সবাই তাঁকে মানল। তিনি নিচুজাতির মানুষ হলে ধর্মভেদ, মন্ত্রমূর্তি ও শাস্ত্রাচারের বিরুদ্ধে তাঁর বিক্ষোভ কি সেকালে মানাত বা তাঁকে সবাই অমন করে মানত? এইখানেই চৈতন্য আন্দোলনের দুটো ফাঁক রয়ে গেল। তিনি ব্রাহ্মণ বলেই স্বাভাবিক নেতৃত্ব পেলেন, তাঁকে তা অর্জন করতে হল না এবং এই ব্রাহ্মণত্বের রন্ধ্রপথেই ভবিষ্যৎ বৈষ্ণব-সমাজের পতনের বীজ পোঁতা রইল। তাঁর প্রয়াণের একশো বছরের মধ্যে ‘ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব’ অংশ হটিয়ে দিল ব্রাত্য ও জাত-বৈষ্ণবদের মূল স্রোত থেকে। নবদ্বীপের চেয়ে বড় হয়ে উঠল বৃন্দাবন। যাঁরা হটে গেলেন তাঁরা তো চৈতন্যকে ভালবাসতেন তাই বৈষ্ণবতার উচ্চবর্গে স্থান না পেয়ে গড়ে নিলেন আরেক ধরনের বৈষ্ণবতা। এখান থেকেই চৈতন্যকে ঘিরে গৌণধর্মগুলির উদ্ভাবনের বীজ খুঁজতে হবে। এই পরাজয় ও প্রত্যাখ্যান থেকেই তাঁদের গোপনতার সাধনা। চৈতন্যকে ব্যক্তিরূপে না ভেবে সংকেতের মধ্যে বোঝার সূচনা হয়তো এইভাবেই।
ইতিহাস আরেকটা কথাও বলে। চৈতন্য তাঁর ধর্ম আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে মুসলমান রাজশক্তির কাছ থেকে যতটুকু প্রতিরোধ পেয়েছিলেন তার শতগুণ প্রতিরোধ এসেছিল সমকালীন ব্রাহ্মণ সমাজ ও হিন্দু সমাজপতিদের কাছ থেকে। তাঁর সমকালে স্মার্ত রঘুনন্দন ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রচুর নিয়মকানুন তৈরি করেন এবং তাঁর সহপাঠী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ (শোনা যায় ইনিই কালীমূর্তি ও কালীপূজার প্রবক্তা) গড়ে তোলেন বহুতর শাক্ততান্ত্রিক তামসিকতা। এখানেই শেষ নয়। শেষপর্যন্ত চৈতন্যকে নবদ্বীপ ত্যাগ করতে হয় কেন এবং কেন তিনি তাঁর জীবনের শেষ আঠারো বছরে গৌড়বঙ্গেই প্রবেশ করেননি তার সদুত্তর কে দেবে? একটা উত্তর অবশ্য লোকগীতিকারদের রচনায় কৌশলে গাঁথা আছে। সেখানে বলা হয়েছে:
মহাপ্রভুর বিজয়ের কালে
যত দেশের বিটলে বামুন
তারে পাগল আখ্যা দিলে।
মানুষ অবতার গোঁসাই
সাত্ত্বিক শরীরে উদয়
দেখে তাই পামর সবাই
ভির্মি রোগ বলে॥
তা হলে প্রথমে পাগল, তারপরে ভির্মিরোগী বলে তাঁকে অবজ্ঞা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও যখন মহাপ্রভুর বিজয় অভিযান ঠেকানো গেল না তখন কূটবুদ্ধি ব্রাহ্মণরা কী করলেন?
যখন দেখে মিথ্যা কিছু নয়
বৈষ্ণব এক গোত্রসৃষ্টি পায়
দেশের বামুন মিলে সবাই
শাস্তর টীকা লিখে নিলে॥
এই হল চিরকালের বাঙালি ব্রাহ্মণ্যসমাজের কৌশল। মনে পড়া উচিত যে, চৈতন্যজন্মের অনেক আগে তুর্কি আক্রমণের মুখে, অত্যাচারের ভয়ে অনেক ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন বর্ধিষ্ণু জনপদ থেকে বহু দূরের অনুন্নত প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে অনার্য সমাজ কাঠামোর এক কুসংস্কারান্ধ জনমণ্ডলী পূজা করত তাদের কৌম দেবদেবী চাণ্ডী, মনসা, ধর্ম বা অন্যকিছুকে। যাদের কোনও Anthropomorphic গঠন ছিল না, যাদের তারা খুঁজে নিয়েছিল পাথুড়ে নুড়ি বা সিজবৃক্ষে এবং এমনকী বন্য জন্তু ও সাপে। তাদের বানানো অপদেবতাদের রুদ্ৰকাহিনী ও প্রতিহিংসাপ্রখর ভয়ংকরতা নিয়ে তারা মুখে মুখে বানিয়েছিল মেয়েলি ব্রতকথা। ব্রাহ্মণ ও অন্য উচ্চবর্ণযুক্ত নবাগত শিষ্টসমাজ অচিরে হিন্দু পুরাণের সঙ্গে কল্পনা কৌশলে ব্রতকথাগুলিকে মিলিয়ে মিশিয়ে তৈরি করে নিলেন মঙ্গলকাব্য। এইভাবে মুখে-মুখে চলা গ্রাম্য ব্রতকথা পেয়ে গেল মার্জিত সাহিত্যের উচ্চ সম্মান। কথক ঠাকুররা সেই মঙ্গলগান গাইতে লাগলেন গ্রামে-গ্রামান্তরে। জীবিকার একটা পথও খুলে গেল। কেন না আসর বসত এক মঙ্গলবার থেকে আরেক মঙ্গলবার পর্যন্ত। এইভাবেই অনার্যসমাজের কাঁধে হাত রেখে ব্রাহ্মণ ও বৈদ্যরা (দু দলই উপবীতধারী) পেয়ে গেলেন সম্মান ও সম্ভ্রম। অন্ত্যজরাও খুশি হল। কেন না তাদের কাহিনী পেল মান্যতা। তারা তো উঁচু হল। এইভাবে সাপের দেবী মনসা হলেন শিবের কন্যা, আদিবাসী চণ্ডী হলেন দুর্গার প্রতীক চণ্ডী। অচ্ছুৎ অশ্রুত ব্রাত্যকাহিনী পেল অভিজাত বর্গের স্বীকৃতি। ব্রাহ্মণ্যকরণ সম্পূর্ণ হল।
