সেদিন সদাব্রত আমাকে এগিয়ে দিলেন পাটুলী স্টেশন পর্যন্ত। দুপুর শেষের ব্যান্ডেল-কাটোয়া লোকালের স্বরূপ চৈতন্যতত্ত্বের মতোই দুর্জ্ঞেয়। কখন আসবে কে জানে? বসে আছি স্টেশন চত্বরের সিমেন্টের বেঞ্চে। মাথার উপর কাঠমল্লিকা ফুল পড়ছে টুপটাপ। বইছে এলোমেলো বাতাস। জমছে দুটো-পাঁচটা করে যাত্রীর দল। হঠাৎ এসে পড়ল একদল বাউল। কোনও মেলামচ্ছব থেকে আসছে বোধহয়। খানিক গাঁজা খেল সবাই। আমি গুটিগুটি তাদের মাঝখানে বসে পড়লাম তারপর ঘষটাতে ঘষটাতে গিয়ে বসলাম বাউলদের মাল্তে অর্থাৎ দলনেতার সামনে। বললাম, ‘কিছু তত্ত্বকথা জানতে চাই, বলবেন?’
গাঁজায় টং চোখ লাল বাউল গোঁসাই বলেন, ‘তত্ত্ব জানতে চাও, তা আত্মতত্ত্ব সেরেছ?’
আমি বুঝলাম, সেই বাঁধা ফরমুলা। আমার পরীক্ষা হবে। বললাম, ‘জিজ্ঞাসা করুন।’
: তুমি কে? এলে কোথা থেকে?
: আমি মানুষ। ছিলাম পিতার মস্তকে, বিন্দুরূপে।
: বাঃ বেশ। পিতার বিন্দু কোথা থেকে এল?
: দানা শস্য ফলমূল থেকে। তার মূলে পঞ্চভূত।
: ভাল। খুব ভাল। তো পঞ্চভূত কী?
সব প্রশ্নই পটপট জবাব দিলে প্রশ্নকারীর অহং আহত হয় জানি, তাই বোকা সেজে মুখ বিপন্ন করে বলি, ‘ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোম পর্যন্ত জানি। তাঁরা যে কে জানি না।’
অজ্ঞতা এ সব সময়ে কাজ দেয়। ঠিক তাই হল। বাউল গোঁসাই দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘ব্যোম মানে চৈতন্য, মরুৎ নিতাই, তেজ অদ্বৈত, ক্ষিতি গদাধর আর অপ হল শ্রীবাস।’
: তা হলে পঞ্চতত্ত্বে দেহের গঠন?
: ঠিক বলেছ। তোমার প্রবর্ত দশা ঘুচেছে। আচ্ছা, আর একটা কথা তোমারে আমি শুধাবো। জবাব দিলে তবে তোমার তত্ত্ব কথার জবাব পাবে। কী, রাজি তো? আচ্ছা বলো তো, হনুমানের কেন মুখ পুড়ল? লঙ্কার আগুন ল্যাজে লেগেছিল, সেই আগুন মুখে ঘষেছিল—এ সব বাজে কথা বলবে না কিন্তু। নাও, এবারে বলো।
হা ঈশ্বর। শেষকালে আমাকেই বানাতে হবে মিথ এবং তা নিম্নবর্গের অদ্ভুত যুক্তি মেনে? এমন বিপদ থেকেই মিথের জন্ম নাকি? যাই হোক, খেলে গেল বুদ্ধি। গ্রামের মানুষের স্পর্শকাতর ভাবনা কিছু কিছু জানতাম। তাই মনে রেখে বললাম, ‘হনুমানকে রামচন্দ্র বলেছিলেন অশোকবনে গিয়ে জানকীকে রামের অঙ্গুরীয় দেখাতে এবং বলতে যে, মা জননী তোমার ভয় নেই। তোমার উদ্ধারের জন্যে যুদ্ধের জোড়জোড় চলছে। কিন্তু হনুমান সীতাকে এইসব বলে তারপরে এক বাড়তি কথা বলে ফেললে। ‘মা জানকী রামচন্দ্রকে দেখবে? তবে ওঠো আমার কাঁধে। তোমাকে নিয়ে একলাফে আমি সাগরপারে যাব।’ এতে দুটো দোষ হল। আরে মূর্খ হনুমান, তুই করবি সীতার উদ্ধার? এই অহংকার তার এক নম্বর অপরাধ। আর তার চেয়েও গুরুতর অপরাধ এই যে হনুমান সীতাকে কাঁধে চড়াতে চেয়েছিল। তার মানে তার অঙ্গস্পর্শের বাসনা হয়েছিল। পশু তো? এই দুই পাপে তার মুখ পুড়ল।
