এ সব খানিকটা জানা ছিল বলে পাটুলীর সদাব্ৰত অধিকারীর আখড়ায় আমার খুব অসুবিধা হয়নি। কথায় কথায় বরং অন্য কথা তুললাম। বললাম, ‘আচ্ছা এই যে চূড়াকেশ রেখেছেন, পরেছেন আলখাল্লা আর তুলসীমালা—এর তাৎপর্য কী? লোক দেখানো না অন্য কিছু?
সদাব্রত বললেন, ‘খুব ভাল কথা জিজ্ঞেস করেছেন, কিন্তু কেউ কখনও জানতে চায়নি এ কথাটা। তবে শুনুন, কেন এই পোশাক। শাকের ক্ষেত দেখেছেন তো। সামান্য জিনিস। কিন্তু তাকেও রক্ষা করতে একটু বেড়া দিতে হয়। নইলে ছাগলে মুড়িয়ে খাবে। সাধকের পোশাক তেমনই তার বেড়া, রক্ষাকবচ। হাজার হলেও আমরা তো মানুষ। কুচিন্তা কুকর্মে মন যায় না কি? যায়। তখনই হাত রাখি কন্ঠিতে, চূড়াকেশে, আলখাল্লায়। বলি, তুমি না সাধু, ধরেছ উদাসীনের বেশ, তবে? ব্যাস, আত্মসংযম ফিরে এল। পতনের হাত থেকে রক্ষে। বুঝলেন?’
বুঝলাম, মানুষটার ভিতরে বিশ্লেষণ আছে, অর্থাৎ জ্ঞানী। হয়তো পেতেও পারি কিছু গৌরতত্ত্বের হদিশ। কিন্তু এ সব ক্ষেত্রে যা নিয়ম, হঠাৎ কথাটা তোলা যাবে না। খেলাতে হবে খানিক। তাই বললাম, ‘বেশ বলেছেন। কিন্তু এমন করে তো সবাই বলতে পারে না। এই বলা কি ভেতর থেকে আসছে?’
: না, ভেতর পরিষ্কার হলেই বাক্য আসে না। বাক্যের চর্চা করতে হয়। খুব বড় সাধক দেখেছেন? তাঁদের ভেতরটা পরিষ্কার জ্ঞানে টইটইম্বুর। কিন্তু দেখলে বুঝতে পারবেন না। স্তব্ধ শান্ত। প্রকাশ নেই। আর বাচক যারা তাদের ভেতরে যেমনই হোক, বাইরে শান দিতে হয়। যেমন ধরুন এই হ্যারিকেন লণ্ঠন, ভেতরে হয়তো আলো আছে কিন্তু কাচটা চকচকে করে না মাজলে তেমন আলো পাবেন কি? সাধকের সেইজন্যে ভেতর বার দুই-ই পরিষ্কার রাখতে হয়।
: তার মানে মন ও শরীর।
: হ্যাঁ, তবেই নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইচ্ছা ক্রিয়া জ্ঞান। ওই তিনেই এক। অদ্বৈত।
মনে হল এবারে কথাটা তোলা যেতে পারে। তাই বলে ফেললাম, ‘আচ্ছা খুব সংক্ষেপে গৌরাঙ্গতত্ত্বটা কী?’
: খুব সংক্ষেপে তো একটা বীজমন্ত্র। সেটা গোপন। আমাদের পাটুলী-ঘরের শ্রীমন্ত্র। দীক্ষা শিক্ষা ছাড়া তা দেওয়া যায় না। তবে একটু বিস্তারে বলতে গেলে:
পূর্বে রাধা ছিলে তুমি আমার অন্তরে।
এবে রাধা আমি রই তোমার অন্তরে ॥
কিছু বুঝলেন?
: হ্যাঁ বুঝলাম। ব্রজে কৃষ্ণের অন্তরে ছিলেন রাধা আর নবদ্বীপলীলায় রাধার অন্তরে ছিলেন কৃষ্ণ। সেইজন্যেই অন্তৰ্কৰ্য বহিরাধা। সেইজন্য চৈতন্যের গৌর অঙ্গ।
সদাব্রত বললেন, ‘প্রায় বুঝেছেন, তবে গৌর অঙ্গের অন্য মানে আছে। একটা গানে সে তত্ত্বটা আছে। ওহে, হরিদাসী, আমার সারিন্দাটা দাও দিকি। একটু মহতের পদ গাই।’
এতক্ষণে হরিদাসীকে দেখা গেল। সাদা ব্লাউজ আর সাদা থান-পরা বৈরাগিনী। নাকে, কপালে গেরিমাটির তিলকসেবা। গায়ের বর্ণ গৌর। খুব ভক্তিভরে মেটে দাওয়ায় বাদ্যযন্ত্রটি নামিয়ে একপাশে নতমুখে বসল। তার যন্ত্র টুং টাং শব্দে বাঁধা হচ্ছে সেই ফাঁকে আমি বলে বসি, ‘হরিদাসীর গান শুনব না?’
