এইবার সৃষ্টিকর্তা গড়লেন আত্মা
জীবের কর্মসূত্রের ফল জেনে।
প্রথম মাসে মাংস শোণিতময়
দুই মাসে নর নাভী কড়া অস্থি-র উদয়—
তিন মাসে তিন গুণে জীবের মস্তক জন্মায়
চতুর্থেতে নেত্র কর্ণ ওষ্ঠ চর্মলোম…।
মানুষ কি একদিনে হয়? এ কি পশু যে শুধু জীবনধারণ করবে? মানুষকে যে ক্রিয়াকরণ করতে হবে। বুঝতে হবে সব কিছু। চেতনা চাই। চাই ভালমন্দের জ্ঞান, সৎ অসতের বিবেচনা। তাই ধীরে ধীরে তার গঠন।
পঞ্চমেতে হস্ত পদাকার
পঞ্চতত্ত্ব এসে করলেন আত্মাতে সঞ্চার।
সেইদিন হলো জীবের আকার ও প্রকার
ছয় মাসেতে ষড়রিপু বসিল স্থানে স্থানে॥
পঞ্চতত্ত্ব মানে পঞ্চভূত। পৃথিবীর যত ফুল ফল দানাশস্যের মধ্যে থাকে পঞ্চভূত। সেই গর্ভফুলের শোণিত থেকে সন্তান পায় পঞ্চভূত। ছ মাসে জীব যেই আকার আকৃতি পায় অমনি কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ আর মাৎসর্য এই ষড়রিপু তাকে ভর করে।
সপ্তমেতে সপ্তধাতু যে—
এরা আপন আপন শক্তি লয়ে বসিল এসে।
অষ্টমেতে অষ্টসিদ্ধি এল ভোগের কারণে ॥
নয় মাসেতে নয় দ্বার প্রকাশ
দশ মাসে দশ ইন্দ্রিয় না রহে গর্ভধামে ॥
নবদ্বার বলতে বোঝায় দুই চোখ, দুই কান, দুই নাক, মুখবিবর, পায়ু আর লিঙ্গ। দশ মাস পুরে গেলে পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় আর পাঁচ কর্মেন্দ্রিয় ফুটে ওঠে। তখন গর্ভমধ্যে সন্তান ছটফট করে। বলে, ‘মুক্তি দাও এ অন্ধকার থেকে বাঁচাও আমাকে এই গর্ভকষ্ট থেকে; এ যে শোণিতময় পিচ্ছিল।’ স্রষ্টা তখন বলে, ‘জনম হলে কী করবি মনে থাকবে তো?’ ‘হ্যাঁ, মনে থাকবে। করব মানুষ ভজন। নির্বিকার হয়ে করব সাধন।’ কিন্তু ঘটে ঠিক উলটো। তাই—
গোঁসাই কালা বলছেন শোন্ রে গোপালে
বায়ু কর্তা নেত্র এলো বাহির মহলে—
এইবার জীব মূলে ভুলে কাঁদিছে পড়ে ভূতলে।
প্রসবের সময় প্রথমে তো মুণ্ডই বেরোয়, তাতে থাকে চোখ। সেই চোখ প্রথম পৃথিবী দেখে আর মায়ার ঝাপট লাগে সেই চোখে। সে কেঁদে ফেলে আর সেই সুবাদে মূলেই ঘটে যায় ভুল।
সে কাঁহা কাঁহা কাঁহা কাঁহা বলে
জীবের সম্বন্ধ তাই ঠিক থাকে না
যখন উদয় যেখানে ॥
সে কেবল কাঁহা কাঁহা বলে। কোথায় সে কোথায় আমি? কোথায় ছিলাম আর কোথায় এলাম? কোথায় গেল আমার স্রষ্টা। তখন জননী দিল স্তন। আঁকড়ে ধরে দুহাতে শিশু দিল টান। জন্মাল তার কামনা। ভেসে গেল প্রতিজ্ঞা। এই তো জীবন বাবাসকল। কথক সনাতন দাস থামলেন।
বাপরে, এ যে পুরো ফ্রয়েডিয়ান চিন্তা-ভাবনা। কিন্তু এর সঙ্গে চৈতন্যের সম্পর্ক কোথায়? গানের শেষে সনাতন দাস বসে গাঁজা টানছেন টোঙের ঘরে। আমি অকুতোভয়ে ঢুকে পড়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘যে গান গাইলেন তার সঙ্গে গৌরাঙ্গ তত্ত্বের যোগ আছে কিছু?’
সনাতন নিখিল চোখে বললেন, ‘গৌরাঙ্গ বা চৈতন্যতত্ত্বের সঙ্গে সবকিছুর যোগ আছে। এই যেমন ধরো আমাদের দুই গুরু—দীক্ষাগুরু আর শিক্ষাগুরু। এখন দীক্ষাগুরু হলেন কৃষ্ণস্বরূপ আর শিক্ষাগুরু রাধাস্বরূপ। তা হলে দীক্ষাগুরু আর শিক্ষাগুরুর সংযোগ হচ্ছে এই শিষ্যদেহে। তা হলে শিষ্যই চৈতন্য। আর শুনবেন?’