বাউল গোঁসাই বললেন, ‘সাবাশ।’ আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।
বাউল গোঁসাইয়ের মনটা বেশ খুশি খুশি। বললেন, ‘একটা গান শোনো। দেখি তুমি এ-তত্ত্বটা ধরতে পারো কি না। শোনো আর ভাবো:
তুমি ঘুমালে যিনি জেগে থাকেন
সেইতো তোমার গুরু বটে
সে যে আছে, দেহের মাঝে
তারে ভালোবাসা অকপটে॥’
আমি ভাবলাম এ-তত্ত্ব তো বেশ কঠিন। এই কি চৈতন্যতত্ত্ব? আমি ঘুমালে জেগে থাকে আমার চেতনা। কিন্তু ততক্ষণে গানের পরের অংশ এসে গেছে:
জীব চলে বলে ফিরে
শুধু তো তাহারই জোরে
সুখ দুঃখ আদি করে
সকলই ঘটায় এই ঘটে।
চেতনার বশেই কি মানুষ চলে বলে? নাকি প্রাণের কথা বলা হচ্ছে এখানে? কিন্তু প্রাণই কি সুখ দুঃখের কারক? এবারে পরের অংশ:
করিলে তাঁর সাধনা
সকলই যাইবে জানা
হবে না আর আনাগোনা
এ ভব সংসার সংকটে।
না, নিশ্চয়ই প্রাণ বা চেতনার কথা বলা হচ্ছে না এ-গানে। প্রাণ বা চেতনার সাধনা খুবই ভাববাদী কথা। বস্তুবাদী বাউল এ গান গাইবে কেন? এমন কীসের এই সাধনা তা হলে যাতে জন্মমরণ পার হওয়া যায়? এবারে শেষ অংশ:
সে যেদিনে ছেড়ে যাবে
তোমারে তো শব করিবে
কেনা বেচা ফুরিয়ে যাবে
এত সাধের ভবের হাটে।
চমৎকার। এবারে বুঝেছি। বললাম, ‘শ্বাসের কথা বললেন তো? শ্বাসই তা হলে গুরু? সেই চালায় তাই চলি। সে না থাকলেই আমি শবমাত্র। আর সেই শ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে জ্যান্তে মরার অনুভূতি হয় অর্থাৎ দেহমনের বাস্তব চেতনা থাকে না। ঠিক বুঝেছি তো?’
: বেশ বুঝেছ। আর একটু বোঝে। ওই শ্বাসের চলাচল থেকেই বিন্দুর চলাচল। শ্বাস নিয়ন্ত্রণ থেকেই বিন্দু রক্ষা। বিন্দুই চৈতন্য বিন্দুই কৃষ্ণ। বিন্দুর আরেক নাম মণি।
যেন একটা দমকা হাওয়ার ঝাপট লাগে সহসা। ‘তাঁকে জানতে গেলে গুরুকে বশ করো’ গানের মানে এবারে এতদিনে কি তবে বুঝলাম? গুরু মানে শ্বাস? তিনি মানে কৃষ্ণ অর্থাৎ চৈতন্য। একেবারে দিশেহারা হয়ে, আবার আনন্দে উত্তেজনায় বললাম, ‘তবে কি চৈতন্যতত্ত্ব বুঝে ফেললাম?’
‘বোঝো নি, তবে বোঝার পথে এবারে খানিক দাঁড়িয়েছ’ বললে বাউল, ‘গরম থাকতে থাকতে আরেকটা গান শুনে নাও:
কোন কৃষ্ণ হয় জগৎপতি
মথুরায় কৃষ্ণ নয় সে
সে কৃষ্ণ হয় প্রকৃতি।
গান থামিয়ে বললে, ‘কী বুঝলে? প্রকৃতি মানে কী?’
বললাম, ‘প্রকৃতি মানে বিন্দু।’
: ঠিক ঠিক। এবারে শোনো:
জীবদেহে শুক্ররূপে
এ ব্ৰহ্মাণ্ড আছে ব্যেপে
