‘তা হবে’ খুব উদাস ভঙ্গিতে বললেন সদাব্রত, ‘ও সব কথা তো আপনাদের। আর আমাদের কথা হল একটাই—কবে গৌর পাব।’
জিজ্ঞাসুর সঙ্গে ভক্তের এইখানটায় তফাত, জ্ঞানের সঙ্গে বিশ্বাসের। আমি তো বুঝতে চাই স্তরে স্তরে, বিন্যাসে এবং শ্রেণীকরণ করে। ওঁরা উপলব্ধি করেন প্রবর্ত-সাধক-সিদ্ধ এইসব থাকে থাকে। ওঁদের জানাটি খাড়াখাড়ি, আমারটা আড়াআড়ি। আমি সমাজসত্যের ব্যাপ্তিতে ধরতে চাই চৈতন্যকে, ওঁরা ব্যক্তিক বোধের সীমায় নিজের করে চান চৈতন্যকে। অথচ ওঁদের, মানে লোকধর্মে লজিক ছাড়া মিথ ছাড়া কিছুই গৃহীত হয় না। সেইজন্যেই নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থাকতে ভালবাসেন ওঁরা। লড়াই লাগে না উচ্চবর্গের সঙ্গে। তাই ওঁদের মিথ সম্পর্কে আমাদের কৌতুহলের মূলে থাকে কৌতুক। আমাদের বেদপুরাণ আর শ্রেণীবর্ণ চেতনা সম্বন্ধে ওঁদেরও কৌতুক আছে কিন্তু কৌতূহল নেই। চৈতন্য সম্পর্কে দুটো শ্লোক তো আমি কতবার শুনেছি। তার একটা:
সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি হয়
তার মাঝে গোরা এক দিব্যযুগ দেখায়।
এখানে তো স্পষ্টই আমাদের পৌরাণিক যুগবিন্যাস আর অবতারতত্ত্বকে বাতিল করা হয়েছে। নিম্নবর্গের উদার-ভাবনায় দিব্যযুগ শব্দটি এক নতুন সৃষ্টি। এখানে দিব্যযুগ এক আদর্শ স্বপ্নের যুগ যা ব্রাহ্মণ্যপোষিত নয়, রাজন্যশাসিত নয়, নয় শ্রেণীবর্ণে দীর্ণ। গৌরাঙ্গ যদি কোনও সুস্থ সমাজ গঠনের আদর্শ এনে থাকেন তবে তা মুক্ত সমাজ। মানবিকতায় সমুজ্জ্বল, দেহধর্মে উষ্ণ, কামনা-বাসনায় মর্ত্যধর্মী। এই বোধে দাঁড়িয়ে লোকধর্মের আরেকটা বক্তব্য হল:
গোরা এনেছে এক নবীন আইন দুনিয়াতে।
বেদপুরাণ সব দিচ্ছে দুষে সেই আইনের বিচারমতে॥
গোরার এই নবীন আইনই তা হলে নিম্নকোটির অভয়মন্ত্র। এই আইনের বলেই তাঁরা শাস্ত্রকে খাটো করেন মানুষকে বড় করে দেখেন। ঘটে-পটে পূজার বিরোধিতা করেন। পুরুষ আর নারীর মধ্যে আরোপ করেন কৃষ্ণরাধার মিথ। সহজিয়াদের এই ধর্মের ছক এমনকী এম. টি. কেনেডির মতো বিদেশিরও বুঝতে অসুবিধে হয় না। তিনি স্বচ্ছভাষায় লেখেন:
The worshipper is to think of himself as Krishna and to realise within himself the passion of Krishna for Radha, who is represented by the female companion of his worship. Through sexual passion salvation is to be found, The Radha-Krishna stories are held as the justification of their practices which are secret and held at night,
এখন এই রাধা-কৃষ্ণ কাহিনী, বড়ই বুড়ি-চন্দ্রাবলী-আইহনের মিথ, গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়া-শচীমা-র ত্রি-কাহিনী এ সবের পেছনে স্পষ্ট যুক্তি পরম্পরাও যে আছে তা অন্তত আমি কোনও নিবন্ধে পড়িনি। লোকধর্মের আরেক স্ফুরণ তরজা-পাঁচালি-কবিগান-বঁদগান ও কথকতায় পুরাণের এত ভাঙাগড়া হয় মুখে মুখে গায়কে গায়কে, যার কোনও বিশ্লেষণ কেউ লিখে রাখেনি। রাখলে বাংলায় পেতাম আর এক দামোদর ধৰ্মানন্দ কোশাম্বীকে।
এই সব ভাবনা থেকে দুপুরবেলার অন্নসেবার পরে আমি সদাব্রতকে বললাম, ‘কিছু খুচরো প্রশ্ন আছে। জবাব দেবেন?’ সদাব্রত রাজি হতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা আপনাদের বিশ্বাসে কী বলে, বিষ্ণুপ্রিয়ার কী অপরাধ? কেন তাঁকে মহাপ্রভু ত্যাগ করলেন?’