খুবই নতুন কথা সন্দেহ কি। তাই উদ্বুদ্ধ হয়ে বললাম, ‘আরও বলবেন? বলুন। এ সব কথা আগে শুনিনি।’
.. হু। ভ্রান্ত বুদ্ধি। আমাদের সব এই শরীর দিয়ে জানতে হয়। যাক শুনুন তা হলে চৈতন্যতত্ত্ব। চৈতন্য কোথায় জন্মালেন, কার বীজে? তাঁর জন্মদাতা জগন্নাথ মিশ্র। জগন্নাথ কে? জগতের প্রভু অর্থাৎ জীব আর ঈশ্বরের মিশ্রণ যেখানে। সেই মিশ্র বীজে তাঁর জন্ম। বীজ ও হ্লাদিনীর সমন্বয় এই হল চৈতন্য। চৈতন্যতত্ত্ব বোঝার জন্য সেই কারণে প্রকৃতি লাগে। প্রকৃতি ছাড়া ধর্ম হয়? আনন্দস্বরূপ রসের প্রয়োজনে প্রকৃতি। অদ্বয় চৈতন্য লাভের জন্যও প্রকৃতি। সব বুঝতে পারছেন?
: সবটাই কি আর বুঝছি? কিছু বুঝছি, কিছু আবছা থাকছে। খুব সহজ তো নয়।
‘তবে এই মুখে কুলুপ আটলাম’ সনাতন দাস বললেন, ‘আর কোনওভাবেই কিছু বলাতে পারবেন না। তবে হ্যাঁ, গাঁজার ঘোর লেগেছে ভাবও লেগেছে। একটা গান গাই বরং। যদি জিজ্ঞেসের জবাব পান—
আছে রূপের দরজায় শ্রীরূপ মহাশয়
রূপের তালা ছোড়ান
তার হাতে সদাই।
যে জন শ্রীরূপ গত হবে
তালা ছোড়ান পাবে।
কী বুঝলেন গো?’
আমি বললাম, “শ্রীরূপ মানে তো নারীদেহ। ঠিক বলেছি?’
সনাতন এগিয়ে এসে আমার মাথার চুল এলোমেলো করে দিলেন দুহাতে। তারপর জ্বলজ্বলে চোখে হেসে বললেন, তবে তো নিত্যানন্দ বোঝা সারা হয়েছে। এখোন, আর একটু এগোন। তা হলেই চৈতন্য আর অদ্বৈত বুঝবেন।’
আমার সারা দেহে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আমি বললাম, ‘যেন অনেকটাই বুঝতে পারছি তবু সব তো পরিষ্কার হল না। কী করি বলুন তো? কোথায় যাই?’
: কোথায় কোথায় গেছেন?
: সব বৈষ্ণবতীর্থে। নবদ্বীপ শান্তিপুর খড়দহ বাগনাপাড়া অগ্রদ্বীপ কাটোয়া আদি সপ্তগ্রাম…
: ও সবই শ্রীপাট। কিন্তু সহুজেদের আখড়ায় বেশি যাননি। একবার নসরৎপুর যান দিকিনি। আর পাটুলী।
অগ্রদ্বীপ থেকে বারুণীর স্নান সেরে ফেরার পথে পাটুলী নামলাম। সুন্দর গ্রাম একধারে। আরেকধারে গড়ে উঠছে গঞ্জ। নতুন নতুন বাড়ি বাজার হিমঘর। ওদিকে আমার কাজ কী? বরং গঙ্গার দিকে ছড়ানো-ছিটানো অনেক কুঁড়েঘর আর মেটে দাওয়া। এখানেই দু-তিনশো বছর ধরে সহজিয়াদের ডেরা। এঁরা করেন এক গোপন দেহসাধনা। বিশেষ এক ক্রিয়াকরণ থেকে এঁদের সাধনধর্মের নাম হয়েছে পাটুলী-স্রোত। এঁদের বহির্বাস বলতে সস্তাদরের সাদা মার্কিনের আলখাল্লা আর জনতা ধুতির লুঙ্গি। মাথায় চূড়াকেশ। গলায় তুলসীকাঠের মালা। হাতে নারকোল মালার কিস্তি। অনেকে করেন দুই চাঁদের সাধনা, অনেকে চার চাঁদের। খাঁটি ব্রহ্মচারী বাবাজি বৈষ্ণব সম্প্রদায় এই সহজিয়াদের খুব ঘৃণা করেন। বলেন, পাষণ্ডী, ভ্রষ্ট। বলেন সহুজেরা কদর্য ভক্ষণ করে আবার গৌরের নাম করে। ছিঃ।
