শ্রীচৈতন্যের বেলাতেও ঠিক এমনই হল। ব্রাহ্মণরা যখন দেখল চৈতন্যের বিপুল প্রভাব, বৈষ্ণবধর্মের ব্যাপক গ্রহণীয়তা, যখন সমাজের বণিক সম্প্রদায় ও বৈশ্যশূদ্ররা তাঁকে মানতে লাগল, তখন ব্রাহ্মণসমাজ চৈতন্যকে নিয়ে লিখতে লাগল শাস্ত্রটীকা-ভাষ্যজীবনী। হিসেব নিলে দেখা যাবে এখন পর্যন্ত যত বৈষ্ণব শাস্ত্র গ্রন্থ টীকা ও পদ সংকলন হয়েছে তার পনেরো আনাই ব্রাহ্মণপ্রণীত। অবশ্য তাঁরা হিন্দু ব্রাহ্মণ নন তখন আর। ‘ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব’ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ থেকে মন্ত্রদীক্ষা নিয়ে বৈষ্ণব। বৈষ্ণবস্মৃতিশাস্ত্রে এরকম পরিষ্কার নির্দেশ ছিল যে কোনও ব্রাহ্মণকে বৈষ্ণব-দীক্ষা নিতে গেলে নিতে হবে ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণবের কাছে। শূদ্র বৈষ্ণবের অধিকার নেই ব্রাহ্মণকে মন্ত্রদানের। নরহরি, নরোত্তম ও শ্যামানন্দ এ নিয়ম মানেননি। অবশ্যই তাঁরা বিরল ব্যতিক্রম। এ কথা ঐতিহাসিক সত্য, বাংলা ও বৃন্দাবনের বৈষ্ণবতার মূল ধারা ছিল ব্রাহ্মণমুখী। চৈতন্য নিজে ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাঁর প্রধান দুই সহকারী অদ্বৈত আর নিত্যানন্দ ছিলেন ব্রাহ্মণ। বৃন্দাবনের বড় গোস্বামীর মধ্যে রূপ-সনাতন জীব রঘুনাথ ও গোপালভট্ট এই পাঁচজনই ছিলেন ব্রাহ্মণ। চৈতন্যপরবর্তী কালের নেতৃস্থানীয় বৈষ্ণব জাহ্নবাদেবী, রামচন্দ্র, বীরভদ্র ছিলেন ব্রাহ্মণ। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের বৈষ্ণবধর্মের বাঙালি তাত্ত্বিক শ্রীনিবাস আচার্য, বিশ্বনাথ চক্রবর্তী, নরহরি চক্রবর্তী ও রাধামোহন ঠাকুর ছিলেন ব্রাহ্মণ।
সহকর্মী এক অধ্যাপক বন্ধু বললেন, ‘বৈষ্ণব আন্দোলন আসলে এক ফ্র্যাগমেন্টেশনের ইতিহাস। চৈতন্য যতই জাতিবর্ণভেদ ঘোচাতে চান, এক নিত্যানন্দ, নরোত্তম আর শ্যামানন্দ ছাড়া আর কেউ ব্রাহ্মণত্বের প্রভাব ও প্রতিপত্তি অগ্রাহ্য করতে পারেননি। বিমানবিহারী মজুমদার জানিয়েছেন শ্রীচৈতন্যের ৪৯০ জন প্রত্যক্ষ শিষ্যের মধ্যে ২৩৯ জন ছিল ব্রাহ্মণ, ৩৭ জন বৈদ্য, ২৯ জন কায়স্থ, ২ জন মুসলমান, ১৬ জন স্ত্রীলোক আর ১১৭ জন শূদ্র। আরেকটা কথা বিচার্য যে চৈতন্য-সমকালে ও পরে গৌড়ীয় বৈষ্ণবের কোনও কেন্দ্রীয় সংগঠন ছিল না। বৃন্দাবন ও নবদ্বীপে অর্থাৎ ব্রজমণ্ডল ও গৌড়মণ্ডলে কোনও সংহতির সম্পর্কও ছিল না। ফলে যে যার মতো কাজ করে গেছেন। জাতিভেদ প্রথা বিলোপের ব্যাপারে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা নির্দেশও ছিল না।’
আমি বললাম, ‘নিত্যানন্দ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?’