হরিদাসী মধুর হেসে ঘাড় কাত করে সায় দেয়। কতজন আমাকে বলেছে, গান যদি শোনেন তো রাঢ়ের বোষ্টমীদের গলায়। শুনেছি অবশ্য অগ্রদ্বীপের মীরা মহান্তের আখড়ায় অনেক বোষ্টমীর গান। তবে সে হল মাঠে মেলায়। সেখানে নিগূঢ় গান কম হয়। ইতিমধ্যে সারিন্দা বাঁধা শেষ। সদাব্ৰত গলা চড়িয়ে ধরেছেন:
গৌর তুমি দেখা দাও আবার
অগ্নিকুণ্ডের কোলাহলে
কান ফেটে যায় ভূমণ্ডলে
ঝাপ দাও সেই চিতানলে
যদি বাঞ্ছা হয় আবার ॥
এরকম গান কখনও তো শুনিনি। গৌর তুমি দেখা দাও আবার। কোথায় দেখা দেবেন? কোন রূপে? অগ্নিকুণ্ডের কোলাহল আর ঝাঁপ দাও বলতে কামাগ্নি বোঝাচ্ছে কি? তবে তো গৌরকে সাধক তার নিজের দেহেই আহ্বান করছে। আশ্চর্য গান তো? গানের বাকি অংশ:
সে-অগ্নিতে হলে দাহন
হয়ে যাবে অগ্নিবাহন
কর্ম হবে সিদ্ধ কারক
কাঞ্চন বর্ণ হবে তার।
গৌর তুমি দেখা দাও এবার ॥
গান থামিয়ে সদাব্রত বললেন, ‘গোরা রূপের মানে পেলেন? কামের রং কালো, ঘোর কৃষ্ণ। সেই কামে ঝাঁপ দিয়ে শোধন করে প্রেমের জন্ম। সেই প্রেমের বরণ কাঞ্চন। গৌরাঙ্গই প্রেমস্বরূপ। তাঁর বরণ হেম।’
আশ্চর্য, সকল লোকধর্মই গানে গানে আমাকে বোঝাতে চাইছে যে, চৈতন্য কোনও ব্যক্তি নন, অবতার নন, চৈতন্য একটা স্তরান্বিত চেতনা। তাঁকে মূর্তিতে বা মন্ত্রে পাওয়া যাবে না। পেতে হবে সাধনার বিমিশ্রণে, শোধনে। ব্যাপারটা আমাকে টানতে লাগল এবার। আমি বললাম, “গৌরাঙ্গকে নিয়ে সহজ সরল গান নেই আপনাদের?’
: সরল মানে? শুনতে না বুঝতে? আমি যেটা গাইলাম সেটাও খুব সরল গান, অবশ্য যদি বোঝেন। আচ্ছা এবারে একটা শুনতে সহজ গান শুনুন। নাও হরিদাসী, সুর ধরো।
সদাব্রত চোখ বন্ধ করে সারিন্দায় চড়া পর্দায় সুর তোলেন আর সেই পর্দা থেকে হরিদাসী ধরে:
গুরু হে, চেয়ে দেখতে পাই গৌরময় সকলই
চাঁদ গৌর আমার জপের মালা
গৌর গলার মাদুলি
আমি গৌর গহনা গায়ে দিয়ে
ধীরে ধীরে পা ফেলি॥
নয়নের অঙন গৌর।
গৌর নোলক অলক তিলকা চন্দ্রহার
গৌর কঙ্কন গৌর চাঁপাকলি।
গৌর নাম করি গায়ে নামাবলী।
গৌর আমার শঙ্খ শাড়ি
গৌর মালা পুঁইচে পলা চুলবাঁধা দড়ি
দুই হাতের চুড়ি গৌর আমার
গৌর কাঁচুলি॥
গান শেষ হতে দেখি হরিদাসীর চোখভরা জল। বিশ্বাসের জগতে আমি জিজ্ঞাসু নাস্তিক। খুব বেমানান লাগে। আমি বললাম, ‘এই কি গৌরনগর ভাবের পদ?’