সর্বজ্ঞের মতো হেসে সদাব্রত বললেন, ‘ত্রেতা যুগে যিনি সীতা, কলিতে তিনিই বিষ্ণুপ্রিয়া। মায়ামৃগের ঘটনা মনে আছে তো? লক্ষ্মণের নিষেধ না মেনে গণ্ডী পেরিয়ে সীতা যেই রাবণকে ভিক্ষা দিলেন অমনি রাবণ সীতাহরণ করলেন। সেবারের নিষেধ অমান্য করার জন্যেই এবারে মহাপ্রভু ত্যাগ করলেন বিষ্ণুপ্রিয়াকে। কী, এবারে শচীমা-র কথা মনে জাগছে তো?’
: অবশ্যই। মাতৃঋণ শোধ না করে চৈতন্য কেন তাঁকে কাঁদালেন?
: শচী মা ত্রেতা যুগে যে ছিলেন কৈকেয়ী। পুত্রবিরহের বেদনায় মা কৌশল্যা কৈকেয়ীকে অভিশাপ দিয়েছিলেন, ছেলে ছেড়ে থাকার কষ্ট তুই পাবি কলিযুগে। তাই নিমাই সন্ন্যাস।
: জগাই মাধাইয়েরও এরকম ব্যাখ্যা আছে নাকি?
: হ্যাঁ, যুগে যুগেই তো ভগবানের সঙ্গে শত্রুভাবে ভজনা চলছে। কলিতে যারা জগাই মাধাই মূলে তারা স্বর্গের দারোয়ান জয় বিজয়। ব্রহ্মশাপে তাদের নরদেহ আর শত্রুভাব। এরাই আগে হয়েছিল রাবণ-কুম্ভকর্ণ ত্রেতায়, শিশুপাল-দন্তবক্র দ্বাপরে।
চমৎকার। আমাকে তারিফ করতেই হয়। এবারে শেষ প্রশ্ন করি, ‘আচ্ছা চৈতন্যকে দীক্ষা দিলেন কেশবভারতী এর তাৎপর্য কী? ভগবানের আবার দীক্ষা কেন?’
: গুরুতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা দিতেই এমন ঘটেছে। আর এ ঘটনাও তো নতুন নয়। সত্যযুগে সনক ঋষি, ত্রেতায় বিশ্বামিত্র, দ্বাপরে গর্গ যেমন, তেমনই কলিতে কেশবভারতী।
সদাব্রত নিজেই যে ক্রমে নিজের জটে জড়িয়ে পড়ছেন তা বুঝতে পারছিলেন না। অথচ এ তো খুব স্বচ্ছভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলির বাইরে যাঁরা দিব্যযুগ মানেন তাঁরা কেন তাঁদের মিথের সমর্থনে সেই সত্য ত্রেতা দ্বাপরকে টানবেন? এইখানে নিম্নবর্গের চিন্তাভাবনার স্বরূপটাই ধরা আছে। একদিকে উচ্চবর্গের পুরাণ ও মিথের প্রতিবাদী চেতনা থেকে তাঁরা নিজেদের নতুন মিথ তৈরি করেন অথচ আবার নিজেদের যুক্তি দিয়ে বানানো মিথের সমর্থন খোঁজেন উচ্চবর্গের পুরাণেই। একইসঙ্গে প্রতিবাদ আর সহকারিতা।