: নিত্যানন্দ ছিলেন উদার প্রকৃতির জীবনরসিক। সাজগোজ ভালবাসতেন। ভালবাসতেন শোরগোল, হইচই। একটু তান্ত্রিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। জীবনরসে ভরপুর। জাতিবর্ণ চেতনা একেবারে ছিল না। চৈতন্য পুরী থেকে নিত্যানন্দ আর অদ্বৈতকে বলে দেন গৌড়বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম ব্যাপকভাবে প্রচার করতে। আর রূপ-সনাতনকে বলেন বৃন্দাবনে গিয়ে শাস্ত্ৰটীকা রচনা করতে। দুটোর মধ্যে প্রথম থেকে সমন্বয় ছিল না। এর ফলে খুব খারাপ হয়েছে। যাই হোক নিত্যানন্দের কথা হচ্ছিল। খুব বড় ব্যক্তিত্ব। ‘প্রেম বিলাস’ পড়লে দেখবেন বৃদ্ধ বয়সে অদ্বৈত ভক্তির চেয়ে জ্ঞানমার্গের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন, ফলে প্রচার আর বৈষ্ণবীয় দীক্ষার দিকটা বেশি নেন নিত্যানন্দ। সারা দেশ কাঁপিয়ে দেন। বৌদ্ধ বিকৃত বামাচারী বারোশো নেড়া আর তেরোশো নেড়িকে নিত্যানন্দই গৌরমন্ত্র দিয়ে জাতে তোলেন।* তাঁর দৃপ্ত ও দর্পিত ঘোষণা ছিল:
নিত্যানন্দ স্বরূপ সে যদি নাম ধরো।
আচণ্ডাল আমি যদি বৈষ্ণব না করোঁ॥
জাতিভেদ না করিমু চণ্ডাল যবনে।
প্রেমভক্তি দিয়া সভে নাচামু কীর্তনে॥
নিত্যানন্দের এই সমদর্শী উদার নীতি উচ্চবর্ণের এবং বিশেষত বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উচ্চবর্গের ভাল না লাগারই কথা। তাঁর নিজের শিষ্য বৃন্দাবন দাস চৈতন্যভাগবতে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে,
দেখি নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বিলাস।
কেহ সুখ পায় কারো না জন্মে বিশ্বাস॥
এবং এমনকী বৈষ্ণবদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে এতদূর বিদ্বিষ্ট ছিলেন যে, ‘নিত্যানন্দ নাম শুনি উঠিয়া পলায়’। তা হলে?
আমি বললাম, ‘ওই জন্যেই নিত্যানন্দের প্রয়াণের পর তাঁর স্ত্রী জাহ্নবা দেবী আর ছেলে বীরভদ্র পরবর্তীকালে বৃন্দাবন গিয়ে সেখানকার গোস্বামীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ও নির্দেশ নেন। তার মানে নিত্যানন্দের গণআন্দোলন আবার পড়ল গিয়ে উচ্চবর্ণের খপ্পরে।’
অধ্যাপক বন্ধু তাঁর আলমারি থেকে ননীগোপাল গোস্বামীর লেখা ‘চৈতন্যোত্তর যুগে গৌড়ীয় বৈষ্ণব’ বইখানা নিয়ে পড়ে শোনালেন:
শ্রীচৈতন্য যতদিন বর্তমান ছিলেন ততদিন বৈষ্ণব সমাজের মধ্যে কোনও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় নাই। কিন্তু তাঁহার তিরোধানের পর নেতৃত্বের স্বার্থ বজায় রাখিবার জন্য সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বহ্নি প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল এবং দেখিতে দেখিতে কয়েক বছরের মধ্যেই নিজেদের মধ্যে দলাদলির সৃষ্টি হইয়া পরস্পর বিবদমান কতকগুলি উপশাখার সৃষ্টি হইল—গৌরনগরবাদিগণ, অদ্বৈত সম্প্রদায়, গদাধর সম্প্রদায় ও নিত্যানন্দ বিদ্বেষী সম্প্রদায়।… যিনি যেভাবে পারিলেন নেতা হইয়া বসিলেন। এইভাবে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ যখন বিপর্যস্ত, তখন সেখানে আরও বিশৃঙ্খলা দেখা দিল ‘গুরুবাদের’ প্রবর্তনে।
